Published : 14 Feb 2026, 12:15 PM
পৃথিবীর বুকে প্রথম কারা শুরু করেছিল ঘাস-লতা খাওয়া? সম্প্রতি এ প্রশ্নের উত্তর বদলে দিয়েছে কানাডার নোভা স্কোশিয়া প্রদেশে আবিষ্কৃত ৩০ কোটি ৭০ লাখ বছর আগের এক জীবাশ্ম।
রয়টার্স লিখেছে, পৃথিবীর প্রাচীনতম তৃণভোজী বা উদ্ভিদভোজী ডাঙার মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম এ প্রাণীটিকে প্রাণিজগতের বিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
‘টিরান্নোরোটার হেবার্টি’ নামের এ প্রাণীটির মাথার খুলি ছিল অনেকটা ত্রিভুজ আকৃতির। এ বিশেষ গড়নটি একে শক্ত লতাপাতা বা উদ্ভিদ খাওয়ার জন্য চোয়ালের শক্তিশালী পেশি তৈরিতে সাহায্য করত। এর মুখে রয়েছে বিশেষ ধরনের দাঁত, যা দিয়ে গাছপালা পিষে বা চিবিয়ে সহজে হজম করত এ প্রাণী।
টিরান্নোরোটার দেখতে সরীসৃপের মতো হলেও আসলে তা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। একে ‘মাইক্রোসর’ নামের বিশেষ এক প্রাণিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন গবেষকরা। এখন পর্যন্ত কেবল এর মাথার খুলিটি খুঁজে পাওয়া গেছে।
তবে, এর সমগোত্রীয় প্রাণীদের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারণা করছেন, প্রাণীটি লম্বায় প্রায় ১২ ইঞ্চি। এর দেহ বর্তমান সময়ের ‘ব্লু-টাংড স্কিংক’ বা এক ধরনের নীল জিভওয়ালা টিকটিকি’র মতো বেশ শক্তপোক্ত বা স্থুল গড়নের।
পৃথিবীতে কার্বনিফেরাস যুগে বাস করা প্রাণীটি ‘টেট্রাপড’ নামের চার পাওয়ালা এক বিশাল বংশধারার প্রাথমিক সদস্য। এ টেট্রাপডরাই আজকের উভচর, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী ও পাখিদের পূর্বপুরুষ।
এ অগ্রগামী টেট্রাপডরা এমন ধরনের মাছ থেকে বিবর্তিত হয়েছিল যাদের পাখনার বদলে মাংসল অঙ্গ ছিল। এরাই ছিল পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসা পৃথিবীর প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী। সবচেয়ে প্রাচীন টেট্রাপড কঙ্কালের বিভিন্ন জীবাশ্ম প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি বছর আগের।
শুরুর দিকে এসব টেট্রাপড ছিল মাংসাশী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের কেউ কেউ পতঙ্গভোজী হয়ে ওঠে এবং পরে এ টিরান্নোরোটার-এর মতো প্রাণীরা উদ্ভিদ বা ঘাস-লতা খাওয়া শুরু করে।
শিকাগোর ‘ফিল্ড মিউজিয়াম’-এর জীবাশ্মবিদ ও এ গবেষণার সহ-লেখক আরজান ম্যান বলেছেন, “এটি গুরুত্বপূর্ণ এক আবিষ্কার। কারণ, এর থেকে প্রমাণ মেলে, আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রাণিজগতের যে ভারসাম্য, যেখানে তৃণভোজী প্রাণীদের প্রাধান্য বেশি দেখি তা সেই কার্বনিফেরাস যুগ থেকেই চলে আসছে ও টিকে আছে।”

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও’তে ‘মেলানেডাফোডন’ নামের এক প্রাণীর জীবাশ্ম মিলেছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, ওই প্রাণী পতঙ্গের পাশাপাশি তুলনামূলক নরম গাছপালা খেত। গবেষকদের ধারণা, আলোচিত এ টিরান্নোরোটারও হয়ত পতঙ্গ খেত। তবে এর মাথার খুলি মেলানেডাফোডনের চেয়ে শক্ত গাছপালা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য অনেক বেশি উপযোগী।
গবেষক আরজান ম্যান বলেছেন, “টিরান্নোরোটার হচ্ছে ডাঙার সবচেয়ে প্রাচীন ও পূর্ণাঙ্গ মেরুদণ্ডী তৃণভোজী প্রাণী, যার দেহের গঠন উচ্চ আঁশওয়ালা উদ্ভিদ হজমের উপযোগী।”
কার্বনিফেরাস যুগে পৃথিবীজুড়ে ছিল বিশাল ও ঘন জঙ্গল, যেসব বনের জীবাশ্ম থেকেই আজকের বিশ্বের অধিকাংশ কয়লা তৈরি হয়েছে। বিবর্তনের এক পর্যায়ে নিজেদের খাবারের তালিকায় ‘স্যালাদ’ বা গাছপালা যোগের সিদ্ধান্ত নেয় টেট্রাপডরা। এমনটি সম্ভবের জন্য টিরান্নোরোটারের মতো শক্তিশালী দাঁত ও চোয়ালের পেশি বিবর্তিত হয়েছে।
গবেষক আরজান ম্যান বলেছেন, “প্রশ্নটি ছিল, ‘আমি কীভাবে বিভিন্ন ধরনের খাবার থেকে শক্তি পেতে পারি?’ আর কার্বনিফেরাস যুগের সেই ম্যানগ্রোভ সদৃশ বা সুন্দরী বা গরান বনের মতো লোনাপানির বনগুলোতে অনেক উদ্ভিদ ছিল, যা এদের জীবনধারণের জন্য ছিল চমৎকার এক সহজলভ্য সমাধান।”
টিরান্নোরোটারের মাথার খুলিটি ছিল প্রায় ৪ ইঞ্চি লম্বা। অটোয়ার ‘কার্লটন ইউনিভার্সিটি’র প্রধান গবেষক ও জীবাশ্মবিদ হিলারি ম্যাডিন বলেছেন, “এর মাথার খুলিটি বেশ মজবুত।
“এ যে এক তৃণভোজী প্রাণী ছিল তার প্রমাণ মেলে এর নিচের দিকে বাঁকানো নাকের গড়নে, যা নিচু ঝোপঝাড় বা গাছপালা কাটার জন্য একেবারে সঠিক কোণে তৈরি। এর ভেতরের বড় গহ্বর শক্তিশালী মাংসপেশি ধরে রাখতে পারত। সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, এর মুখের ভেতরকার দাঁতের বিশেষ বিন্যাস, যা এর তালুতে বা মুখের উপরের অংশে এমন এক সারি দাঁত, যা নিচের চোয়ালের দাঁতের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যেত। অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যেও দাঁতের এমন চমৎকার বিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়।”
প্রাণীটির মাথার খুলির ভেতরটা দেখার জন্য সিটি স্ক্যান করেছেন গবেষকরা। এর ফলে তারা এর মুখের তালুতে ডজন ডজন মোচাকৃতি দাঁত খুঁজে পান। এর গণ বা বংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিরান্নোরোটার’, যার অর্থ ‘অত্যাচারী খননকারী’।
সেই সময়ের তুলনায় এর বিশাল আকার ও মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করা– এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই প্রাণীটির এমন নাম দিয়েছেন গবেষকরা। এর প্রজাতির নাম ‘হেবার্টি’ রাখা হয়েছে গবেষক ব্রায়ান হেবার্টের সম্মানে। নোভা স্কোশিয়ার আটলান্টিক উপকূলে কেপ ব্রেটন দ্বীপের পাথুরে পাহাড়ে এ খুলিটি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, কার্বনিফেরাস যুগের একেবারে শেষদিকে প্রায় ২৯ কোটি ৯০ লাখ বছর আগে প্রথম প্রকৃত মেরুদণ্ডী তৃণভোজী প্রাণীদের আবির্ভাব ঘটেছিল।
গবেষক ম্যাডিন বলেছেন, “এ আবিষ্কার থেকে ইঙ্গিত মেলে, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত আধুনিক যুগের মতো বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।”
উদ্ভিদ খাওয়ার আগে পতঙ্গ খাওয়া সম্ভবত বড় ধাপ ছিল। আরজান ম্যান বলেছেন, “এ গবেষণা সেই ধারণাটিকে আরও মজবুত করেছে যে, পতঙ্গভোজী হওয়া ছিল তৃণভোজী হওয়ার আগের প্রস্তুতি। তৃণভোজী পতঙ্গগুলোকে খাওয়ার মাধ্যমেই এসব টেট্রাপড নিজেদের পেটে সেই প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া পেয়েছিল, যা উদ্ভিদজাতীয় খাবার হজম করতে সাহায্য করে।”