Published : 27 Jun 2026, 01:07 PM
পাখির কিচিরমিচিরের ভাষা ডিকোড করে ১ লাখ ডলারের সম্মানজনক পুরস্কার জিতেছেন একজন মার্কিন বিজ্ঞানী।
এ বিজ্ঞানীর এক দশকের গবেষণায় উঠে এসেছে, পাখিরা কীভাবে সুনির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় ও কাজের জানান দেয়, যা ভবিষ্যতে প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের সরাসরি দ্বিমুখী যোগাযোগের পথকে আরও সুগম করে তুলবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
‘জেব্রা ফিঞ্চ’ নামের পাখির ডাকের ১১টি মূল শব্দ ও সেগুলোর অর্থ নিখুঁতভাবে বের করার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’র ড. জুলি এলিকে ২০২৬ সালের ‘কলার-ডুলিটল প্রাইজ ফর টু-ওয়ে ইন্টারস্পিশিস কমিউনিকেশন’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
প্রাণী কল্যাণ ও প্রাণীদের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র সঙ্গে যৌথভাবে ২০২৪ সালে এ পুরস্কারটির প্রবর্তন করে ‘জেরেমি কলার ফাউন্ডেশন’।
বার্ষিক এ পুরস্কারের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের দ্বিমুখী যোগাযোগের সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধানের জন্য ফাউন্ডেশনটি ১ কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
ড. জুলি এলির গবেষণায় উঠে এসেছে কীভাবে জেব্রা ফিঞ্চ পাখিরা এদের পরিচয় দেয়, এরা কী করছে তা জানায় এবং কে কী বলছে তা বিবেচনা না করেই প্রত্যেকের নিজস্ব স্বতন্ত্র স্বর শুনে একে অপরকে চিনতে পারে।
তিনি আরও খতিয়ে দেখেছেন, পাখিরা কখনো কখনো একই রকম শোনানো শব্দের চেয়ে কাছাকাছি অর্থ থাকা বিভিন্ন শব্দের মধ্যে বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
পুরস্কার জেতার পর ড. জুলি এলি বলেছেন, “আমি সত্যিই সম্মানিত বোধ করছি।” তিনি বলেছেন, প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের এ ‘মহৎ প্রচেষ্টায়’ তার গবেষণাটি ভূমিকা রাখবে।
‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র প্রাণিবিজ্ঞানী ও বিচারক প্যানেলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল বলেছেন, গবেষণাটি ‘এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ড. জুলি এলি গবেষণার জন্য জেব্রা ফিঞ্চ পাখিকে বেছে নিয়েছিলেন কারণ এরা অনেক কিচিরমিচির করে। ফলে এদের কাছ থেকে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেছেন, “এসব সদা-চঞ্চল গানের পাখিদের ডাক শোনার সময় আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, এরা আসলে কী বলছে?”
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ড. জুলি এলি এ পাখিদের তৈরি করা বিভিন্ন শব্দ পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড এবং পরিস্থিতি ও পাখির ধরন অনুসারে এদের বিভিন্ন ডাককে আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন।
এরপর এসব ডাকের মধ্যে তথ্য কীভাবে লুকানো বা এনকোড করা ছিল তা বিশ্লেষণ করতে ড. জুলি মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এরপর তিনি কিছু পরীক্ষা চালান, যার থেকে প্রমাণ মেলে, পাখিরাও তার এ শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে একমত।
এমনই এক পরীক্ষায় জেব্রা ফিঞ্চ পাখিরা একটি বোতামে চাপ দিলে তাদের পরিচিত বিভিন্ন ডাকের মধ্য থেকে বিভিন্ন শব্দ বাজিয়ে শোনানো হত। কিছু নির্দিষ্ট ডাকের পর পুরস্কার হিসেবে তাদের কিছু বীজ বা খাবার দেওয়া হত।
পরীক্ষাটি যত এগোতে থাকল বীজ পাওয়া যাবে না এমন বিভিন্ন ডাক এড়াতে বোতাম চেপে সেগুলো ‘স্কিপ’ বা বাদ দেওয়া শিখে গেল পাখিরা।
ড. জুলি এলি বলেছেন, বিষয়টি অনেকটা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও স্ক্রোলিংয়ের মতো, ভিডিওর শুরুটা বিরক্তিকর বা অনুত্তেজক মনে হলে মানুষ যেমন সেটি টেনে পরেরটায় চলে যান পাখিরাও ঠিক তাই করেছে।
ড. জুলি এলি বলেছেন, “এদের এ প্রতিক্রিয়ায় ইঙ্গিত মেলে, এরা কী ধরনের আওয়াজ করছে তার মানসিক ছবি বা ধারণা এদের মাথায় থাকে। অন্যভাবে বললে, এরা নিজেদের প্রতিটি ডাকের মানে স্পষ্টভাবে বোঝে।”
‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স’-এর ফিলোসফার ও বিচারক প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক জোনাথন বার্চ বলেছেন, ড. এলি ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘অসাধারণ এ কাজটি’ করেছেন।
“তিনি কেবল জেব্রা ফিঞ্চের শব্দভাণ্ডারের ১১টি ‘মূল শব্দ’ নিয়ে একটি অভিধানই তৈরি করেননি, বরং চমৎকার সব পরীক্ষামূলক কৌশলের মাধ্যমে খোদ পাখিদের কাছেই জানতে চেয়েছেন, এদের ডাকের অর্থগুলো সঠিক হয়েছে কি না।
“হাজার হাজার রেকর্ড করা ডাক থেকে সেগুলোর অর্থ বোঝার দিকে নিখুঁতভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এলি এ কাজ দারুণ এক উদাহরণ।”
এ পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা অন্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন ফরাসি দল, যারা দেখিয়েছেন কীভাবে আফ্রিকান স্ট্রাইপড ইঁদুর আল্ট্রাসনিক কিচিরমিচিরের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে; একটি সুইস-মার্কিন দল, যারা খুঁজে পেয়েছেন, বোনোবো শিম্পাঞ্জিরা মানুষের বাক্যের মতো করে এদের বিভিন্ন ডাককে সাজিয়ে প্রকাশ করে এবং আরেকটি ফরাসি দল, যারা আইভরি কোস্টের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে শিম্পাঞ্জিদের বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ বোঝার জন্য কাজ করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের নিত্যনতুন অগ্রগতি মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের অর্থপূর্ণ ও সুসংগত যোগাযোগের আশাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের সাহায্যে গবেষকেরা এখন প্রাণীদের ডাক কীভাবে তথ্য প্রকাশ করে তা ডিকোড করছেন।