১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিরল খনিজে চীন নির্ভরতা কমাতে ভারতের নতুন পথ কতটা মসৃণ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে ভারত কত দ্রুত প্রযুক্তি আয়ত্ত, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত ও উৎপাদনের পরিধি বাড়াতে পারে তার ওপর।

বিরল খনিজে চীন নির্ভরতা কমাতে ভারতের নতুন পথ কতটা মসৃণ?
চীনের এ আধিপত্য কমানোর চেষ্টায় ভারত একা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও আরও অনেক দেশও একই ধরনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Jan 2026, 11:52 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:34 PM

আধুনিক বিশ্বে অপরিহার্য সম্পদ ‘রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট’ বা বিরল খনিজ। রেয়ার আর্থ বলতে পর্যায় সারণির ১৭টি মৌলকে বোঝায়, যাদের পারমাণবিক গঠন বিশেষ এক চৌম্বক ধর্ম তৈরি করে। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক গাড়ি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সবকিছুর প্রাণভোমরা এই শক্তিশালী চুম্বক।

বর্তমানে এ খাতের বিশ্ববাজার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। দেশটির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভর হতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৭৩০০ কোটি রুপির এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারত।

উদ্যোগটি বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যা বিরল মৌলের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। আকারে ছোট ও শক্তিশালী এসব যন্ত্রাংশ উইন্ড টারবাইন থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, মেডিকেল স্ক্যানার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মতো প্রায় সব কিছুতেই ব্যবহৃত হয়।

বিরল মৌলের সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরির কাজটি বেশ ব্যয়বহুল, জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে ভারত সরাসরি চুম্বক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যা এ খাতের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্য। এর মাধ্যমে ভারত দ্রুত স্বনির্ভরতা অর্জন করতে চাইছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে ভারত কত দ্রুত প্রযুক্তি আয়ত্ত, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত ও উৎপাদনের পরিধি বাড়াতে পারে তার ওপর।

এ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত উৎপাদকদের মূলধন ও বিক্রিভিত্তিক প্রণোদনা দেবে ভারত, যাতে আগামী সাত বছরের মধ্যে বছরে প্রায় ছয় হাজার টন ‘পার্মানেন্ট ম্যাগনেট’ বা স্থায়ী চুম্বক তৈরি করতে পারে দেশটি। এর মূল লক্ষ্য, দেশের চাহিদা মেটানো। কারণ, ভারতের কর্মকর্তাদের অনুমান, আগামী পাঁচ বছরে এই চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

বর্তমানে নিজেদের প্রয়োজনীয় চুম্বক ও এর কাঁচামালের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই চীন থেকে আমদানি করে ভারত। বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০ শতাংশেরও বেশি চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

চীনের ওপর ভারতের এ নির্ভরশীলতার ঝুঁকি গত বছর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে ভারতে রপ্তানি কমিয়ে দেয় চীন। ছবি: রয়টার্স

চীনের ওপর ভারতের এ নির্ভরশীলতার ঝুঁকি গত বছর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে ভারতে রপ্তানি কমিয়ে দেয় চীন

ভারতের সরকারি হিসাব অনুসারে, ২০২৫ সালে প্রায় ২২ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের চুম্বক ও এ সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল আমদানি করেছে ভারত।

চীনের ওপর ভারতের এ নির্ভরশীলতার ঝুঁকি গত বছর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে ভারতে রপ্তানি কমিয়ে দেয় চীন। ফলে ভারতের বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা ও ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে, বিশেষ করে দেশটির ইভি শিল্পকে বিরল খনিজের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা খোঁজার কথা ভাবতে বাধ্য করে।

সেই সংকট সাময়িক হলেও ভারতের জন্য এ শিক্ষাটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী, যেখানে নিজস্ব কোনো শক্তিশালী কৌশল না থাকলে পুরো শিল্প খাতটি যে কোনো সময় বিপদে পড়তে পারে।

চীনের এ আধিপত্য কমানোর চেষ্টায় ভারত একা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও আরও অনেক দেশও একই ধরনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

‘ইওয়াই ইন্ডিয়া’-এর কর ও অর্থনৈতিক নীতি বিশেষজ্ঞ রজনীশ গুপ্ত বলেছেন, “অনেক দেশের জন্যই চীনের এ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সময়টি ছিল অপ্রত্যাশিত।”

তবে, ভারতের জন্য এই চ্যালেঞ্জটি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি জটিল।

প্রথমত, ভারতের এ শিল্পে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো দেশ চুম্বক তৈরির প্রযুক্তি উন্নত করতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই তুলনায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চুম্বক উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা প্রায় শূন্য।

ব্যাটারি ও রেয়ার আর্থ বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্স’-এর নেহা মুখার্জি বলেছেন, “ভারতে এ প্রকল্প সঠিক দিকে এক ভালো পদক্ষেপ। তবে এ কেবল শুরু মাত্র। ভারতকে প্রযুক্তি আমদানির জন্য কৌশলগত পার্টনারশিপ করতে, কর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ও এরপর নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।”

‘ন্যাশনাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর প্রধান বিজ্ঞানী ড. পিভি সুন্দার রাজুও একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেছেন, “গবেষণা ও উন্নয়নে শক্তিশালী ভিত্তি ছাড়া কেবল ৭৩০০ কোটি রুপি দিলেই কোনো উন্নত পণ্য পাওয়া সম্ভব নয়।”

তিনি বলেছেন, ভারতে বেশ কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোকে এই কাজে লাগানো যেতে পারে। যেমন ২০২৩ সালে ‘ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার’-এ একটি কেন্দ্র উদ্বোধন হয়েছে। এ ছাড়া, ভারতের সরকারি ও বেসরকারি পার্টনারশিপে পরিচালিত আরেকটি কারখানার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে পাঁচ হাজার টন চুম্বক উৎপাদন করা।

তবে, এগুলোর কোনটি থেকেই এখনও পর্যন্ত কোনো উৎপাদনের খবর পাওয়া যায়নি।

এর পাশাপাশি কাঁচামালের জোগানের প্রশ্নও থেকে যায়। ভারতের হাতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিরল খনিজ মজুত রয়েছে, যা গোটা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় আট শতাংশ। এর বেশিরভাগই কেরালা, তামিলনাড়ু, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো উপকূলীয় বিভিন্ন রাজ্যের বালিতে মিলেছে। এরপরও বিশ্বজুড়ে এ খনিজ উত্তোলনে ভারতের অবদান ১ শতাংশেরও কম।

বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে কেবল একটি খনি চালু আছে এবং এখন পর্যন্ত এর অধিকাংশ উৎপাদন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় জাপানে রপ্তানি করা হয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে ২০২৫ সালের জুনে নিজেদের রাষ্ট্রায়ত্ত খনি সংস্থা ‘আইআরইএল’কে এ রপ্তানি স্থগিত রাখতে বলেছে ভারত।

খনি উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম বাড়াতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ভারত। ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন’ গঠন করেছে দেশটি, যার অধীনে খনিজের মজুত গড়ে তোলা ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী রাখার অঙ্গীকার করেছে ভারত।

ভারত নিজেদের খনি থেকে বিরল খনিজ উত্তোলন করতে পারলেও চুম্বক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান সেখানে নেই।

দেশটির কাছে ‘নিওডাইমিয়াম’-এর মতো হালকা উপাদানের বাড়তি মজুত রয়েছে তবে ‘ডিসপ্রোসিয়াম’ ও ‘টার্বিয়াম’-এর মতো ভারী বিভিন্ন উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। অথচ উন্নতমানের চুম্বক তৈরির জন্য এসব ভারী উপাদান অপরিহার্য।

ফলে ভারতে চুম্বক তৈরি হলেও সেগুলোর কাঁচামাল কি শেষ পর্যন্ত চীন থেকেই আসবে? এ প্রশ্ন রয়েই যায়। পাশাপাশি এ প্রকল্পের পরিধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

নেহা মুখার্জি বলেছেন, ভারত বর্তমানে বছরে প্রায় সাত হাজার টন চুম্বক ব্যবহার করে। ২০৩০-এর দশকের শুরুতে ভারত যদি ছয় হাজার টন উৎপাদন করতে পারে এরপরও দেশটির ক্রমাগত চাহিদার তুলনায় তা কম হবে। ফলে তখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যেতে পারে ভারত।

আরও পড়ুন…

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে চীনের বাজির ঘোড়া বিরল খনিজ?