১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আসক্তির যন্ত্র’ বানিয়েছে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব: আদালতে অভিযোগ

এই বিচার প্রক্রিয়ায় মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ, ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরি ও ইউটিউব সিইও নিল মোহনের সাক্ষ্য নেবে আদালত।

‘আসক্তির যন্ত্র’ বানিয়েছে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব: আদালতে অভিযোগ
এই মামলার রায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ঝুলে থাকা একই ধরনের অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Feb 2026, 06:09 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:47 PM

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে যুগান্তকারী এক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে বিশ্বে বড় সব প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নামে আসলে ‘আসক্তি তৈরির যন্ত্র’ বানিয়েছে। 

এ নিয়ে চলতি মামলায় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের বিভিন্ন প্রভাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিবিসি লিখেছে, লস অ্যাঞ্জেলেস সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক ক্যারোলিন বি. কুল ও জুরির সামনে নিজের ‘ওপেনিং স্টেটমেন্ট’ বা প্রারম্ভিক বক্তব্যে আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার যুক্তি দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তার মক্কেল ‘কেজিএম’।

“এসব কোম্পানি এমন সব কৌশল বা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা শিশুদের মস্তিষ্ককে আসক্ত করবে, এমন বিষয়টি মাথায় রেখেই নকশা করা এবং সজ্ঞানে ও  উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এটি করেছে তারা।

এদিকে, মেটা ও ইউটিউবের আইনজীবীরা জুরিদের বলেছেন, কেজিএম-এর আসক্তি তার ব্যক্তি জীবনের অন্যান্য সমস্যা থেকে তৈরি হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানির অবহেলার কারণে নয়।

আদালতে কেজিএম-কে তার নামের আদ্যক্ষর বা ‘কেলি জিএম’ হিসেবে উল্লেখ করা হবে। কারণ তার ওপর হওয়া এসব ঘটনার সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন তিনি।

ল্যানিয়ার অভিযোগ, নিজেদের প্ল্যাটফর্মের ডিজাইনের কারণে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য যে ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে আগে থেকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা ও ইউটিউব।

ল্যানিয়ার বলেছেন, “মামলাটি ইতিহাসের অন্যতম ধনী দুটি কোম্পানিকে নিয়ে, যারা শিশুদের মস্তিষ্কে সুকৌশলে আসক্তি তৈরি করেছে। আমি আপনাদের দেখাব এসব কোম্পানি কেমন ‘আসক্তি তৈরির যন্ত্র’বানিয়েছে, দেখাব এমন কিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র, যা সাধারণত দেখার সুযোগ মেলে না এবং দেখাব মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ ও ইউটিউব নির্বাহীদের পাঠানো নানা ইমেইল।”

২০১৫ সালের ইমেইলের এক নির্বাচিত অংশ আদালতে দেখান ল্যানিয়ার, যেখানে জাকারবার্গ নির্দেশ দিয়েছিলেন মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের কাটানো সময় যেন অন্তত ১২ শতাংশ বাড়ে, যাতে কোম্পানির ব্যবসায়িক লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়।

ইউটিউবের বিষয়ে ল্যানিয়ার বলেছেন, গুগল মালিকানাধীন এ প্ল্যাটফর্মটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তরুণ ব্যবহারকারীদের টার্গেট করেছে। কারণ, তাদের বিশেষায়িত ‘ইউটিউব কিডস’ প্ল্যাটফর্মের তুলনায় এ মূল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে বেশি অর্থ দাবি করা যায়।

ইউটিউবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ল্যানিয়ার বলেছেন, প্লাটফর্মটি অভিভাবকদের এমন ব্যস্ততার সুযোগ নিতে চেয়েছিল, যারা সন্তানদের জন্য ‘ডিজিটাল বেবিসিটিং সার্ভিস’ খুঁজছিলেন।

মেটার কাছে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এলে তাদের আইনজীবী পল শ্মিট জুরিদের সামনে প্রশ্ন তোলেন যে, কেজিএম-এর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির পেছনে ইনস্টাগ্রাম কি সত্যিই প্রধান কোনো কারণ ছিল?

পারিবারিক অশান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে কেজিএম-কে তুলে ধরেছেন শ্মিট। তিনি বলেছেন, অবহেলা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ও নিজের মা-বাবার মাধ্যমেই লাঞ্ছিত হয়েছে কেজিএম।

প্ল্যাটফর্মের ডিজাইনের কারণে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য যে ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে আগে থেকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা ও ইউটিউব। ছবি: রয়টার্স

প্ল্যাটফর্মের ডিজাইনের কারণে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য যে ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে আগে থেকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা ও ইউটিউব

শ্মিট জুরিদের বলেছেন, কেজিএম-কে শ্রদ্ধা করেন তিনি। কারণ জীবনের কঠিন বিভিন্ন পরিস্থিতি ‘কাটিয়ে উঠতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন’।

আদালতের নথিপত্র উল্লেখ করে শ্মিট আরও বলেছেন, কেজিএম-এর পারিবারিক ইতিহাসে সহিংসতা ছিল ও কেবল তিন বছর বয়স থেকেই তাকে থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল।

প্রজেক্টরের মাধ্যমে শ্মিট আদালতে কেজিএম-এর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে দেওয়া কিছু বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার মা তার ওপর চিৎকার করতেন, তাকে ‘নির্বোধ’ বলতেন এবং এসব কারণে তার মনে আত্মহত্যার ইচ্ছাও জেগেছে।

শ্মিট বলেছেন, “আমি জানি এগুলো খুব কঠিন মন্তব্য। তবে যে মামলার মূল বিষয় মানসিক যন্ত্রণা, সেখানে আপনাদের এসব বিষয়ই বিবেচনা করতে হবে।”

সোমবারের এ কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ছয় সপ্তাহের এক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হল। এই মামলার রায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ঝুলে থাকা একই ধরনের অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, যেগুলোর বিচারও এ বছরেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের এ বিচার প্রক্রিয়ায় মূলত সেসব পরিবারের বিভিন্ন আইনি যুক্তি পরীক্ষা হবে, যারা দাবি করছেন, সামাজিক যোগাযোগ মধ্যম ব্যবহারের কারণে তাদের সন্তানরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে, তাদের অতি ব্যবহারের ফলে তৈরি কোনো পরিস্থিতির দায় নিতে অস্বীকার করছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম।

আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই বিচার প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ, সন্তান হারানো পরিবারের সদস্য সাক্ষ্য দেওয়ার সমন পেয়েছেন। পাশাপাশি, মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ, ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরি ও ইউটিউব সিইও নিল মোহানকেও সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে আদালত।

যারা চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তির বিষয়ে তথ্য ফাঁস করেছিলেন মেটার সেসব সাবেক কর্মীর বক্তব্যও শুনবেন জুরি।

এ মামলার ফলাফল আর্থিক ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন মানদণ্ড হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হাজার হাজার বাদী, তাদের পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোর করা মামলাগুলোতে বড় প্রভাব ফেলবে।

এমনই এক মামলা দায়ের করেছেন ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা, যেখানে প্রসিকিউটররা ক্যালিফোর্নিয়ার একজন ফেডারেল বিচারকের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, মেটাকে যেন তাদের ব্যবসার ধরন ও প্ল্যাটফর্মের ফিচারে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বা কিছু অংশ বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়।