Published : 18 Jul 2026, 10:24 PM
থাই পেয়ারা, ভিয়েতনামি নারিকেল, বারোমাসি আম, মালয়েশিয়ান লেবু, ব্রাজিলিয়ান চেরি, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, ম্যাঙ্গোস্টিন, লংগান এমন নামের ফলগাছের চারা সাজিয়ে রাখা হয়েছে অধিকাংশ স্টলে।
বিক্রেতারাও বলছেন, ‘এটা খুব লাভজনক’, এক বছরে ফল দেবে।
অন্যদিকে কদবেল, জলপাই, দেশি জাম, গাব, কাউ, বৈঁচি, চালতা, বনজাম, ডেউয়া, করমচা কিংবা দেশি বরইয়ের মতো গাছ খুঁজতে অনেক স্টল ঘুরতে হয়।
গেল ৯ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে যে বৃক্ষমেলা শুরু হয়েছে, শনিবার সেখানে বিভিন্ন স্টল ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
মেলায় আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিক ফলন, দ্রুত ফল পাওয়া এবং বাজারমূল্যের কথা বিবেচনা করেই তারা বিদেশি গাছ কিনছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিদেশি ফলের চাষ নিয়ে বেশি প্রচার থাকায় এসব গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার কথা বলেছেন তারা।
আর বিক্রেতারা বলছেন, প্রতিবছরই ছাদবাগান ও বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগানোর আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ফলদ ও শোভাবর্ধক গাছের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এক সময় গ্রামজুড়ে ছিল দেশি ফলের গাছের সমারোহ। বাড়ির আঙিনায় ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, কদবেল, চালতা, জলপাই, বেল, ডেউয়া কিংবা করমচার গাছ।
এসব গাছ শুধু ফলই দিত না, পাখির আশ্রয়, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করত। এখন সেই জায়গা ধীরে ধীরে দখল করছে বিদেশি প্রজাতি ফলদ বৃক্ষ।

‘বিদেশি বেশি খোঁজে মানুষ’
এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় বাণিজ্য মেলার দুই নম্বর গেইটের প্রবেশ মুখের বামদিকে কিংশুক নার্সারি ও পাশের ফয়সাল নার্সারি গিয়ে দেখা যায়, দুই স্টলেই বিদেশি ফুল ও ফল গাছের প্রধান্য।
বিদেশি ফুলগাছের চারার মধ্যে ছিল ম্যান্ডাভিলা, ক্যাশিয়া, প্যাশন, জাকারান্ডা, আফোরার ম্যান্ডারিন।
আর তাইওয়ান পিংক, বারাব্বা, আছাছা, পিচ, মালয় আপেল, অস্ট্রেলিয়ান বড় আনার, ফুয়ের্তে অ্যাভোকাডো, পাকিস্তানি লং মালবেরি, কাঠালসহ বিদেশি ফলগাছের চারাও দেখা গেছে ওই দুটি স্টলে।
ফয়সাল নার্সারি স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আহমেদ বলেন, “ক্রেতারা দেশি গাছের বিদেশি ‘ভার্সন’ বেশি নিচ্ছে। যেমন দেশি আমড়ার চেয়ে থাই আমড়া বেশি নিচ্ছে। কারণ অধিক ফলন দিচ্ছে। বিদেশি ফলগাছগুলো বেশি চাচ্ছেন। বারমোডাল, অ্যাভোকাডো বেশি চাচ্ছেন। এগুলো সবসময় চাহিদার শীর্ষে থাকে। যেমন লংগান, যার দেশি ভার্সন আশফল। আমের বিদেশি ‘ভার্সন’গুলো বেশি চাচ্ছেন ক্রেতারা।”
দেশি ফলের বিদেশির জাতের চারায় আগ্রহ বেশি কেন? জবাবে তিনি বলেন, “মানুষ উচ্চ ফলন শীল জাতগুলো বেশি খুঁজছে। দেশি জামে কষ ও তার বীজটা বড় হয়। কিন্তু বিদেশি জাত হলে, যেমন রাজস্থলী বা ইন্দোনেশিয়ান জাম এগুলো বেশি চাচ্ছে।”

চালতা, গাব, তুলসী, করবী, রঙ্গন, কামরাঙ্গা, হাসনেহেনা, জবা, অ্যালামন্ডা, জলপাই এর মতো দেশি ফুল ও ফলগাছের দেখা পাওয়া যায় ৬৪ ও ৬৫ নম্বর স্টাল ফাতেমা নার্সারিতে।
নার্সারিটির তত্তাবধায়ক সুমন বলেন, “দেশি ফলের আলাদা একটা গুণাগুণ আছে। অনেকে বিদেশি ফলের চাপে ভুলে গিয়েছে।”
“আমরা একটু ভিন্ন আঙ্গিকে স্টল সাজানোরে চেষ্টা করেছি। যাতে মানুষের চোখ দেশি জিনিসটার উপর আগে যায়। বিদেশ ফলও আমাদের কিছু আছে, মানুষ যেহেতু চাচ্ছে। তবে আমাদের দেশি ফলের চারার সংগ্রহ বেশি।”
গ্রিনল্যান্ড নার্সারির স্টলে বসেছেন মোহাম্মদ শাহারিয়ার করিম। রাজধানীতে তার কয়েকটি নার্সারি আছে।
তিনি বলেন, “থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ার গাছের চাহিদা বেশি। মানুষ এখন এমন গাছ চায় যেটা দ্রুত ফল দেবে, দেখতে সুন্দর হবে, আর ইউটিউব বা ফেসবুকে যার প্রচার বেশি। থাই পেয়ারা, ভিয়েতনামি নারিকেল, ড্রাগন বা অ্যাভোকাডো, এ কারণে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।”

এগুলোর দামও বেশি। ১০০ টাকা খরচ করে ৩ হাজার টাকা বিক্রি করা যাচ্ছে। যদি আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খেয়ে গেলে তিন থকে চার বছর বাঁচে।”
‘সন্তানরা গাব চেনে না’
৪৫ নম্বর স্টলের আলী হাজার এগ্রো নার্সারিতেও বিদেশি গাছের আধিক্য। এখান থেকেই অর্কিড কিনেছে স্কুলশিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন। তার সঙ্গে ছিলেন বাবা মোজাফফর আহমেদ।
মোজাফফর আহমেদ বলেন, “নতুন প্রজন্ম বিদেশি ফলের নাম জানে, কিন্তু দেশীয় অনেক গাছ তাদের কাছে অপরিচিত। তারা কদবেল, গাব, ডেউয়ার নামও জানে না।”
গাইবান্ধায় শৈশব কেটেছে সায়েদা সুলতানার। তানিম নার্সারিতে দেশি ফলের চারা খুঁজছিলেন তিনি।

সায়েদা সুলতানা বলেন, “ছোট বেলা গ্রামে থেকেছি। বন বাদাড়ে ঘুরে পেয়ারা খাওয়া ডেউয়া, গাব এ জিনিসগুলো খাওয়া– এগুলোর সঙ্গে আমাদের অনেক বড় সর্ম্পক আছে। তাই খুজঁতে আসছি।”
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামের স্টলেই উপস্থিত ছিলেন বন গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম।
তার ভাষ্য, “বিদেশি ফুল ও ফলের চাষে আপত্তি নেই। কিন্তু দেশীয় প্রজাতি অবহেলিত হলে দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দেশি গাছ কমে গেলে পাখি, মৌমাছি, প্রজাপতি ও নানা উপকারী প্রাণীর আবাসও সংকুচিত হবে।
“দেশীয় গাছ শুধু ফলের উৎস নয়; এগুলো স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। গাব, জাম, কদম, বকুল, বহেড়া বা হরিতকীর মতো গাছে পাখি, মৌমাছি ও নানা উপকারী পতঙ্গের আবাস তৈরি হয়। শহরে এসব গাছ কমে গেলে পরিবেশের ভারসাম্যও প্রভাবিত হয়।”
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের স্টলে একটি তালিকা দেখা যায়। সেখানে লেখা বিলুপ্তির পথে গাছগুলো- বহেরা, হিজল, তমাল, ধূপ, আগর, উরি আম, বৈল আম, সন্ধিবেদ, বরুন, গাব গাছ, নাগেশ্বর, লতাবাঁশ, গোলপাতা, লতাসুন্দরী, বাইম, পুঁতিজামসহ অনেক দেশীয় গাছ।
মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর এবারের প্রতিপাদ্য-‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই আয়োজনে রয়েছে ১২০টি স্টল। আগামী ৮ অগাস্ট পর্যন্ত চলবে এই মেলা।