Published : 07 Dec 2025, 05:21 PM
সৃজনশীলতাকে আরও বিস্তৃতভাবে আবিষ্কার করতে চাইলে আইপ্যাড এখন এক শক্তিশালী মাধ্যম। প্রথম দিকে আইপ্যাড ছিল মূলত কনটেন্ট স্ট্রিমিং বা চলার পথে ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের ডিভাইস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপল এই ডিভাইসটিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যা দিয়ে ডিজিটাল আঁকাআঁকি থেকে শুরু করে পেশাদার ভিডিও এডিটিং পর্যন্ত নানা কাজ করা যায়।
অ্যাপ স্টোরে এমন অনেক অ্যাপ রয়েছে যা নতুন করে সৃজনশীল কাজ শুরু করতে বা দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। এখানে মিলবে তুলনামূলক কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর এমন কিছু অ্যাপের পরিচিতি যেগুলো সৃষ্টিশীল ব্যবহারকারীদের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
প্রোক্রিয়েট
আইপ্যাডে ডিজিটাল আঁকার জগতে ‘প্রোক্রিয়েট’ একটি সুপরিচিত নাম। এর শক্তিশালী ব্রাশ টুল, সহজ ইন্টারফেইস এবং স্বাভাবিক জেসচার কন্ট্রোলের সাহায্যে ব্যবহারকারী অল্প সময়েই ডিজিটাল পেইন্টিং, স্কেচ বা ইলাস্ট্রেশন তৈরি করা সম্ভব।
প্রযুক্তি সাইট টেকক্রাঞ্চ লিখেছে, প্রোক্রিয়েটে বিভিন্ন ধরনের ব্রাশ ব্যবহার করে ক্যানভাসে কাজ করা যায় এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ আইপ্যাড প্রোতে সর্বোচ্চ ১৬কে × ৮কে রেজুলিউশনের ক্যানভাসও তৈরি করা সম্ভব। এই অ্যাপ ব্যবহার করে স্টোরিবোর্ড, জিফ, অ্যানিম্যাটিক, এমনকি ছোট অ্যানিমেশনও তৈরি করা যায়। জেপিজি, পিএনজি ও টিআইএফএফ ধরনের ইমেজ ফাইল সহজেই ইমপোর্ট করা যায়।
অ্যাপটিতে রয়েছে কুইকশেইপ, স্ট্রিমলাইন, ড্রয়িং অ্যাসিস্ট এবং কালারড্রপ যেগুলো কাজের গতি বাড়ায় এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত করে। কাজ শেষ হলে অ্যাপটির টাইম ল্যাপস ‘রিপ্লাই’ ফিচারের মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও হিসেবে দেখা বা সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা যায়।
লুমাফিউশন
পেশাদার ভিডিও এডিটিংয়ের পথে এগোতে চাইলে ‘লুমাফিউশন’ একটি ভালো বিকল্প। আইমুভি’র পর আরও উন্নত ফিচার ব্যবহার করতে চাইলে এই অ্যাপটি বিশেষভাবে উপযোগী। বাজেটবান্ধব এই টুলটি নতুন ভিডিওগ্রাফার, কনটেন্ট মেকার কিংবা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজকে সহজ করে।
লুমাফিউশনে ৪কে প্রোআরইএস এবং এইচডিআর মিডিয়ায় মাল্টি-লেয়ার ভিডিও এডিট করা যায়। এতে চাইলে ভয়েস-ওভার রেকর্ড করা, ইফেক্ট এবং বহু ধরনের ট্রানজিশন যোগ করা, কাস্টম ফন্ট এবং গ্রাফিকস ইমপোর্ট করা যায়। অডিও টিউনিংয়ের জন্য গ্রাফিক ইকিউ, প্যারামেট্রিক ইকিউ, ভয়েস আইসোলেশনসহ বেশ কিছু টুল রয়েছে।
অ্যাপটি বিভিন্ন অ্যাসপেক্ট রেশিও সমর্থন করে যেমন ১৬:৯ ল্যান্ডস্কেপ, ৯:১৬ পোরর্ট্রেইট, স্কয়ার, ওয়াইডস্ক্রিন ফিল্ম, অ্যানামরফিক ইত্যাদি।
অ্যাপটির মূল্য একবারে ২৯.৯৯ ডলার তবে মাল্টিক্যাম এডিটিং এবং ম্যাকের ফাইনাল কাট প্রোতে প্রজেক্ট পাঠানোর ফিচার আলাদাভাবে কেনা যায়।
ক্যানভা
ক্যানভা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে গ্রাফিক ডিজাইনের জ্ঞান ছাড়াই যেকোনো ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি করা যায়। এখানে রয়েছে আড়াই লাখেরও বেশি টেমপ্লেট যেগুলোর সাহায্যে প্রেজেন্টেশন, ইনফোগ্রাফিক, ভিডিও, ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টসহ বহু ধরনের ডিজাইন বানানো সম্ভব।
অ্যাপটিতে ছবি সম্পাদনা করা, লোগো বা অন্য ইমেজ যোগ করা, অডিও যুক্ত করা বা ভিডিও কাটিং ও স্পিড পরিবর্তনের মতো কাজ করা যায়।
ক্যানভাতে কিছু এআইসমর্থিত টুল রয়েছে যেমন ‘ম্যাজিক সুইচ’ দিয়ে ছবির অংশ বাড়ানো বা ‘ম্যাজিক মিডিয়া’ দিয়ে টেক্সট থেকে ছবি তৈরি করা।
অ্যাপটি ফ্রি তবে ১২.৯৯ ডলার দিয়ে মাসিক সাবস্ক্রিপশন নিলে এআই ফিচার, প্রিমিয়াম টেমপ্লেট এবং আরও অনেক টুল ব্যবহার করা যায়।
অ্যাফিনিটি ডিজাইনার ২
অ্যাফিনিটি ডিজাইনার ২ গ্রাফিক ডিজাইন জগতের এক গুরুত্বপূর্ন অ্যাপ যা ভেক্টর আর্ট, পিক্সেল টেক্সচার এবং রিটাচিং তিনটিকেই একই জায়গায় নিয়ে এসেছে। পেশাদার ইলাস্ট্রেটর, ওয়েব ডিজাইনার, গেইম ডেভেলপার কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীরা নিয়মিত এই অ্যাপ ব্যবহার করেন।
এতে লোগো, ব্র্যান্ডিং, ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন, পোস্টার, টাইপোগ্রাফি, স্টিকার, কনসেপ্ট আর্ট, ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন এবং আরও নানা ধরনের কাজ করা যায়। অ্যাপল পেন্সিলের প্রেসার সেনসিটিভিটি, নিখুঁত প্রিসিশন এবং টিল্ট সাপোর্ট সবই অ্যাপটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এতে জেসচার কন্ট্রোল কাজের গতি বাড়ায় এবং নিজের মতো করে কিবোর্ড শর্টকাট সাজিয়ে নেওয়া যায়। প্রয়োজনে ১০ লাখ শতাংশ পর্যন্ত জুম করা যায় যাতে ছোটখাটো অংশও নিখুঁতভাবে দেখা যায়।
অ্যাপটির মূল্য এককালীন ১৮.৪৯ ডলার।
কনসেপ্টস
কনসেপ্টস মূলত একটি ফ্লেক্সিবল ডিজিটাল স্কেচিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে স্কেচ, নোট, মাইন্ডম্যাপ, স্টোরিবোর্ড কিংবা ডিজাইনের খসড়া তৈরি করা যায়। অ্যাপটিতে থাকা নাজ, স্লাইস এবং সিলেক্ট টুল ব্যবহার করে স্কেচের কোনো অংশ আবার না এঁকেও পরিবর্তন করা যায়।
এতে বাস্তব পেন্সিল, কলম ও ব্রাশের মতো স্বাভাবিক টুল রয়েছে। এ ছাড়া স্কেল ও মাপজোকের টুল বাস্তব জগতের মাপ হিসাব করতে পারে। টুল হুইল বা টুল বারকে নিজের মতো কাস্টমাইজ করা যায়।
অ্যাপটির বেসিক ফিচার ফ্রি তবে মাসিক ৪.৯৯ ডলার সাবস্ক্রিপশন নিলে নিজস্ব ব্রাশ তৈরি এবং প্রিমিয়াম এডিটিং টুল ব্যবহারের সুযোগ মেলে।
তায়াসুই স্কেচেস
তায়াসুই স্কেচেস সহজ ও বাস্তবসম্মত স্কেচিং অ্যাপ। এখানে রয়েছে ওয়াটারকালার ব্রাশ, ডিজিটাল অ্যাক্রেলিক, রং মেশানোর ফিচার, গ্রেডিয়েন্ট টুল এবং বিভিন্ন ডেপথ তৈরি করার সুবিধা।
আইপ্যাডে মাল্টিটাস্কিংয়ের মাধ্যমে অন্য অ্যাপ খুলে রেখেই ফাইল বা লেয়ার ড্র্যাগ করা যায়। ‘জেন মোড’ ব্যবহার করলে কোনো বাড়তি মনোযোগ বিচ্ছিন্নতা ছাড়াই আঁকায় মনোযোগ দেওয়া যায়। ব্যবহারকারী চাইলে নিজস্ব ছবি ইমপোর্ট করে তাতে কাজ করতে পারে। অ্যাপটিতে বিভিন্ন ফোল্ডারে নিজের কাজ সংরক্ষণ করার সুবিধাও রয়েছে।
অ্যাপটি ফ্রি তবে মাসিক ২.৯৯ ডলারের সাবস্ক্রিপশন নিলে আরও বেশি লেয়ার, বাড়তি ব্রাশ ও ব্যাকআপ ফিচার পাওয়া যায়।
ডুডেল ড্র
ডুডেল ড্র অন্যান্য অ্যাপের তুলনায় ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়। এখানে প্রতিদিন একটি নতুন শেইপ পাওয়া যায় যা ব্যবহারকারীকে স্কেচের শুরুর ‘+’ পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। শেইপগুলো কখনো সহজ জ্যামিতিক, কখনো জটিল বা বিমূর্ত হতে পারে।
শেইপকে ‘ফ্লিপ’ ও ‘রোটেট’ করে বিভিন্ন দিক থেকে দেখা যায় যা সৃজনশীলতা আরও বাড়ায়। ব্যবহারকারীরা চাইলে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিনের স্কেচ তুলনা করতে পারে যা একদিকে মজার প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে নিয়মিত আঁকার অভ্যাস গড়ে তোলে।
অ্যাপটি একেবারে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে।
স্কেচবুক
স্কেচবুক এমনভাবে তৈরি যে এতে আঁকা মানে প্রায় কাগজে আঁকার মতো অনুভূতি। অ্যাপটির ডিজিটাল কলম ও ব্রাশ বাস্তবের মতো আচরণ করে। ইন্টারফেইসে থাকা বিভিন্ন টুল লুকিয়ে রেখে পুরো মনোযোগ কাজের উপর রাখা যায়।
ব্রাশের সাইজ, অস্বচ্ছতা, ফ্লো ইত্যাদি ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যায়। ‘প্রেডিক্টিভ স্ট্রোক’ ফিচার আঁকা লাইনের অনিয়ম মসৃণ করে যা বিশেষ করে নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য সহায়ক।
অ্যাপটি ফ্রি তবে একবারে ২.৯৯ ডলার দিয়ে প্রিমিয়াম ভার্সন নিলে আরও বেশি ব্রাশ, কাস্টম রঙের প্যালেট, বড় ক্যানভাসে কাজ করার সুযোগ এবং একাধিক ক্যানভাস বা পুরো অ্যালবাম পিডিএফ আকারে এক্সপোর্ট করা যায়।