Published : 13 Jun 2026, 10:52 AM
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সম্পদের গ্রাফ প্রতিনিয়ত নতুন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এমন একটা দিনও যায় না, যেদিন মাস্ক সংবাদপত্রের শিরোনাম হন না। আর অদূর ভবিষ্যতে হয়ত তাকে আর বিলিয়নেয়ার নয়, বরং ট্রিলিয়নেয়ার বলেই ডাকতে হবে।
স্পেসএক্স, টেসলা, এক্সএআই ও এক্স-এর এ প্রধান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আধা ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।
এর ঠিক এক মাস পর, টেসলার বিনিয়োগকারীরা তার জন্য ঐতিহাসিক এক বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেছেন, যার মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
তবে ট্রিলিয়নেয়ার হওয়ার এ মাইলফলকটি পেরোনোর জন্য হয়ত তাকে ওই বেতন প্যাকেজ অনুমোদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ রকেট নির্মাতা ও স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ার বাজারে যাওয়ার পর তা মাস্কের মোট সম্পদকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দিতে পারে।
এই ধনকুবের রাজনীতিসহ বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বিষয়ে নিজের সামাজিক মাধ্যমে মতামত প্রকাশের জন্যও বেশ পরিচিত।
২০২৪ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর মাস্কের প্রভাব আরও বেড়ে যায়, যেখানে টেসলাপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের মধ্যকার সম্পর্কটি এক তিক্ত কলহে রূপ নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছে।
মাস্ক কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বরং আটলান্টিকের ওপারেও রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সমসাময়িক নানা ঘটনা নিয়ে তার বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য প্রায়শই সেখানকার রাজনীতিবিদদের ক্ষুব্ধ করেছে।
রাজনীতিতে মাস্কের এ অতি-উৎসাহ অবশ্য মাঝেমধ্যে তার বিভিন্ন ব্যবসার ক্ষতি ডেকে এনেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালে টেসলা গাড়ির বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ছিল মাস্কের ওপর গ্রাহকদের একাংশের ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্টি।
কীভাবে নিজের সম্পদ গড়েছেন মাস্ক?
‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’তে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পরপরই পড়াশোনা ছেড়েছেন মাস্ক। এরপর ১৯৯০-এর দশকের ‘ডটকম বুম’-এর ইন্টারনেট ব্যবসার জোয়ারের সময় তিনি দুটি প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
যার মধ্যে একটি ছিল ওয়েব সফটওয়্যার ফার্ম ও অন্যটি অনলাইন ব্যাংকিং কোম্পানি, যা পরবর্তীতে ‘পেপাল’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২০০২ সালে পেপাল’কে ১৫০ কোটি ডলারে ‘ইবে’-এর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পেপাল থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ মাস্ক ঢালেন তার নতুন রকেট কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’-এ। যার লক্ষ্য ছিল নাসার চেয়েও কম খরচে মহাকাশ অভিযানের বিকল্প তৈরি করা।

পাশাপাশি মাস্ক বিনিয়োগ করেন নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি নির্মাতা ‘টেসলা’তে, যেখানে ২০০৮ সালে প্রধান নির্বাহী হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন।
মাঝেমধ্যে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়লেও এ দুটি কোম্পানি নিজ নিজ শিল্প খাতে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে বলেই ভাবা হয়।
মাস্কের অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ২০২২ সালের অক্টোবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘টুইটার’ কিনে নেওয়া।
মাস্কের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ‘এক্স’কে ‘এভরিথিং অ্যাপ’ বা সব কাজের অ্যাপ হিসেবে গড়ে তোলা, যা একাধারে নানা ধরনের সেবা দেবে। তবে বিভিন্ন হিসাব অনুসারে, টুইটার কেনার পেছনে মাস্কের খরচ হওয়া ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মূল্যমান বর্তমানে ধসে মাত্র ৯৪০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
দাম কমে যাওয়ার কারণে বেশ কিছু বড় কোম্পানি এ প্ল্যাটফর্মটি ছেড়ে চলে গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, মাস্কের মালিকানায় আসার পর এক্সে ‘হেইট স্পিচ’ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে এবং অনেক কোম্পানিই এমন ব্র্যান্ডের সঙ্গে নিজেদের নাম জড়াতে চায়নি।
এআই খাতেও মাস্কের বড় ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তিনি চ্যাটজিপিটি’র নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআইয়ের শুরুর দিকের একজন বিনিয়োগকারী ছিলেন। তবে ২০১৮ সালে তিনি সেখান থেকে সরে আসেন।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ‘মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ বোঝার জন্য’ মাস্ক ‘এক্সএআই’ নামে নিজের একটি এআই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআই ও এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মাস্কের অভিযোগ, যে অলাভজনক ও ওপেন সোর্স মূলনীতি নিয়ে তিনি কোম্পানিটি গড়তে সাহায্য করেছিলেন, মাইক্রোসফটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওপেনএআই সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে।
তবে এ বছরের মে মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার এক জুরি বোর্ড মাস্কের এ মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মামলাটি দায়ের করতে মাস্ক অনেক বেশি সময় পার করে ফেলেছেন।
মাস্কের বহুমুখী ও বিস্তৃত আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিক ক্রিস স্টোকেল-ওয়াকার বলেছেন, “তিনি আগামীকাল কী করতে চান তা নিয়ে তিনি নিজেই পুরোপুরি নিশ্চিত কি না তা আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না। তিনি আসলে তার ভেতরের তাড়না বা তাৎক্ষণিক ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেন।”
২০১৫ সালে প্রকাশিত এক জীবনীগ্রন্থে লেখক অ্যাশলি ভ্যান্স মাস্ককে একজন ‘সবজান্তা ও মারমুখী স্বভাবের’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার রয়েছে ‘প্রচণ্ড অহংকার’।
তবে একইসঙ্গে তিনি মাস্ককে একজন ‘আনাড়ি নৃত্যশিল্পী’ ও জনসমক্ষে কথা বলায় কিছুটা জড়তাপূর্ণ ও লাজুক বক্তা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যম তাকে একাধারে একজন ‘খ্যাপাটে জিনিয়াস’ ও এক্সের ‘সবচেয়ে বড় ট্রোল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মাস্ক যেমন নিজের সুদূরপ্রসারী উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য পরিচিত তেমনই পরিচিত ছোটখাটো বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়ানোর জন্যেও।
পাশাপাশি বর্ণবৈষম্য ও নিজের বিভিন্ন দাবির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী ও অন্যদের কাছ থেকে তিনি ও তার বিভিন্ন কোম্পানি যেসব গুরুতর মামলার মুখোমুখি হয়েছে সেগুলো তো রয়েছেই।
ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটেছে মাস্কের, যার মধ্যে দুবারই বিচ্ছেদ হয়েছে একই নারী ব্রিটিশ অভিনেত্রী টালুলাহ রাইলির সঙ্গে। তবে মাস্ক নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারে বেশ অকপট।
২০২২ সালে দেওয়া এক টেড সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেছিলেন, “আপনি যদি কেবল আমার পাপ বা ভুলগুলোর তালিকা করেন তবে আমাকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ বলেই মনে করবেন।
“তবে সেগুলোকে যদি আমার করা সঠিক কাজগুলোর পাশাপাশি রেখে তুলনা করেন তবে পুরো বিষয়টির একটি যৌক্তিক অর্থ খুঁজে পাবেন।”
মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ কত?
মাস্কের এসব সমালোচনা তার বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলার পথে কোনো বাধা হতে পারেনি। ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অধা ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।
বর্তমানে মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গের হিসাব অনুসারে, মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা তাকে গুগলের ল্যারি পেইজ ও সের্গেই ব্রিন, ওরাকলের ল্যারি এলিসন, অ্যামাজনের জেফ বেজোস ও ফেইসবুকের মার্ক জাকারবার্গের মতো শীর্ষ সব প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ারদের চেয়ে অনেক ওপরে স্থান করে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে মাস্কের এ সম্পদ আরও বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। স্পেসএক্সের শেয়ার পরিকল্পিত ১৩৫ ডলার মূল্যে বাজারে ছাড়ার পর মাস্কের মোট সম্পদ এক লাফে প্রায় ৯৮ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
এ ছাড়াও, টেসলার বোর্ড তার জন্য এমন এক ঐতিহাসিক চুক্তি অনুমোদন করেছে, যার ফলে আগামী এক দশকে কিছু সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে তিনি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেতন প্যাকেজ পেতে পারেন।
এ বিপুল অর্থ পেতে হলে মাস্ককে টেসলার বাজারমূল্য আট গুণ বানাতে হবে এবং সেইসঙ্গে ১ কোটি ২০ লাখ টেসলা গাড়ি ও ১০ লাখ এআই রোবট বিক্রি করতে হবে।
অবশ্য এ উপার্জনের পথটি সহজ ছিল না। ২০২৪ সালজুড়ে টেসলার ৫৬০ কোটি ডলারের বোনাস প্যাকেজ নিয়ে মাস্ক তীব্র আইনি লড়াইয়ে জড়ান।
ডেলওয়ারের এক আদালত দুবার এ আবেদনটি বাতিল করলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডেলওয়ার সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত মাস্কের সেই প্যাকেজটি পুনর্বহাল করেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির একনিষ্ঠ সমর্থক মাস্ক ‘বোরিং কোম্পানি’র মতো আরও কিছু ছোট কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত আছেন। নিজেকে একজন কাজ-পাগল মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করা মাস্ক প্রায়ই বলেছেন, তিনি কেবল অর্থ কামানোর জন্য ব্যবসা করেন না।
তার বন্ধু ও টেসলার বিনিয়োগকারী রস গারবার বলেছেন, মাস্ক কেবল তখনই কোনো কাজে হাত দেন যখন তিনি মনে করেন যে সমাজ বা মানবজাতির কল্যাণের জন্য তা কোনো না কোনো কারণে গুরুত্বপূর্ণ।