Published : 01 Jan 2026, 01:36 PM
মহাকাশ বা পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার উপরে কারখানা স্থাপন করে সেখানে উন্নতমানের পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি বর্তমানে আমাদের কাছে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হতে পারে।
তবে এ বিষয়টিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফভিত্তিক কোম্পানি ‘স্পেস ফোর্জ’।
বিবিসি লিখেছে, মাইক্রোওয়েভ ওভেন আকারের একটি কারখানা কক্ষপথে পাঠিয়েছে কোম্পানিটি। স্পেস ফোর্জ প্রমাণ করেছে, ওই কারখানার চুল্লিটি চালু করা সম্ভব, যা প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করতে পারে।
সেমিকন্ডাক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির পরিকল্পনা করছে কোম্পানিটি। মহাকাশে তৈরি এসব উন্নতমানের উপাদান পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটিং ও পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতিতে ব্যবহার হবে।
মহাকাশের পরিবেশ সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য আদর্শ জায়গা। কারণ এসব সেমিকন্ডাক্টর যেসব পরমাণু দিয়ে গঠিত সেগুলো সেখানে খুব সুশৃঙ্খলভাবে ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি কাঠামোতে সাজানো থাকে।
পৃথিবীতে অভিকর্ষ বলের কারণে পরমাণুগুলো সব সময় সমানভাবে সাজানো যায় না। তবে মহাকাশে ওজনহীনতা বা ‘জিরো গ্র্যাভিটি’ থাকার কারণে এমনটি সম্ভব। ওজনহীন পরিবেশে পরমাণুগুলো একদম নিখুঁতভাবে সাজানো যেতে পারে।
এ ছাড়া, মহাকাশের বায়ুশূন্য অবস্থা কোনো ধরনের দূষিত কণা বা অপদ্রব্য পরমাণুর ভেতরে ঢুকে না পড়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করে। সেমিকন্ডাক্টর যত বেশি বিশুদ্ধ ও সুশৃঙ্খল হবে তা তত বেশি কার্যকর বা উন্নত হয়।
স্পেস ফোর্জ-এর প্রধান নির্বাহী জশ ওয়েস্টার্ন বলেছেন, “আমরা এখন যে ধরনের কাজ করছি এর মাধ্যমে বর্তমানে পৃথিবীতে তৈরি করা সেমিকন্ডাক্টরের চেয়ে মহাকাশে প্রায় চার হাজার গুণ বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করা সম্ভব।
“এ ধরনের সেমিকন্ডাক্টর আপনার মোবাইল ফোনের সিগনাল পাওয়া যায় এমন ফাইভজি টাওয়ারে, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির চার্জারে ও অত্যাধুনিক বিভিন্ন প্লেনেও ব্যবহৃত হতে পারে।”
এ বছরের গ্রীষ্মে নিজেদের এ ছোট কারখানাটি ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স-এর রকেটে করে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে কোম্পানিটি। এরপর থেকে কার্ডিফে অবস্থিত স্পেস ফোর্জ-এর ‘মিশন কন্ট্রোল’ থেকে এর প্রতিটি সিস্টেম পরীক্ষা করে দেখছেন কর্মীরা।
পৃথিবীতে পাঠানো কারখানাটির একটি ছবি দেখিয়েছেন কোম্পানির ‘পেলোড অপারেশনস লিড’ বা পণ্য পরিচালনা প্রধান ভেরোনিকা ভিয়েরা। চুল্লির ভেতর থেকে তোলা এ ছবিতে দেখা যাচ্ছে প্লাজমা, যা প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত গ্যাস ও প্রচণ্ড তাপে জ্বলছে।
ভিয়েরা বলেছেন, এ ছবিটি দেখতে পাওয়া “আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলোর একটি’।
“বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের মহাকাশে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মূল উপাদানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ফলে কাজটি সফলভাবে করে দেখানো সত্যিই অসাধারণ।”
এতদিন ছোট আকারে পরীক্ষা চালালেও এখন মহাকাশে বড় পরিসরে কারখানা তৈরির পরিকল্পনা করছে কোম্পানিটি, যা দিয়ে প্রায় ১০ হাজারটি চিপ তৈরির প্রয়োজনীয় সেমিকন্ডাক্টর উপাদান তৈরি করা সম্ভব হবে।
এখন নিজেদের এই উৎপাদিত কাঁচামাল বা উপাদান নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তিটিও পরীক্ষা করে দেখছে স্পেস ফোর্জ।
ভবিষ্যতে কোম্পানিটির কোনো এক মিশনে রাজা আর্থারের কিংবদন্তি ঢালের নামানুসারে ‘প্রিডওয়েন’ নামের এক তাপ নিরোধক ঢাল বা হিট শিল্ড ব্যবহার করবে স্পেস ফোর্জ।
কারণ, মহাকাশ থেকে কোনো যান পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে তা আগুনের গোলার মতো উত্তপ্ত হয়ে পুড়ে ছাই হয়। এই প্রচণ্ড তাপ থেকে ভেতরের বিভিন্ন চিপকে বাঁচাবে ‘প্রিডওয়েন।
অন্যান্য কোম্পানিও এখন মহাকাশের দিকে নজর দিচ্ছে, যেখানে ওষুধ থেকে শুরু করে কৃত্রিম টিস্যু বা মানবকোষ তৈরির পরিকল্পনা করছে তারা।