Published : 15 Dec 2025, 03:58 PM
আইসিইব্লক নামের একটি মোবাইল অ্যাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারি চাপ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অ্যাপটির নির্মাতা জোশুয়া অ্যারন ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, অ্যাপ স্টোর থেকে আইসিইব্লক সরাতে অ্যাপলকে চাপ দিয়ে সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং এতে তার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল আদালতে করা অভিযোগপত্রে অ্যারন বলেন, আইসিইব্লক এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের এলাকায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখলে অন্যদের সতর্ক করতে পারেন। তার দাবি, যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম প্রকাশ্যে দেখা যায়, তা নিয়ে তথ্য শেয়ার করতে পারা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতায় সুরক্ষিত বক্তব্য।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, “যে ধরনের সুযোগকে সুরক্ষা দিতে প্রথম সংশোধনী রচিত হয়েছিল, প্রকাশ্যে পর্যবেক্ষণযোগ্য আইন ও অভিবাসন প্রয়োগ কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে পারা সেই লক্ষ্যের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু।”
অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর সময় আইসিইব্লকের ব্যবহারকারী ছিল এক কোটি নয়, বরং প্রায় ১০ লাখের বেশি। যারা আগে থেকেই অ্যাপটি ইনস্টল করেছিলেন, তারা এখনো ব্যবহার করতে পারছেন। তবে, নতুন করে ডাউনলোড বন্ধ থাকায় এবং প্রশাসনের বক্তব্যে অনেকে ভয় পেয়ে ব্যবহার বন্ধ করতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
এই মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম, ভারপ্রাপ্ত আইসিই পরিচালক টড লায়ন্স, হোয়াইট হাউসের বর্ডার জার টম হোম্যানসহ আরও কয়েকজন ফেডারেল কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
অ্যাপটি সরানোর বিষয়ে বিচার বিভাগের সরাসরি ভূমিকার কথাও পরে প্রকাশ্যে এসেছে। ফক্স নিউজ ডিজিটালকে অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি বলেন, “আজ আমরা অ্যাপলকে সরাসরি জানাই যে তারা যেন আইসিইব্লক অ্যাপটি তাদের অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে নেয়। অ্যাপল সেটিই করেছে।”
তার ওই বক্তব্যের পরই আইসিইব্লককে ঘিরে প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ আরও জোরালো হয়। অ্যারনের মামলায় বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রকাশ্য দাবি প্রমাণ করে যে অ্যাপটি সরানোর পেছনে সরকারের সক্রিয় চাপ কাজ করেছে, যা মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ, আইসিই ও অ্যাপল তাৎক্ষণিকভাবে সিএনএনের প্রশ্নে কোনো জবাব দেয়নি।
এর আগে প্যাম বন্ডি আইসিইব্লক নিয়ে কড়া অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “আইসিইব্লক আইসিই কর্মকর্তাদের কাজ করতে গিয়ে ঝুঁকির মুখে ফেলে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।”
তবে অ্যারন এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেন। সিএনএনকে তিনি বলেন, “আমি চাই মানুষ বুঝুক, আসলে কী ঘটছে। আমরা এমন একটি নজির স্থাপন করতে চাই, যাতে সরকার যেন মুক্ত বক্তব্য দমন করতে না পারে এবং সাংবিধানিক অধিকারে আঘাত করতে না পারে।”
ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের এপ্রিলে আইসিইব্লক চালু করেন অ্যারন। তিনি অ্যাপটিকে একটি ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা মানুষকে আইসিই-এর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া এড়াতে সাহায্য করে, তবে কোনোভাবেই তাদের কাজে বাধা দেবে না।
অ্যাপে একটি নোটিশও দেখানো হয়, যেখানে লেখা থাকে, “এই অ্যাপ কেবল তথ্য ও নোটিফিকেশনের জন্য। এটি সহিংসতা উসকে দেওয়া বা আইন প্রয়োগে হস্তক্ষেপের জন্য নয়।”
অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে আইসিইব্লক না আসার কারণও মামলার নথিতে উঠে এসেছে। জোশুয়া অ্যারন বলেন, অ্যান্ড্রয়েডে অ্যাপটি চালু করলে ব্যবহারকারীদের পরিচয় ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্যের পূর্ণ গোপনীয়তা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। সে কারণেই তিনি শুরু থেকেই কেবল অ্যাপলের আইওএস প্ল্যাটফর্মেই আইসিইব্লক সীমিত রাখেন।
এ নিয়ে সিএনএনকে তিনি বলেন, “অ্যান্ড্রয়েডে গেলে ব্যবহারকারীদের জন্য যে মাত্রার প্রাইভেসি দরকার, তা আমি নিশ্চিত করতে পারতাম না। মানুষের নিরাপত্তা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
সিএনএন-এ আইসিইব্লক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। টড লায়ন্স বলেন, এই ধরনের অ্যাপ “ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পিঠে কার্যত নিশানা এঁকে দেয়” এবং দাবি করেন, কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা পাঁচ গুণ বেড়েছে।
গত অক্টোবরে বিচার বিভাগের অনুরোধে অ্যাপল আইসিইব্লকসহ এ ধরনের আরও কয়েকটি অ্যাপ আইওএস অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে নেয়। অ্যাপল ইমেইলে অ্যারনকে জানায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে মনে হয়েছে, এই অ্যাপ কর্মকর্তাদের ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং তাই এটি অ্যাপ স্টোর নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।
অ্যারন বলেন, মামলার মাধ্যমে তিনি জানতে চান, অ্যাপল ও প্রশাসনের মধ্যে ঠিক কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল। তার অভিযোগ, সরকার অ্যাপলকে চাপ দিয়ে কার্যত আইসিইব্লককে জনসাধারণের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে তদন্ত ও ফৌজদারি মামলার হুমকি দিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানি ও গণমাধ্যমকেও এমন বক্তব্য থেকে দূরে রাখতে চাওয়া হয়েছে।
এই মামলায় অ্যারন আদালতের কাছে ঘোষণা চান, যাতে বলা হয় সরকারের এই চাপ ও হুমকি প্রথম সংশোধনী লঙ্ঘন করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য বা পদক্ষেপে নিষেধাজ্ঞাও চান তিনি।