Published : 20 Aug 2025, 04:14 PM
‘এক্সওয়াইজি ফিল্মস’-এর কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে, এমন ধরনের আন্তর্জাতিক সিনেমা খুঁজে বের করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এ একক স্টুডিওটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ম্যাক্সিম কোট্রে বলেছেন, বিদেশী ভাষার সিনেমার জন্য মার্কিন বাজার সবসময়ই কঠিন ছিল।
“এ ধরনের সিনেমাগুলো এতদিন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় নিউ ইয়র্ক বা অন্য কিছু বড় শহরের কিছু দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যারা সাধারণত বিকল্পধারার সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন।”
এর একটি বড় কারণ হচ্ছে, ভাষার বাধা। যেহেতু এসব চলচ্চিত্র ইংরেজিতে নয়, ফলে অনেক আমেরিকান দর্শক সেগুলো দেখতে আগ্রহী নন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
“আমেরিকা এমন সংস্কৃতি নয়, যেখানকার মানুষ ইউরোপের মতো সাবটাইটেল বা ডাবিংয়ের সঙ্গে বড় হয়েছেন। ইউরোপে মানুষ ছোটবেলা থেকেই বিদেশি ভাষার সিনেমা সাবটাইটেল বা ডাবিংসহ দেখে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে সাবটাইটেলসহ সিনেমা দেখায় বেশিরভাগ আমেরিকানের আগ্রহ কম।”
কিন্তু সেই ভাষাগত বাধা এখন হয়ত নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর ডাবিং সিস্টেমের মাধ্যমে আরও সহজে দূর করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
সম্প্রতি ‘ওয়াচ দ্য স্কাইস’ নামের এক সায়েন্স ফিকশন সিনেমার অডিও ও ভিডিওর কাজটি দেওয়া হয়েছিল ‘ডিপএডিটর’ নামের এক এআই সফটওয়্যারকে।
বিবিসি লিখেছে, সফটওয়্যারটি ভিডিওকে এমনভাবে পরিবর্তন করেছে, যেখানে অভিনেতারা সত্যিই সেই ভাষায়ই কথা বলছে বলে মনে হয়েছে।
কোট্রে বলেছেন, “দুই বছর আগে প্রথমবার আমি এই প্রযুক্তির ফলাফল দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল ভালোই হয়েছে। তবে এখন সর্বশেষ সংস্করণ দেখার পর বলতেই হবে, বিষয়টি অসাধারণ। আমি নিশ্চিত, যদি সাধারণ মানুষ সিনেমাটি দেখেন তবে তারা নিজেরাও এ বিষয়টি খেয়াল করবেন না। তারা ধরেই নেবেন এ সিনেমার অভিনেতারা আসলেই দর্শকের ভাষায়ই কথা বলছেন।”
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ১১০টি এএমসি থিয়েটারে মুক্তি পেয়েছে ‘ওয়াচ দ্য স্কাইস’ সিনেমার ইংরেজি সংস্করণ।
কোট্রে বলেছেন, “এ ফলাফলের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে সিনেমাটি যদি ইংরেজিতে ডাব করা না হত তবে তা কখনই মার্কিন সিনেমা হলে মুক্তি পেত না।
“ডাবিংয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকরা সুইডিশ সিনেমাটি দেখতে পেরেছেন, এমন না হলে খুব কম সংখ্যাক দর্শকই সিনেমাটি দেখতেন।”
তিনি বলেছেন, এমন আরও বেশ কিছু সিনেমা মুক্তির পরিকল্পনা করছে এএমসি।
‘ডিপএডিটর’ সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে ‘ফ্ললেস’ নামের এক কোম্পানি, যার সদর দফতর লন্ডনের সোহো এলাকায়।
২০২০ সালে এ কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন লেখক ও পরিচালক স্কট ম্যান। ‘হাইস্ট, দ্য টুর্নামেন্ট’ ও ‘ফাইনাল স্কোর’সহ বেশ কিছু সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি।
স্কট অনুভব করেছিলেন, তার বিভিন্ন সিনেমা যখন অন্য ভাষায় ডাব করা হয় তখন পুরানো বিভিন্ন ডাবিং পদ্ধতিতে সেই সিনেমার আসল অনুভূতি বা আবেগ ঠিক মতো দর্শকের কাছে পৌঁছায় না।
ম্যান বলেছেন, “২০১৪ সালে হাইস্ট সিনেমায় কাজের সময় আমি দেখলাম সেই সিনেমাটি অন্য ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়েছে। তখনই আমি বুঝতে পারলাম কেন সিনেমা ও টিভি শো বিদেশে ভালোভাবে পৌঁছায় না। কারণ পুরনো ডাবিং পদ্ধতি সিনেমাটির সব কিছুই বদলে দেয়। ওই সিনেমায় ছিলেন রবার্ট ডি নিরোসহ অসাধারণ সব অভিনেতারা।
“এক্ষেত্রে মূল সিনেমার অভিনয় আর মুখের হাবভাব ঠিকমতো মেলে না। একজন নিখুঁত চলচ্চিত্র নির্মাতার দৃষ্টিকোণ থেকে এমনভাবে তৈরি সিনেমা দেখা হলে তা আসল সিনেমার মতো ভালো মনে হয় না।”
‘ফ্ললেস’ তাদের মূল প্রযুক্তিটি এমনভাবে তৈরি করেছে, যা মানুষের মুখকে চিনতে এবং ভিডিওতে তার ছবি পরিবর্তন করতে পারে। কোম্পানিটি এ প্রযুক্তির ধারণা প্রথম পায় ২০১৮ সালের এক গবেষণাপত্র থেকে। তারপর সেটিকে আরও উন্নত করে ব্যবহার করেছে তারা।
ম্যান বলেছেন, “ডিপএডিটর সফটওয়্যারটি বিভিন্ন প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিটি শটে অভিনেতার মুখ, মুখের অংশ, থ্রিডি মডেল করা চেহারা, শরীরের চলাফেরা ও আবেগময় অভিনয় বুঝে নেয়। ফলে সিনেমাতে ডাবিংয়ের পাশাপাশি অভিনয় আরও সাবলীল দেখায়।”
তিনি বলেছেন, ভাষা যাই হোক না কেন অভিনেতাদের মূল অভিনয় একইভাবে ধরে রাখতে পারে এ প্রযুক্তি। এক্ষেত্রে শুটিং বা রেকর্ডিংয়ের আর প্রয়োজন পড়ে না। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচে।
তার মতে, ‘ওয়াচ দ্য স্কাইস’ ছিল বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ ভিজ্যুয়ালি বা দৃশ্যগতভাবে ডাব করা পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। এতেই প্রথম অভিনয় শিল্পীদের মুখ এমনভাবে বদলানো হয়েছে যেন তারা আসলেই অন্য ভাষায় কথা বলছেন, যা কেবল শব্দ নয়, বরং চেহারার ভঙ্গিমাও মিলিয়ে দিয়েছে।
একজন অভিনেতা যেন অন্য ভাষায় কথা বলছেন– তাকে এমন চেহারা দেওয়ার পাশাপাশি আরও অনেক কিছু করতে পারে ডিপএডিটর। সিনেমার একটি দৃশ্যের ভালো পারফরম্যান্স অন্য দৃশ্যেও স্থানান্তর করতে পারে এ সফটওয়্যার। মূল অভিনয়ের আবেগ বা অভিব্যক্তি ঠিক রেখে সংলাপের নতুন লাইন অদলবদল করতে পারে এটি।
‘বিজনেস রিসার্চ ইনসাইটস’-এর এক প্রতিবেদন অনুসারে, নেটফ্লিক্স ও অ্যাপলের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গোটা বিশ্বের মানুষ সিনেমা দেখছে। ফলে বৈশ্বিক সিনেমা ডাবিং বাজার ২০২৪ সালে চারশ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সালে সাতশ ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এ প্রযুক্তির নির্দিষ্ট খরচ বলতে চাননি ম্যান। তিনি বলেছেন, প্রকল্পভেদে কাজের দাম আলাদা হয়ে থাকে।
“আমার ধারণা, পুরো দৃশ্য আবার শুট করার চেয়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খরচ অনেক কম, অর্থাৎ এক-দশমাংশ খরচেই কাজ করা সম্ভব হয়।”
নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, অ্যাপল টিভি’র মতো বিশ্বের শীর্ষ বিভিন্ন স্ট্রিমিং কোম্পানি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে উল্লেখ করে ম্যান বলেছে, তার গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ‘বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম’।
ম্যানের ধারণা, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভাষার বাধা দূর হবে এবং আরও বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে সিনেমা পৌঁছাবে।
তবে ‘ইয়েল ইউনিভার্সিটি’র ফিল্ম ও মিডিয়া বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নেটা আলেকজান্ডার বলেছেন, এআই দিয়ে সিনেমা আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানো বা অন্য ভাষায় ঠিকভাবে মানিয়ে নেওয়া গেলেও এতে করে ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অভিনয়ের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
“সব বিদেশি সিনেমাকে যদি ইংরেজির মতো বানানো হয় তবে দর্শক আসল ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাদ হারিয়ে ফেলবেন। ফলে বিদেশি সিনেমার আলাদা রকমফের বা বৈচিত্র্য আর টের পাওয়া যাবে না, সব একঘেয়ে হয়ে যাবে।
“বিভিন্ন বিদেশি সিনেমা কীভাবে ইংরেজিভাষী দর্শকদের জন্য সহজ করে তোলা যায়– এ প্রশ্ন করার বদলে আমাদের বরং প্রশ্ন করা উচিত কীভাবে এমন দর্শক তৈরি করা যায়, যারা বৈচিত্র্যময় সিনেমা বা অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির সিনেমাকেও আগ্রহ নিয়ে দেখতে শিখবেন।”