০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

আইপিও দৌড়ে ওপেনএআই থেকে একধাপ এগোল অ্যানথ্রপিক

স্পেসএক্স, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক এ তিন কোম্পানির সম্মিলিত মূলধনের চাহিদা এতই বড় হবে যে, তা পুঁজিবাজারে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।

আইপিও দৌড়ে ওপেনএআই থেকে একধাপ এগোল অ্যানথ্রপিক
এআই খাতের এ অভূতপূর্ব জোয়ারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Jun 2026, 10:12 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:20 PM

চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের আগেই মার্কিন শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি অ্যানথ্রপিক।

কোম্পানিটির এমন পদক্ষেপ দ্রুত বেড়ে ওঠা এআই খাতের আর্থিক মূল্যায়ন নির্ধারণ এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

সোমবার শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি বা আইপিও’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে অ্যানথ্রপিক, যার মাধ্যমে শেয়ার বাজারে পা রাখার তীব্র প্রতিযোগিতায় ওপেনএআইয়ের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেল কোম্পানিটি।

আইপিও’র মাধ্যমে স্পষ্ট হবে, এআই নিয়ে ব্যক্তিগত খাতের বড় মূল্যায়ন ও ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরির যে আলোচনা চলছে তা শেয়ার বাজারের পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়নে কতটা টিকে থাকবে।

পাশাপাশি, দ্রুত বেড়ে ওঠা এ এআই খাতের আর্থিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত তার একটি আদর্শ কাঠামোও এ তালিকাভুক্তির মাধ্যমে তৈরি হবে।

অবশ্য নিজেদের এ আইপিও বা শেয়ার ছাড়ার নির্দিষ্ট আকার ও শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করেনি কোডিংয়ের জগতে জনপ্রিয় স্বয়ংক্রিয় এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘ক্লড কোড’-এর নির্মাতা কোম্পানি অ্যানথ্রপিক।

মে মাসের শেষদিকে তারা সাড়ে ৯৬ হাজার কোটি ডলার বাজারমূল্য ধরে নতুন করে আরও সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, যা বাজার মূল্যায়নের দিক থেকে কোম্পানিটিকে ওপেনএআইয়ের চেয়েও এগিয়ে রেখেছে।

শেয়ার বাজারে এ তালিকাভুক্তি গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অভিষেক হতে যাচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের মূল সূচক, বিনিয়োগকারীদের অর্থপ্রবাহ ও সার্বিকভাবে মার্কিন শেয়ার বাজারের প্রচলিত ধারাকে নতুন রূপ দিতে পারে।

মে মাসে রয়টার্স প্রতিবেদনে লিখেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ওপেনএআই’ও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির জন্য গোপনে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর আগে, ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি স্পেসএক্স মোটা অংকের আইপিও আবেদন জমার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছে, যা শেয়ার বাজারের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে বলে ব্যপক ধারণা রয়েছে।

স্পেসএক্স ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য ধরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি ডলারের শেয়ার ছাড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাদের শেয়ারের লেনদেন শুরু হতে পারে।

সাধারণত গোপনে আবেদন করার এ নিয়মের ফলে এসব কোম্পানি তাদের সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য প্রতিযোগী কোম্পানি বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নজর থেকে আড়ালে রেখেই আইপিও’র প্রাথমিক প্রস্তুতিগুলো সেরে নেওয়ার সুযোগ পায়।

আইপিও গবেষণা কোম্পানি ‘আইপিওএক্স’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাট লিউ এ বিষয়ে বলেছেন, “স্পেসএক্সের ঠিক পরপরই আবেদন করার কারণে অ্যানথ্রপিক এআই ও ক্রমাগত প্রযুক্তি খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের তীব্র আগ্রহের সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারবে। কারণ বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তাদের বেশ অনুকূলে রয়েছে।

“স্পেসএক্সের মোটা অংকের তুলনায় অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্যের আকাঙ্ক্ষাকে এখন আর অতটা আকাশচুম্বী বা অতিরিক্ত মনে হচ্ছে না। তবে, এককভাবে বিচার করলে সে সম্ভাবনা ছিল।”

এআই আধিপত্যের লড়াই

এআই খাতের এ অভূতপূর্ব জোয়ারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক। এ দুই কোম্পানির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক কর্পোরেট কৌশলকে যেমন নতুন করে সাজিয়েছে তেমনি কম্পিউটিং সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ দখলে বিশ্বজুড়ে এক প্রতিযোগিতাও তৈরি করেছে।

পাশাপাশি, এআই প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত করেছে।

এ বিষয়ে ‘পিচবুক’-এর সিনিয়র বিশেষজ্ঞ হ্যারিসন রলফেস বলেছেন, “ওপেনএআইয়ের জন্য সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, আগে আইপিও আবেদন জমা দিয়ে অ্যানথ্রপিক কেবল আলোচনার শীর্ষে চলে গেছে।”

তবে এর একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, “এর অন্য রকম ব্যাখ্যা হতে পারে, ওপেনএআই আসলে এতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অ্যানথ্রপিক আগে আবেদন করায় সব ধরনের আর্থিক তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি ও এর প্রভাব তারা একাই প্রথমে সামাল দেবে।

“আর ওপেনএআই ঘরে বসে বিনামূল্যে তা দেখার সুযোগ পাবে যে, সামনের সারির এক এআই কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাবের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং নিজেদের শেয়ারের দাম নির্ধারণের আগে তারা বাজার পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার সময় পাবে।”

ভবিষ্যতের নানা ঘটনার ওপর বাজি ধরার অনুমানকেন্দ্রিক বাজারগুলোতে বেশিরভাগ ট্রেডারই ধারণা করেছিলেন, অ্যানথ্রপিকের আগেই ওপেনএআই শেয়ার বাজারে যাওয়ার আবেদন করবে।

অ্যানথ্রপিকের এ গোপন আবেদনের খবর আসার পর ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, তিনি চ্যাটজিপিটির নির্মাতা এ কোম্পানিটির সম্ভাব্য প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় নিয়ে এখনই খুব একটা ভাবছেন না।

দ্রুত বেড়ে ওঠা এআই খাতের আর্থিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত এর জবাবও আইপিও তালিকাভুক্তির মাধ্যমে জানা যাবে। ছবি: রয়টার্স

দ্রুত বেড়ে ওঠা এআই খাতের আর্থিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত এর জবাবও আইপিও তালিকাভুক্তির মাধ্যমে জানা যাবে

“কোম্পানিটি তখনই শেয়ার বাজারে যাবে যখন তা করার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ ও উপযোগী সময় আসবে” বলেও উল্লেখ করেছেন অল্টম্যান।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের সময় অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্য ছিল ৩৮ হাজার কোটি ডলার, যা কেবল কয়েক মাসের ব্যবধানে, অর্থাৎ মে মাসে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুতে অ্যানথ্রপিকের এ রকেটসম উত্থান পুঁজিবাজারকে বেশ নাড়া দিয়েছিল, বিশেষ করে প্রচলিত সফটওয়্যার ও আইটি খাতের শেয়ারগুলোতে বড় ধরনের পতন ঘটে। কারণ, বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছিলেন, অ্যানথ্রপিকের ক্রমাগত স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন এআই সিস্টেম প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলগুলোকে ওলটপালট করে দিতে পারে।

কোম্পানিটির সর্বশেষ তহবিল সংগ্রহের এ ধাপে সিলিকন ভ্যালি ও ওয়াল স্ট্রিটের নামী সব বিনিয়োগকারী ছিলেন, যার মধ্যে ‘ব্ল্যাকস্টোন’, ‘ব্রুকফিল্ড’, ‘ডিওয়ান ক্যাপিটাল পার্টনার্স’, ‘জিআইসি’, ‘জেনারেল ক্যাটালিস্ট’ ও ‘ইনসাইট পার্টনার্স’ অন্যতম।

পুঁজিবাজারে নতুন মাইলফলক

পুঁজিবাজারে একের পর এক ব্লকবাস্টার বা বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির এই প্রতিযোগিতায় স্পেসএক্স থেকে শুরু করে এআই খাতের শীর্ষ জায়ান্টরা বিনিয়োগকারীদের সীমিত মূলধনের বড় অংশটি নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য লড়াই করছে।

‘ডি. এ. ডেভিডসন’-এর গিল লুরিয়াসহ বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, ওয়াল স্ট্রিটের মূলধন ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই কোম্পানি দুটি শেয়ার বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। একইসঙ্গে তাদের লক্ষ্য, ভাষা, যুক্তি বা কোডিংয়ের ক্ষেত্রে মেশিনের সক্ষমতার সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এক সামনের সারির এআই মডেল কীভাবে নিজস্ব আর্থিক হিসাব নিকাশ প্রকাশ করবে, তার অনুকূল ও আদর্শ কাঠামো সবার আগে বাজারে প্রতিষ্ঠা করা।

এ প্রসঙ্গে গিল লুরিয়া বলেছেন, “স্পেসএক্স, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক এ তিন কোম্পানির সম্মিলিত মূলধনের চাহিদা এতই বড় হবে যে, তা পুঁজিবাজারে বড় ধরনের টানাপোড়েন বা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ফলে যারা আগে বাজারে যেতে পারবে তারাই বড় সুবিধা পাবে।”

প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা এক লক্ষ কোটি ডলারের বাজারমূল্য নিয়ে অ্যানথ্রপিক যদি বাজারে প্রবেশ করে তবে কোম্পানিটি সরাসরি মার্কিন শেয়ার বাজারের শীর্ষ সূচক ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’-এর একদম প্রথম সারিতে জায়গা করে নেবে, যেখানে বিশ্ব পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী হাতে গোনা শীর্ষস্থানীয় কয়েকটিমাত্র কোম্পানি রয়েছে।

‘ডিলজিক’-এর তথ্য অনুসারে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আইপিও বাজার বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ২৬ মে পর্যন্ত এসব কোম্পানি বিশ্বজুড়ে আইপিও’র মাধ্যমে ৮ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে, যা ২০২১ সালের পর বছরের এ সময় পর্যন্ত বৈশ্বিক রেকর্ড।

এ ছাড়াও এ সপ্তাহের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশ কয়েকটি বড় আইপিও বাজারে আসার কথা রয়েছে, যার মধ্যে ‘হানিমেল’-এর বিনিয়োগপুষ্ট কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কোম্পানি ‘কোয়ান্টিনুয়াম’, ‘ব্ল্যাকস্টোন’-এর বিনিয়োগপুষ্ট ‘লিফটঅফ’ ও গ্যাস ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ইন্নিও’ অন্যতম।