Published : 18 Feb 2026, 10:45 AM
পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতার দাপট আর বড় প্রযুক্তি জায়ান্টদের হাজিরায় এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভারত। নয়া দিল্লিতে আয়োজিত এবারের ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’ ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সম্মেলনে প্রযুক্তি বিশ্বের রাঘববোয়ালদের কাছে কি লোকদেখানো নম্রতার আড়ালে এআইয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও অবহেলিত থেকে যাবে?
বিবিসি লিখেছে, এআই নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি শোরগোল তোলেন তারা সাধারণত পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাসিন্দা। এ প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথ বা পশ্চিম অনুসারী বিভিন্ন দেশে বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সম্মেলন হওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের এ অঞ্চলটি এআইয়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ সপ্তাহে ভারতে চলমান ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’-এ বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও প্রচারকর্মীরা একত্র হয়েছেন। এআই বিপ্লবকে কীভাবে সঠিক পথে পরিচালিত করা যায় তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করাই এ সম্মেলনের লক্ষ্য।
গত বছর এ সম্মেলনটি প্যারিসে ‘এআই অ্যাকশন সামিট’ নামে পরিচিত ছিল। ওই সময় এর নেতৃত্বে কে থাকবে তা নিয়ে কিছু পশ্চিমা দেশের মধ্যে এক কদর্য ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছিল।
প্যারিসে বিভিন্ন পশ্চিমা শক্তি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কড়া ভাষণে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ দৌড়ে আমেরিকার শীর্ষে থাকার বিষয়টি নিয়ে কোনো আপস হবে না।
সেই তুলনায় এ সপ্তাহে দিল্লিতে হয়ত কিছুটা নম্র বা ভিন্ন পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। দিল্লি এমন এক দেশের রাজধানী যে দেশটি এ নতুন প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করেছে। অথচ পশ্চিমা বিভিন্ন ধনী দেশের তুলনায় সেই অনুপাতে সুফল পাচ্ছে না।
ভারতে বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ ও মুম্বাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এআই হাব বা কেন্দ্র রয়েছে। দেশটিতে বিশাল এক প্রযুক্তি জনবল আছে এবং এখানে মোটা অংকের বিনিয়োগ করেছে গুগল, এনভিডিয়া ও অ্যামাজনের মতো বড় কোম্পানিগুলো।
একই সময়ে ভারতের স্বল্প বেতনের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে এক পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন এআই টুলকে প্রশিক্ষিত করার জন্য যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার প্রয়োজন হয়, হাতে-কলমে সেগুলোর শ্রেণিবিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করছেন তারা।
সাংবাদিক কারেন হাও নিজের ‘এম্পায়ার অফ এআই’ বইটিতে ভারতের এক নামহীন কোম্পানির কথা লিখেছেন, যাদেরকে এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ছবির কনটেন্ট মডারেশন বা যাচাইবাছাইয়ের কাজ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি দাবি করেছেন, সেখানকার কর্মীদের অত্যন্ত বীভৎস বা ভয়ংকর সব ছবি দেখতে হত, যাতে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন কোন ছবি পুনরায় তৈরি হওয়া থেকে ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
নিয়োগ সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ‘গ্লাসডো’র তথ্য অনুসারে, চেন্নাইয়ে একজন ‘এআই ডেটা ট্রেইনার’-এর গড় বার্ষিক বেতন ৪ লাখ ৮০ হাজার রুপি, যা বছরে ৫ হাজার ডলারের চেয়েও কম। কাজটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তুলনা করলে দেখা যায় চ্যাটজিপিটি’র নির্মাতা ওপেনএআইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
ভারতের জন্য এ সম্মেলন ‘প্রযুক্তির চেয়েও বেশি কিছু’
২০২৬ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল এআই সেইফটি রিপোর্ট’-এ উল্লেখ রয়েছে, “যেখানে কিছু দেশে ৫০ শতাংশেও বেশি মানুষ এআই ব্যবহার করে, সেখানে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলে এ ব্যবহারের হার সম্ভবত ১০ শতাংশেরও নিচে।”
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিশ্বের বড় সব এআই চ্যাটবট ভারতের ২২টি সরকারি ভাষার সবকটিতে কাজ করে না, সেখানে শখানেক উপভাষার কথা তো বাদই থাকল। চ্যাটজিপিটি ও ক্লড বর্তমানে এসব ভাষার প্রায় অর্ধেক সমর্থন করে। অন্যদিকে, গুগলের জেমিনাই সমর্থন করে কেবল ৯টি ভাষা।
গেল বছরের গ্রীষ্মে ‘আইআইটি মুম্বাই’-এর অধ্যাপক পুষ্পাক ভট্টচারিয়া বলেছিলেন, “এমন প্রযুক্তি, যা এসব ভাষা বোঝে ও বলতে পারে তা ছাড়া কোটি কোটি মানুষ ডিজিটাল বিপ্লব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষা, শাসনব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংকিং খাতে।”
এ পরিস্থিতি ঠেকাতে নিজস্ব সার্বভৌম এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে ভারত, যার নাম ‘এআই মিশন’। তবে এর অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। যেখানে মার্কিন বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি চীনের ডিপসিক ও বাইটড্যান্স-এর মতো কোম্পানি দ্রুত নতুন নতুন সংস্করণ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ভারতের অনেক প্রকল্প এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।
এ প্রকল্পের জন্য ভারত সরকারের বরাদ্দকৃত ১২০ কোটি ডলারের বাজেট বহুজাতিক বহুশত কোটি ডলারের বিভিন্ন কোম্পানির বিশাল তহবিলের তুলনায় খুব সামান্য।
ভারতের অন্যতম বড় প্রযুক্তি বিনিয়োগ কোম্পানি ‘পিক ফিফটিন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজান আনন্দন বলেছেন, “ভারতের কাছে বিষয়টি কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং অর্থনৈতিক রূপান্তর, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও বড় পরিসরে সক্ষমতা তৈরির। দেশের ভেতরে এখন শক্তিশালী গতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাস কাজ করছে।”
লন্ডনের ‘কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি’র এআই নীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিনা নেফ বলেছেন, “এ সম্মেলনে এআই শাসনের ক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে উর্ধমুখী এবং দক্ষিণ বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মানুষ, পৃথিবী ও প্রগতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে আমেরিকানদের এখানে বলার সুযোগ কিছুটা কমে আসবে।”
থিংক ট্যাংক ‘কানেক্টেড বাই ডেটা’র নির্বাহী পরিচালক জেনি টেনিসন বলেছেন, “অভূতপূর্ব কর্পোরেট ক্ষমতার বিপরীতে আমাদের এমন সরকার প্রয়োজন যারা এআইয়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রূপরেখা তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করবে।
“বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যম শক্তি হিসেবে ভারত সেটি সম্ভব করতে পারে।”
একই মত পোষণ করেছেন এআই বিশেষজ্ঞ হেনরি আজডারও।
“আমি আশা করি, আমরা এমন কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ দেখতে পাব, যা কেবল আইনের ছক তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এআইয়ের বিভিন্ন ক্ষতি তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হোক বা না হোক তা ঠেকাতে অর্থবহ ঐকমত্য তৈরি করবে।”
কিছু এআই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এআইয়ের ‘নিরাপত্তা’ ও ‘দায়বদ্ধতা’র বিষয়টি আলোচনার তালিকার অনেক নিচে নেমে গেছে বলে তারা চিন্তিত।
২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘এআই সেইফটি সামিট’-এর পর সম্মেলনের নাম থেকে ‘সেইফটি’ শব্দটি চুপিসারে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী প্রফেসর ডেম ওয়েন্ডি হল এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। তবে তিনি বলেছেন, তার ভয় এআইয়ের বিভিন্ন বিপদ কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে এ আয়োজন থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই’ আসবে না।
“সেখানে যাওয়াটা জরুরি, তবে সেখান থেকে কার্যকর কিছু বের হয়ে আসবে– এমন প্রত্যাশা আমার খুবই কম।”