Published : 22 Apr 2026, 10:12 AM
প্রায় দেড় দশক ধরে অ্যাপলের নেতৃত্ব দিয়েছেন টিম কুক। এই সময়ে নানা কারণে প্রশংসিত বা সমালোচিত হয়েছে বিশ্বে সবচেয়ে দামি কোম্পানি অ্যাপল। স্বাভাবিকভাবেই তার কিছুটা এসে পড়েছে টিম কুকের ওপরও।
২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে কুক যখন সিইও’র দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিলেন, স্টিভ জবসের এই উত্তরসূরীকে তার মেন্টরের সঙ্গে তুলনা করা যেতেই পারে।
যে অবস্থায় দায়িত্ব নিলেন কুক
২০১১ সালে সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস স্বাস্থ্যগত কারণে নেতৃত্ব ছাড়েন। সে সময় বেশ কয়েকজন ছিলেন সম্ভাব্য সিইও হিসাবে আলোচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল অ্যাপলের ডিজাইন গুরু জনি আইভের নাম, সঙ্গে ছিল সে সময়ে অ্যাপলের উঠতি তারকা স্কট ফোরস্টাল।
অ্যাপলের যে কোনো পণ্য কোনো ব্র্যান্ডিং ছাড়া কারো হাতে তুলে দিলে অভিজ্ঞজন অনায়াসেই বলতে পারবেন, হাতের গ্যাজেটটি অ্যাপলের। এর মূল কারণ, পণ্যের ‘লুক অ্যান্ড ফিল’। এই দুজনই ছিলেন মোটাদাগে অ্যাপল পণ্যে লুক অ্যান্ড ফিলের কারিগর। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসত স্টিভ জবসের কাছ থেকেই।

জনি আইভ ছিলেন অ্যাপলের ডিজাইন প্রধান। আর স্কট ফোরস্টাল ছিলেন অ্যাপলের ফ্ল্যাগশিপ আইটেম আইফোনের অপারেটিং সিস্টেমের প্রধান। পরে তিনি আইপ্যাডের ওএস নিয়েও কাজ করেছেন। এক সময় মনে করা হচ্ছিল, স্কটই হতে যাচ্ছেন ‘পরবর্তী স্টিভ জবস’।
অথচ জবস এই দুজনকে বাদ দিয়ে তুলে আনলেন এমন একজনকে, যিনি আর্ট, ক্রাফট বা অ্যাস্থেটিক্স নয়, সামলেছেন সাপ্লাই চেইনের মতো একেবারে নিরস বিষয়।
জবসের মন্ত্র
দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সময় জবস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপদেশ দিয়েছিলেন টিম কুককে, সেটি হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কখনও ভাববে না স্টিভ (জবস) এটা কীভাবে করত। তুমি নিজের মতো করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।
জীবদ্দশাতেই স্টিভ জবসকে বলা হত, বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত সিইও। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই জবসের উত্তরসূরী হওয়া ছিল সম্ভবত কর্পোরেট বা প্রযুক্তি বিশ্বে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ।
কঠিনতম সিদ্ধান্তই শুরুর দিকে
দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পরেই টিম কুক বললেন, অ্যাপল শেয়ার মালিকরা ডিভিডেন্ট পাবেন। তিনি যে স্টিভ জবস নন, এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অ্যাপলে দ্বিধাহীনভাবে প্রয়োগ করবেন সে ইঙ্গিতই ছিল তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে।
এর পরপরই এল শৃঙ্খলা বজায় রাখার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানির অসম্ভব প্রতিভাবান নেতৃত্বকে কোম্পানির জন্য সবচেয়ে ফলাদায়ক কাঠামোয় রাখতে পারা সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটা।
স্কট ফোরস্টাল ছিলেন আইওএস-এর প্রথম প্রধান। এর চেহারা কেমন হবে সেটিও তিনিই ঠিক করেছিলেন, যা পরিচিত ছিল ‘স্কিওমরফিক’ চেহারা হিসাবে। এতে প্রতিটি আইকন দেখলে মনে হত সত্যিকারের থ্রিডি অবজেক্ট।
কিন্তু, গোলমাল বাধল যখন নকশা প্রধান জনি আইভ ফ্ল্যাট আইকন প্রস্তাব করলেন।
যা হোক, সে যাত্রায় স্কটের পছন্দই থাকল। কেলেঙ্কারি বাধল অ্যাপল ম্যাপস নিয়ে, যার প্রধানও ছিলেন স্কট। ম্যাপস-এর আপডেটে দেখা গেল বিখ্যাত সব ল্যান্ডমার্ক যেন গলে গেছে। অ্যাপল ম্যাপ ধরে চালকরা গিয়ে পড়লেন হয় মরুভূমিতে, নয়তো কোনো কানাগলির মাথায়।

প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস যেখানে বলতেন, অ্যাপলের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকের জন্য ‘মাথা নষ্ট করা’ ভালো (ইনসেইনলি গ্রেট) পণ্য তৈরি করা, সেখানে ম্যাপস-এর এমন কেলেঙ্কারি মেনে নেওয়া অসম্ভব।
টিম কুক দাবি করলেন, এজন্য স্কটকেই ক্ষমা চাইতে হবে। ২০১২-১৩ সালের পত্রিকার খবর ঘাটলে দেখা যাবে, স্কট বলছেন, টিম কুক কোম্পানি প্রধান, ক্ষমা চাইলে তারই চাওয়া উচিত।
অ্যাপল গ্রাহকদের কাছে শেষ পর্যন্ত টিম কুকই ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে ছাঁটাই করলেন ‘ফাদার অফ আইওএস’ স্কট ফোরস্টালকে।
আরও পরিবর্তন এল অ্যাপলে
অ্যাপল ওয়েবসাইটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেইজ আছে, যার নাম ‘অ্যাপল লিডারশিপ’। ওই পেইজ থেকেই জানা সম্ভব হয়, অ্যাপলে কোন বিভাগের প্রধান কে।
ইন্টারনেট আর্কাইভ বা ওয়েব্যাক মেশিন ব্যবহার করে চলে যান ২০১১ সালের আগের কোনো অ্যাপল লিডারশিপ পেইজে – চারিদিকে কেবল মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ পুরুষ।
হ্যাঁ, নারী একজন ছিলেন বটে, তার নাম কেইটি কটন, অ্যাপলের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক। স্টিভ জবসের জীবনীতে জানা যায়, তার কাজ ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য না করা, অথবা বলা, এ বিষয়ে অ্যাপলের কিছু বলার থাকলে অ্যাপল নিজে থেকেই তা জানাবে।
অ্যাপল লিডারশিপের এই পুরুষপ্রধান চেহারা বদলেছেন টিম কুক। এনেছেন ডাইভার্সিটি বা বৈচিত্র্য। টিম কুক যখন অ্যাপল প্রধানের দায়িত্ব ছাড়বেন, তখন অ্যাপল সিইওর ঠিক পরেই ১০ জনের মধ্যে তিনজন নারী নেতৃত্ব রেখে যাবেন। এদের মধ্যে অন্যতম ডিয়ের্ড্রা ও’ব্রায়েন, অ্যাপলের মানবসম্পদ প্রধান।

কেবল লিডারশিপেই নয় পরিবর্তন ঘটেছে সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও। স্টিভ জবসের আমলে, মানে ২০১১ পর্যন্ত, কোম্পানি ডাইভার্সিটি নিয়ে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে, ২০১৪ সালের বার্ষিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সে সময়ের কর্মীদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগের কম ছিলেন নারী। ১০ বছরের মধ্যে অ্যাপলে প্রায় এক লাখ জনবলের মধ্যে নারীদের সংখ্যা উঠে আসে ৪৭ শতাংশে।
জবস যেখানে ছিলেন শীর্ষ প্রতিভা খোঁজা আর সেরা পণ্য তৈরিতে বুঁদ হয়ে থাকা প্রতিভা, কুক সেখানে যোগ করেছেন বৈচিত্র্য আর সামাজিক দায়বদ্ধতা।
আর, ফরচুন ফাইভ হানড্রেড কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রথম এই সমকামী সিইও বৈচিত্র্য নিশ্চিতে নিজের প্ল্যাটফর্ম যতটা সম্ভব ব্যবহার করেছেন।
মনোযোগে ভিন্নতা
২০১০ সাল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রযুক্তি সম্পাদক ওয়াল্ট মসবার্গ সে সময় বার্ষিক এক প্রযুক্তি সম্মেলন করতেন, নাম ‘অল থিংস ডিজিটাল’। সে আয়োজনের মঞ্চে জবসের বন্ধু-সাংবাদিক মসবার্গ প্রশ্ন করেন স্টিভ জবসকে – অ্যাপল তো কোম্পানির মূল্য বিচারে মাইক্রোসফটকে ছাড়িয়ে গেল। এ বিষয়ে তোমার অনুভূতি কী?
স্টিভ জবস গর্ব করেই বললেন, এই তুলনা তার কাছে পরাবাস্তব বিষয়। “আমরা কেউ সকালে এই ভেবে ঘুম থেকে উঠি না যে অর্থের পরিমানে মাইক্রোসফটকে টেক্কা দিতে হবে। আমরা অসাধারণ মানুষদের জন্য অসামান্য পণ্য তৈরি করতে চাই। আর সেটা যদি করতে পারি, সাফল্য এমনিতেই আসবে।”
জবস একেবারেই ছিলেন ট্যালেন্ট আর পণ্য নিয়ে মেতে থাকা একজন জিনিয়াস। তার আগ্রহের মূল বিষয় ছিল ইউজার এক্সপেরিয়েন্স। মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক কী হবে।
তার সম্ভবত সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ছিল, যে জিনিস এখনও তৈরি হয়নি, সেটা হাতে পেলে মানুষ তা কীভাবে নেবে সেটি বুঝতে পারা। উদাহরণ- সিপিইউ আর মনিটর মিলিয়ে আইম্যাক, একেবারেই কোনো মনিটর, কিবোর্ড, মাউস ছাড়া বিক্রি করা ম্যাক মিনি, কোনো বাটন ছাড়া পুরো ফোনজুড়ে স্ক্রিনওয়ালা আইফোন বা কোনো স্ক্রিন ছাড়াই আইপড শাফল।
অপরদিকে টিম কুক মনোযোগ দিয়েছেন অ্যাপল পণ্যের সহজলভ্যতায়, মানুষের ক্রয় ক্ষমতার আওতায় দাম নিয়ে আসায়। তিনি মনোযোগ দিয়েছেন মানুষের ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেওয়ায়, শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়।
জবস যেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে চেয়েছেন তার পণ্য দিয়ে, কুক সেখানে এসে যোগ করেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়।
‘ওয়ান মোর থিং’
জীবদ্দশায় স্টিভ জবস অ্যাপলের ইভেন্টগুলোয় সাধারণত চমক জাগানো কোনো আইটেম রাখতেন একেবারে শেষে। ওই শেষ পর্বের শুরুতেই তিনি জানাতেন, সবশেষে আরও একটি ঘোষণা আছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘ওয়ান মোর থিং’ ছিল ২০০৭ সালের ম্যাকওয়ার্ল্ড কনফারেন্স, যেখানে উন্মোচিত হয় প্রথম আইফোন।
জবসের সেই রেওয়াজ পরে টিম কুকও কখনও কখনও বজায় রেখেছেন।
স্টিভ জবসের ক্ষেত্রে তার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকত অ্যাপলের পণ্য, এবং এর জন্য তিনি বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও রাজি ছিলেন।
টিম কুক সে হিসাবে কৌশলী। তিনি পণ্য উন্নয়ন ও প্রোডাক্ট লাইন পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়েছেন, তবে কোম্পানি হিসেবে অ্যাপলকেই দিয়েছেন বেশি অগ্রাধিকার।
এই পার্থক্য অবশ্যই একেবারে নিরেট নয়, বরং দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কথা বলে। ১৯৯৭ সালে যখন অ্যাপল ক্রমশ দেউলিয়া হওয়ার পথে এগোচ্ছে, সে সময় নেক্সট অধিগ্রহনের মাধ্যমে অ্যাপলে ফিরলেন জবস। আনুষ্ঠানিক সে ঘোষণায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মাইক্রোসফটের সঙ্গে পার্টনারশিপে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি, সেইসঙ্গে নিয়েছিলেন আর্থিক বিনিয়োগ। আর এটা তিনি করেছিলেন অ্যাপলকে বাঁচাতেই।
আবার অ্যাপল যেদিন ২২৯ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যে পৌঁছে মাইক্রোসফটকে পেছনে ফেলল, সেদিনের অর্জনকে জবস লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি।
অন্যদিকে, টিম কুকের সময়ে অ্যাপল প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হয়ে ওঠে।
জবস তার ক্যারিয়ারের গোটা সময়ে কোনো না কোনো পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত থেকেছেন—আইফোন, আইপ্যাড, আইপড বা ম্যাকবুক।
আর টিম কুক তার সময়টায়, মোটা দগে বললে, সবচেয়ে বড় প্রকল্পকেই মনোযোগের কেন্দ্রে রেখেছেন—সেই প্রকল্পের নাম অ্যাপল, যেটা স্টিভ জবস তার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন।