Published : 28 Apr 2026, 11:56 AM
ওপেনএআই নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জগতের শীর্ষ দুই নাম ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের দ্বন্দ্ব আদালতে চরম পর্যায়ে রয়েছে। এক সময়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা থেকে চরম প্রতিদ্বন্দ্বীতে রূপ নেওয়া এ দুই নেতার আইনি লড়াই এখন ঝুলে আছে এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায়।
ওপেনএআইয়ের নিয়ন্ত্রণ, মুনাফা ও আদর্শ নিয়ে এ সংঘাতের নেপথ্যে থাকা নানা গোপন নথি ও ক্ষমতার লড়াই এবার জনসমক্ষে আসতে চলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে ঐতিহাসিক এ মামলাটি শুরু হয়েছে। মামলার নথিতে ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের ব্যক্তিগত ডায়েরির কিছু অংশ প্রকাশ পেয়েছে, যা এই আইনি লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
২০১৭ সালের শরতে ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “ইলনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার এটাই আমাদের একমাত্র সুযোগ। তিনি কি সত্যিই এমন কোনো ‘মহান নেতা’ যাকে আমি বেছে নেব?”
ব্রকম্যানের ডায়েরির এই চাঞ্চল্যকর অংশটি মূলত হাজার হাজার পৃষ্ঠার সেই অভ্যন্তরীণ নথিপত্রেরই অংশ, যা আদালতের নির্দেশে এখন জনসমক্ষে এসেছে।
ওপেনএআইয়ের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাস্ক ২০২৪ সালে কোম্পানিটি এবং এর প্রধান নির্বাহী অল্টম্যান ও ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছেন। এরপর এসব নথি আদালতে প্রকাশ পায়।
এ মামলার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি বলেছেন, ওপেনএআই ও এর অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের কাছে ১৫ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন মাস্ক। তবে এই অর্থ মাস্ক নিজে নেবেন না, ওপেনএআইয়ের দাতব্য শাখায় জমা দেবেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড ফেডারেল আদালতে সোমবার এ বিচারের জন্য জুরি নির্বাচনের পরিকল্পনা হয়েছে এবং মঙ্গলবার থেকে প্রাথমিক যুক্তিতর্ক শুরু হবে।
এসব নথি সেইসব ব্যক্তি ও তাদের অহংবোধের লড়াইয়ের এক বিরল চিত্র তুলে ধরেছে, যা ওপেনএআইকে ব্রকম্যানের অ্যাপার্টমেন্টের এক অলাভজনক গবেষণাগার থেকে বর্তমানে ৮৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের প্রযুক্তি জায়ান্টে পরিণত করেছে।
এ ছাড়া জেনারেটিভ এআই তৈরির পেছনে থাকা ক্ষমতাধর প্রধান নির্বাহীরা এই প্রযুক্তি নিয়ে আসলে কী ভাবছেন সে সম্পর্কেও এসব নথি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
এ বিচার প্রক্রিয়া ওপেনএআইয়ের নেতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে পারে, যা কোম্পানিটির শেয়ার বাজারে আসার সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ধারাবাহিকভাবে এসব অপ্রীতিকর তথ্য প্রকাশ হতে থাকলে এআই প্রযুক্তি নিয়েও সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে বাড়তে থাকা নেতিবাচক ধারণা আরও ঘনীভূত হতে পারে।
এ মামলার মূল বিষয় মাস্কের একটি দাবি। তার অভিযোগ, কোম্পানিটির মূল লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে ওপেনএআই, অল্টম্যান ও মাইক্রোসফট। মানবতার কল্যাণে কাজ করার অলাভজনক লক্ষ্য ছেড়ে ২০১৯ সালের মার্চে ওপেনএআইকে একটি লাভজনক কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যা বিশ্বাসঘাতকতা।
মাস্ক ওপেনএআই বোর্ড থেকে পদত্যাগের ১৩ মাস পর কোম্পানিটির এমন পরিবর্তন ঘটেছিল।
মাস্ক বলেছেন, বিবাদীরা তাদের এ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাকে অন্ধকারে রেখেছিলেন। তারা আদতে তার নাম ও আর্থিক অনুদানকে ব্যবহার করে নিজেদের জন্য ‘অর্থ উপার্জনের মেশিন’ হিসেবে ওপেনএআইকে তৈরি করেছেন। তাকে ও সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করার জন্য তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।
অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি মাস্ক চাইছেন, ওপেনএআই যেন আবারও অলাভজনক কোম্পানিতে ফিরে যায়। তিনি অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে ওপেনএআইয়ের কর্মকর্তার পদ থেকে এবং অল্টম্যানকে বোর্ডের সদস্যপদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পাল্টা যুক্তিতে ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা বলছেন, মাস্ক আসলে ওপেনএআইকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার তাড়না থেকে এবং তার নিজের এআই স্টার্টআপ এক্সএআইকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব করছেন। ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি চালু করে এআই দুনিয়ায় হইচই ফেলে দেওয়ার পরপরই ২০২৩ সালে এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন মাস্ক।
ওপেনএআইয়ের দাবি, কোম্পানিটির নতুন কাঠামো তৈরির আলোচনায় মাস্ক নিজেও যুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজে প্রধান নির্বাহী হওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।
মামলার আরেক বিবাদী মাইক্রোসফটও তাদের বিরুদ্ধে আনা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, মাস্ক কোম্পানি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরই তারা ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
মামলায় যারা সাক্ষ্য দিতে পারেন
এ মামলায় সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মাস্ক, অল্টম্যান ও মাইক্রোসফটের সিইও সাত্যিয়া নাদেলা সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেবেন।
এ ছাড়া ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য ও মাস্কের চার সন্তানের মা শিবন জিলিস এই মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হতে পারেন। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীদের দাবি, তিনি কোম্পানিটির গোপন তথ্য মাস্কের কাছে পাচার করতেন।
এ বিচার প্রক্রিয়াটি উভয় পক্ষের জন্যই সংবেদনশীল এক সময়ে শুরু হচ্ছে।
বর্তমানে অ্যানথ্রপিক এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নজিরবিহীন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে কম্পিউটিং শক্তির পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা ওপেনএআই।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, মোটা অংকের আইপিও বা শেয়ার ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওপেনএআই, যা কোম্পানির বাজারমূল্যকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, মাস্কের কোম্পানিগুলোও একই ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তার এআই স্টার্টআপ এক্সএআই ব্যবহারের দিক থেকে ওপেনএআইয়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমানে মাস্কের রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স এর অন্তর্ভুক্ত এক্সএআই। স্পেসএক্স’ও এ বছর শেয়ার বাজারে আসার পরিকল্পনা করছে, যা হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও।
আদালতের নথি অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ওপেনএআইকে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার প্রাথমিক তহবিল দিয়েছিলেন মাস্ক, যার বেশিরভাগই তিনি দিয়েছিলেন বোর্ড ছেড়ে যাওয়ার আগে।
২০১৯ সালে ওপেনএআই তাদের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে লাভজনক ইউনিটে রূপান্তর হয়, যা অলাভজনক মূল কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হত। ফলে কোম্পানিটি বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সুযোগ পায়, পাশাপাশি অলাভজনক কোম্পানির মূল লক্ষ্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতিও ধরে রাখে।
গত বছরের শরতে ওপেনএআই তাদের কাঠামো আবারও পরিবর্তন করে ‘পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশন’-এ পরিণত হয়।
বর্তমানে এ কাঠামোতে অলাভজনক অংশটি ও মাইক্রোসফটসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে। অলাভজনক অংশটির কাছে ২৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এবং কোম্পানিটি নির্দিষ্ট বাজারমূল্যে পৌঁছাতে পারলে তারা আরও অতিরিক্ত শেয়ার পাওয়ার অধিকার রাখে।
মাস্কের আইনজীবীরা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন ওপেনএআইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য এবং অলাভজনক অংশের মালিকানায় মাস্কের অবদানের অনুপাত বিবেচনা করে। তার দলের দাবি, অলাভজনক অংশটির শেয়ারের ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ মাস্কের দেওয়া তহবিলের মাধ্যমে পেয়েছে।
‘এআইয়ের জন্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট’
মাস্ক ও অল্টম্যান যৌথভাবে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, এমন এক এআই তৈরি করা, যা মানবতার উপকার করবে এবং গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দেবে।
আদালতের নথি বলছে, ২০১৫ সালের মে মাসে অল্টম্যান এ ধারণাটি নিয়ে মাস্কের কাছে যান এবং বিষয়টিকে ‘এআইয়ের জন্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওপেনএআই’তে ইলায়া স্যুটস্কেভারের মতো শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের যোগ করতে মাস্কের উপস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছিল। কোম্পানিটির সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ছিলেন ইলায়া।
আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুসারে, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাস্ক ওপেনএআইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে অল্টম্যান, ব্রকম্যান ও স্যুটস্কেভারের সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি প্রতিশ্রুত তহবিল আটকে দেন।
ইমেইল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, উত্তেজনার একটি বড় কারণ ছিল মাস্ক নিজে সিইও হতে চেয়েছিলেন, যা অন্য উদ্যোক্তাদর অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
ঠিক একই সময়ে, ব্রকম্যানও মাস্কের অবস্থানে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করলে তা মাস্ককে আরও ধনী করে তুলতে পারে কি না।
আর এখানেই ডায়েরির প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। ব্রকম্যান তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “আর্থিকভাবে কোন পথটি আমাকে ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাবে? মাস্কের বিভিন্ন শর্ত মেনে নিলে দুটি বিষয় বাধাগ্রস্ত হবে; আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা (আমরা হয়ত তার সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারি) এবং আমাদের অর্থনৈতিক মুনাফা।”
মাস্কের আইনজীবীরা এ লেখাটিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন এমনটি প্রমাণ করতে যে, ওপেনএআইয়ের নেতারা মূল লক্ষ্যের চেয়ে লাভের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন।
২০১৮ সালের জানুয়ারি নাগাদ ব্রকম্যানের মনে হচ্ছিল, মাস্ক হয়ত আশা ছেড়ে দিয়েছেন। ব্রকম্যান লিখেছিলেন, “গুগলের তুলনায় ওপেনএআই এখন নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হওয়ার পথেই আছে।”
এর কয়েক বছর পর ২০২২ সালের শেষদিকে ওপেনএআই তাদের জনপ্রিয় সেবা চ্যাটজিপিটি চালু করে। এরপরই পুরো গল্পটা পাল্টে যায়, যা নানা মোড় ঘুরে আজ এমন পর্যায়ে এসেছে। এখন কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারে।