Published : 21 Dec 2025, 02:34 PM
২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি হ্যাকিংয়ে নিজের আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে উত্তর কোরিয়া। নতুন এক গবেষণা বলছে, চলতি বছরে দেশটির হ্যাকাররা বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে প্রায় ২০২ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।
এই তথ্য উঠে এসেছে ব্লকচেইন নজরদারি প্রতিষ্ঠান চেইনালাইসিসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা যেখানে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার চুরি করেছিল, সেখানে ২০২৫ সালে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২ কোটি ডলারে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৬৭৫ কোটি ডলারের চোরাই ক্রিপ্টো গিয়েছে।
এ বছর বিশ্বজুড়ে মোট চুরি হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিমাণও বেড়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিকভাবে প্রায় ৩৪০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি হয়েছে, যার বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা।
এ নিয়ে এবিসি নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এ বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে দুবাইভিত্তিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে। ফেব্রুয়ারিতে হওয়া ওই হামলায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল ইথেরিয়াম। বাইবিটের প্রধান নির্বাহী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস এই হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সরকারের অভিজাত হ্যাকিং ইউনিটের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে।
ক্রিপ্টো লেনদেনের জটিল নেটওয়ার্ক যে অল্প কয়টি প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণ করে, চেইনালাইসিস তার অন্যতম। হ্যাকিংয়ে বেহাত মুদ্রা কীভাবে বিভিন্ন ওয়ালেট ঘুরে পাচার হয়, সেটিও অনুসরণ করে এরা।
দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ এবং বেসরকারি গবেষকেরা অভিযোগ করে আসছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত উত্তর কোরিয়া তার হ্যাকারদের ব্যবহার করছে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অর্থ জোগাতে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ম্যাট পার্ল বলেন, “এটা ঠেকানো খুব কঠিন। কারণ তারা এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে বিশ্ব থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং কার্যত এক ধরনের রৌগ স্টেট।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরির একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভুয়া পরিচয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিতে ‘রিমোট জব’ নেওয়ার ঘটনা। এতে করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ভেতর থেকে প্রবেশাধিকার পায় এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেটের কি চুরি করে অর্থ পাঠিয়ে দেয় পিয়ংইয়ংয়ে।
অন্য দেশগুলোর হ্যাকারদের বড় অঙ্কের চুরির ঘটনা থাকলেও, উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত ও নিয়মিত এমন কার্যক্রম আর কারও নেই বলে ধারণা গবেষকদের।
ফাঁস হওয়া নথিতে এর আগে দেখা গেছে, দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে জটিল অর্থ পাচার নেটওয়ার্কগুলোর একটি পরিচালনা করছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি তুলনামূলকভাবে সহজে পাচারযোগ্য হওয়ায় এটি উত্তর কোরিয়ার জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোতে একসঙ্গে বিপুল অঙ্কের অর্থ থাকায় সেগুলো হ্যাকারদের জন্য সহজ শিকার। একবার ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে খুব দ্রুত অন্য ওয়ালেটে অর্থ সরিয়ে নেওয়া যায়, আর প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার মতো তা ফেরানোর সুযোগও খুব সীমিত।
চেইনালাইসিস প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ও পেশাদার নিরাপত্তা দল থাকা সত্ত্বেও, এই মৌলিক নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে প্ল্যাটফর্মগুলো ঝুঁকিতে থেকে যাচ্ছে।”
ম্যাট পার্ল মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর আগে থেকেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন করে তাদের নিরস্ত করার মতো তেমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই। তিনি বলেন, “স্পষ্টতই আমাদের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো কাজ করেনি। ভবিষ্যতেও আমরা এমন ঘটনা দেখতে থাকব।”