Published : 15 Jun 2026, 01:38 PM
পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নদীগুলোর গতিপথও বদলে দিতে পারে প্রকৃতির নাটকীয় পরিবর্তন। সম্প্রতি ইউফ্রেটিস নদীর জন্ম ইতিহাস উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা লাখ লাখ বছর আগে পূর্ব অ্যানাতোলিয়ার টেকটোনিক আলোড়নের হাত ধরে তৈরি হয়েছিল বলে দাবি তাদের।
রয়টার্স লিখেছে, বিশ্বের প্রথম মহানগরী ও লিখিত ভাষার উৎপত্তিস্থল ‘উরেক’ গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদীর অববাহিকায়। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে রাজকীয় শহর ব্যাবিলনের ক্ষেত্রেও এমনটা সত্য।
ইউফ্রেটিস ও এর সঙ্গী নদী ‘টাইগ্রিস’ বা দজলা এ দুই জলপথের মধ্যবর্তী উর্বর সমভূমি ছিল মানব সভ্যতার অন্যতম প্রধান সূতিকাগার।
কয়েক হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এসব নগরীর চেয়ে আরও অতীতের গভীরে গিয়ে করে গবেষকরা এখন উন্মোচন করেছেন, কীভাবে এ ইউফ্রেটিস নদী প্রথম গঠিত হয়েছিল।
ভূগর্ভস্থ পলির ‘সিসমিক ইমেজ’ বা ভূকম্পন চিত্র ও অন্যান্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা বলছেন, আজ থেকে প্রায় ৩৬ লাখ থেকে ১৬ লাখ বছর আগে ইউফ্রেটিস নদীর জন্ম হয়েছিল। বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের টরাস পর্বতমালার টেকটোনিক বা ভূত্বকীয় আলোড়নের কারণে পূর্ববর্তী দুটি নদী ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে এ একক নদীর রূপ নিয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইউফ্রেটিস প্রায় ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা তুরস্ক থেকে উৎপন্ন হয়ে সিরিয়া ও ইরাকের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে।
বর্তমানে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্কের বিরেচিক, সিরিয়ার রাক্কা ও ইরাকের রামাদি, ফালুজা ও নাসিরিয়াহ। প্রাচীনকালে এ নদীর তীরে গড়ে ওঠা বিখ্যাত শহরগুলোর মধ্যে ‘উর’ ও ‘মারি’ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে ইউফ্রেটিস নদী এ অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও এর উৎপত্তির সুনির্দিষ্ট সময় ও বর্তমান গতিপথের বিবর্তন নিয়ে এতদিন ছিল রহস্য।
গবেষকরা বলেছেন, এ নদীর অতীত ইতিহাস উন্মোচন করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর প্লাবনভূমিতেই কৃষি, লিখন পদ্ধতি, নগর উন্নয়নসহ মানব সংস্কৃতির বহু ঐতিহাসিক মাইলফলক এসেছিল।
ভূমধ্যসাগরের তলদেশে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদের সন্ধানের সময় ভূতাত্ত্বিকরা ভূগর্ভস্থ সিসমিক বা ভূকম্পন উপাত্ত ব্যবহার করেন। এ অনুসন্ধানের সময় তারা সাগরের তলদেশে চাপা পড়ে থাকা কিছু প্রাচীন নদীখাতের সন্ধান পেয়েছেন।
এগুলো আজ থেকে প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি বছর আগের। ওই সময় এ সাগরের বড় অংশ শুকিয়ে গিয়েছিল, যা ভূতত্ত্বের ইতিহাসে ‘মেসিনিয়ান স্যালিনিটি ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, ওই সময় দুটি ভিন্ন নদী, যা বর্তমান তুরস্কের কারাসু ও মুরাত নদীর পূর্বসূরি ছিল তা তুরস্ক ও সিরিয়া জুড়ে বিস্তৃত এক অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকায় গিয়ে পড়ত।
গবেষকদের ধারণা, এ ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলের টেকটোনিক বা ভূত্বকীয় আলোড়নের কারণে মুরাত নদীর পূর্বসূরিটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে পারস্য উপসাগরের দিকে ধাবিত হয় এবং পরবর্তীতে কারাসু নদীর পূর্বসূরিটিও এর সঙ্গে এসে মিলিত হয়েছে। এর ফলে শক্তিশালী একক নদী ব্যবস্থার তৈরি হয়, যা আজকের ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী।
এ গবেষণায় বিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘সিসমিক ইমেজিং। এ প্রযুক্তিতে ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরের মধ্য দিয়ে শব্দতরঙ্গ কীভাবে প্রবাহিত ও প্রতিফলিত হচ্ছে তা রেকর্ড করে পৃথিবীর তলদেশের নিখুঁত দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়।
সিসমিক ইমেজিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে লুকিয়ে থাকা সেই প্রাচীন বিভিন্ন নদীখাতের সন্ধান মেলে।
এ গবেষণায় সহায়তাকারী ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া’র ভূবিজ্ঞানী সাইমন ল্যাং ও ‘শেভরন’-এর ভূতাত্ত্বিক অ্যান্ড্রু ম্যাডফের যৌথ এ গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ।
সাইমন ল্যাং বলেছেন, “প্রযুক্তিটি অনেকটা আল্ট্রাসাউন্ডের মতো, যা দিয়ে মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর সূক্ষ্ম বিবরণ বা বাতের ব্যথায় আক্রান্ত হাঁটুর ভেতরের অবস্থা দেখা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছি মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পাথর, বালি, কাদা, চুনাপাথর ও লবণের স্তর দেখার জন্য, যা দীর্ঘ সময় ধরে সংকুচিত হয়ে শক্ত শিলায় পরিণত হয়েছে।”
বিজ্ঞানীরা ভূগর্ভস্থ ভূপ্রকৃতির মডেলিং বা রূপরেখা তৈরির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন, প্রাচীন এ দুটি নদীর পানিপ্রবাহের গতি বর্তমানের নীল নদ বা টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর চেয়েও বেশি ছিল।
পেছনের দিকে হিসাব কষে বিজ্ঞানীরা এ দুটি প্রাচীন নদীর উৎস বর্তমান তুরস্কের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে খুঁজে পেয়েছেন। বর্তমানে টরাস পর্বতমালার ওপর উঠে আসা উপত্যকার পলি ও কয়লা খনির ভূতাত্ত্বিক উপাত্ত পরীক্ষা করে তারা নির্ধারণ করেছেন, বর্তমানের কারাসু ও মুরাত নদীই সম্ভবত সমুদ্রের নিচে চাপা পড়া সেই প্রাচীন বিভিন্ন নদীখাতের আদি উৎস ছিল।
গবেষক সাইমন ল্যাং বলেছেন, “তবে কোনোভাবে নদী দুটি এদের পশ্চিমাঞ্চলের নিম্ন উপত্যকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে আজকের আধুনিক ইউফ্রেটিস নদী গঠন করেছে। সেই ‘কোনোভাবের’ পেছনের মূল কারণটি ছিল পূর্ব অ্যানাতোলিয়া জুড়ে ঘটে যাওয়া টেকটোনিক বা ভূত্বকীয় আলোড়ন।
“বর্তমানে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর পানি বসরার কাছে মিলিত হয়ে পারস্য উপসাগরের মোহনায় এক বড় বদ্বীপ তৈরি করেছে। এসব নদী মেসোপটেমিয়ার সমভূমির বড় এক অঞ্চলকে পলি দিয়ে ভরাট করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল আদি কৃষিভিত্তিক সমাজ ও প্রাচীন নগর রাষ্ট্রসমূহ।
“একইসঙ্গে বিকাশ ঘটেছিল কিউনিফর্ম লিখন পদ্ধতির, যা মানব সভ্যতার শুরুর দিকের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও বড় নদীগুলোর গতিপথও যে নাটকীয় ভূতাত্ত্বিক ঘটনার কারণে বদলে যেতে পারে এর এক চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন গবেষক ল্যাং।
“আন্দিজ পর্বতমালা গড়ে ওঠার আগে, এ গ্রহের সবচেয়ে বড় নদী অ্যামাজন বর্তমান কলম্বিয়া ও পেরুর দিকে পশ্চিম অভিমুখে প্রবাহিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে গিয়ে পড়ত। তবে বড় ভূ-উত্থানের মাধ্যমে যখন আন্দিজ পর্বতমালার উচ্চতা বাড়তে শুরু করল তখন লাখ লাখ বছর ধরে এর আগের সব শাখা নদীগুলোর গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে যায়। আর তার ফলেই বর্তমান অ্যামাজন নদী প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়ছে।”