Published : 30 Aug 2025, 12:06 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা চরমে থাকার পরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির সাহায্যে লাভবান হচ্ছে মার্কিন চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এনভিডিয়া।
এ লাভের কারণ মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এখন এআই নিয়ে অনেক কাজ করছে এবং সেই কাজের জন্য তাদের এনভিডিয়ার তৈরি চিপ দরকার।
বুধবার এনভিডিয়া বলেছে, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের আয় হয়েছে চার হাজার ছয়শ ৭০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধের টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে এনভিডিয়া।
কোম্পানিটি বলেছে, ‘ভূরাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলা করে চলেছে’ তারা। তবে এ ঘোষণার পর বাজারে কোম্পানির শেয়ারের দাম কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
এনভিডিয়াকে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতিমালার মধ্যে দিয়ে ব্যবসা চালাতে হয়েছে, যেগুলোর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে এআই উন্নয়নে শীর্ষে রাখা।
এআইয়ের চলমান উত্থান
এআইয়ের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করে চলেছে এনভিডিয়ার উন্নতমানের বিভিন্ন চিপ।
বুধবার এনভিডিয়া বলেছে, বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে তাদের পণ্যের চাহিদা এখনও বেশি, বিশেষ করে ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি মেটা এবং চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের মতো কোম্পানির কাছে। এসব কোম্পানি মূলত এআই প্রযুক্তি তৈরি ও সম্প্রসারণে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে।
এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং বলেন, “এখন এআই প্রতিযোগিতা তীব্র আকার নিয়েছে।” তার মতে, চারটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যয় বছরে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি ডলারে।

“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এআই… জিডিপির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াবে। সেই এআই অবকাঠামোর বড় একটি অংশের মূল ভিত্তি তৈরি করছি আমরা।”
বিনিয়োগ কোম্পানি ‘ওয়েলথিফি’র প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা কোলিন ম্যাকহিউ বলেছেন, “বর্তমানের এই এআই উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে এনভিডিয়া।
“সত্যি বলতে, চিপ বাজারে এনভিডিয়ার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।”
তিনি আরও বলেছেন, কোম্পানিটি আয়ের জন্য বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর ‘অসম্ভব নির্ভরশীল’ এবং এসব কোম্পানি যত বেশি চিপ কিনবে এনভিডিয়ার ‘লাভ ও শেয়ারের দাম তত বাড়তে থাকবে’।
কোম্পানিটির ডেটা সেন্টার থেকে আয় ৫৬ শতাংশ বেড়ে চার হাজার একশ ১০ কোটি ডলার হলেও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে এ সংখ্যা কম। কারণ তারা আশা করেছিলেন আয় আরও একটু বেশি হবে।
বিনিয়োগকারী ও ‘প্যাশন ক্যাপিটাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা আইলিন বারব্রিজ বলেছেন, শেয়ারের দাম কিছুটা ‘পড়েছে’ কারণ কোম্পানিটির ডেটা সেন্টার বিভাগ আশানুযায়ী ফলাফল দিতে পারেনি। তবে ‘অবিশ্বাস্য রকমের’ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কোম্পানিটি।
“স্পষ্টই এত বেশি অর্থ এনভিডিয়াতে বিনিয়োগ হয়েছে যে, বাজারে অনেক বেশি বুদবুদের মত পরিস্থিতি তৈরি করেছে তারা।”
জুলাইয়ে এনভিডিয়ার বাজার মূল্য এতটাই বেড়েছে যে চার ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠেছে কোম্পানিটি।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারাভিত্তিক এআই চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া বলেছে, চলতি প্রান্তিকে তাদের আয় সম্ভবত পাঁচ হাজার চারশ কোটি ডলার পর্যন্ত যাবে, যা ওয়াল স্ট্রিটের বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস থেকেও বেশি।
‘ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা’
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার টানাপোড়েনের কারণে এখনও ব্যবসায় ঝুঁকি বা বাধা রয়েছে এনভিডিয়ার।
জুলাইয়ে কোম্পানিটি ঘোষণা করেছে, নিজেদের উন্নতমানের এআই চিপ আবার চীনে বিক্রি শুরু করবে তারা।
হুয়াং ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন যাতে কোম্পানির ‘এইচ২০’ নামের চিপটি চীনে বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপরই চীনে চিপ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় এনভিডিয়া। ‘এইচ২০’ চিপটি বিশেষভাবে চীনের বাজারে বিক্রির জন্য তৈরি করেছে কোম্পানিটি।
এনভিডিয়ার এসব চিপ চীনের সামরিক কাজের পাশাপাশি দেশটির এআই ডেভেলপাররাও ব্যবহার করে উপকার পেতে পারেন এমন উদ্বেগের কারণে এই চিপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
বুধবার কোম্পানিটির নির্বাহীরা বলেছেন, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ থেকে চীনা গ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এসব এইচ২০ চিপ বিক্রির বিভিন্ন লাইসেন্স পর্যালোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
কোম্পানিটি আরও বলেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু চীনা গ্রাহক এইচ২০ চিপ কেনার অনুমতি পেলেও এখনো পর্যন্ত তাদের কাছে এসব চিপ বিক্রি করেনি তারা।
বিবিসি লিখেছে, সরকারের অনুমতি নিয়ে যেসব এইচ২০ চিপ বিক্রি হবে সেই বিক্রির ১৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাওয়ার আশা করছে।
কোম্পানিটি নিজেদের চলতি প্রান্তিকের আয়ের হিসাবে এইচ২০ চিপকে ধরেনি। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে তারা যাতে ব্ল্যাকওয়েল চিপ চিপ চীনে বিক্রির অনুমতি মেলে। কারণ, চীন হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় বাজার।
এদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, এনভিডিয়া যে বাজারে এখন আধিপত্য করছে, সেখানে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন কোম্পানির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে চীন।
‘ইমার্কেটার’ বিশ্লেষক জ্যাকব বোর্ন বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চীনের নিজস্ব চিপ তৈরির প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করে চলেছে।”
তিনি বলেছেন, বর্তমানে এনভিডিয়া রোবোটিক্স নিয়ে কাজ শুরু করছে। এখন প্রশ্ন হল, কোম্পানিটির ‘রোবোটিক্সে প্রবেশ’ কি ‘এআই অর্থনীতির পথপ্রদর্শক’ হিসেবে এনভিডিয়াকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে কি না।