Published : 18 Jan 2026, 10:38 AM
খসখসে গলায় টেক্সান উচ্চারণে যদি কখনো কানে বাজে- “অলরাইট, অলরাইট, অলরাইট!”, হলিউডের সিনেমা নিয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন যে কেউ এক মুহূর্তে বলে ফেলবেন ‘ম্যাথিউ ম্যাকানহে!’। সেই সিগনেচার সংলাপই কপিরাইট করেছেন অভিনেতা। উদ্দেশ্য, এআইয়ের অপব্যবহার থেকে তার স্বকীয়তা রক্ষা করা।
১৯৯৩ সালের ‘ডেইজড অ্যান্ড কনফিউজড’ সিনেমার নাম হয়তো অনেকেরই আর মনে নেই, তবে ওই সিনেমাতেই প্রথম ম্যাকানহে বলেছিলেন “অলরাইট, অলরাইট, অলরাইট!”
এরপর থেকেই এটি হয়ে গেছে ম্যথিউকে চেনানোর সবচেয়ে সহজ টুল। এমনকি যারা অস্কারজয়ী এ অভিনেতাকে নকল করে কথা বলেন, তারাও এই বাক্যাংশ দিয়েই সাধারণত শুরু করেন।
বিবিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিসের ডেটাবেইজে যুক্ত হয়েছে বিশেষ এই ডায়লগ। আর, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এআই অপব্যবহার ঠেকাতে ট্রেডমার্ক আইন ব্যবহার করার চেষ্টা এই প্রথম কোনো অভিনেতার ক্ষেত্রে দেখা গেল।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘ম্যাজিক মাইক’ অভিনেতার কণ্ঠ বা চেহারা কি এরইমধ্যে এআই ব্যবহারে নকল হয়েছে? তার আইনজীবীরা বলছেন, এখনো তেমন নির্দিষ্ট উদাহরণ তারা দেখেননি। তবু আগেভাগেই তারা আইনি দেয়ালটি তুলে রাখতে চান, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ওপথ মাড়াতে গেলে আইনি দায়িত্বটি বেছে নেন।
অভিনেতার আইনজীবী কেভিন ইয়র্ন বলেন, এই উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি হওয়া আর্থিক মূল্যের একটি অংশ ধরে রাখা।
আর নিজে কী ভাবছেন ম্যাকানহে? তিনি ইমেইলে লিখেছেন, “আমার কণ্ঠ বা চেহারার ব্যবহার যখনই হবে, আমি নিশ্চিত হতে চাই যে সেটি আমার অনুমোদন ও স্বাক্ষর নিয়ে হয়েছে।”
“এআই দুনিয়ায় মালিকানা আর সম্মতির স্পষ্ট সীমা থাকা দরকার।”
ম্যাকানহে ও তার স্ত্রী ক্যামিলার তৈরি অলাভজনক সংগঠন ‘জাস্ট কিপ লিভিন ফাউন্ডেশন’-এর বাণিজ্যিক শাখা থেকে এসব ক্লিপ ট্রেডমার্ক হিসেবে নিবন্ধন করা হয়েছে।
এআই ও কপিরাইট নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আলিনা ট্রাপোভা বলছেন, তারকাদের জন্য এআই এখন বড় মাথাব্যথার কারণ। বিবিসিকে তিনি বলেন, অনেক সময় বিষয়টি শুধু সুনাম রক্ষার নয়, বরং ‘হারানো লাইসেন্সিং সুযোগের’ প্রশ্নও। তার মতে, ডিপফেইকের মতো অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়তে থাকায় তারকারা নতুন নতুন সুরক্ষা পথ খুঁজছেন।
মজার বিষয় হলো, ম্যাকানহে নিজে এআইয়ের ঘোর বিরোধী নন। বরং তিনি কয়েক বছর ধরে এআই কণ্ঠ মডেলিং স্টার্টআপ ইলেভেনল্যাবসে বিনিয়োগকারী। এই কোম্পানিটি তার অনুমতি নিয়েই তার এআই কণ্ঠও তৈরি করেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী, তবে শর্ত একটাই, নিয়ন্ত্রণ যেন তার হাতেই থাকে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. স্যান্ড্রা ওয়াখটার মনে করেন, আগামীতে আরও অনেক শিল্পী এই পথে হাঁটতে পারেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, “কোম্পানির জন্য কারও কাজ নিয়ে মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া সহজ। কিন্তু সেই কাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন।”
বিনোদন দুনিয়ায় এআই বিতর্ক এর মধ্যেই তুঙ্গে। ২০২৪ সালে স্কারলেট জোহানসন নিজের কণ্ঠের মতো শোনায় এমন একটি চ্যাটবট চালু হওয়ায় “হতবাক” ও “ক্ষুব্ধ” হয়েছেন। পরে ওপেনএআই সেই কণ্ঠ সরিয়ে নেয়, যদিও তাদের দাবি, ‘নকল করার উদ্দেশ্যে’ তারা বিশেষ ওই কণ্ঠ তৈরি করেননি।
২০২৫ সালের জুনে ডিজনি ও ইউনিভার্সাল এআই স্টার্টআপ মিডজার্নির বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, কোম্পানিটির ইমেজ জেনারেটর “নকলবাজদের জন্য এক সীমাহীন সুরঙ্গ” তৈরি করেছে। একই বছরে ইলন মাস্কের এক্স প্ল্যাটফর্মে থাকা একটি এআই ভিডিও টুল টেইলর সুইফটের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও তৈরি করায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ভার্জের প্রতিবেদনে সে সময় উঠে এসেছে, গ্রক ইমাজিনের “স্পাইসি” মোড কোনো অনুরোধ ছাড়াই এমন ভিডিও বানিয়েছে।
সব মিলিয়ে ম্যাকানহের এই পদক্ষেপ একটি বার্তা দিচ্ছে। এআইয়ের যুগে শুধু প্রযুক্তি এগোচ্ছে না, পাল্টাচ্ছে তারকাদের নিজেদের পরিচয় আর কণ্ঠ রক্ষার লড়াইও। সামনে এই লড়াই কতটা আইনি পথে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার।