Published : 23 Jan 2026, 10:48 AM
মহাকাশ জয়ের নেশায় মানুষ আবার চাঁদে ফেরার স্বপ্ন বুনছেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নাসা তৈরি করেছে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রকেট, যা আর্টেমিস ২ মিশনের অংশ। মানুষের অসাধ্য সাধনের এক বিস্ময়কর প্রকাশ নাসার এই রকেট।
‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস নামের রকেটের মূল অংশটি ২১২ ফুট লম্বা। কেবল আকারেই নয়, এর শক্তিও বিস্ময়কর। যাত্রার সময় রকেটটি প্রায় ৮৮ লাখ পাউন্ড ধাক্কা বা শক্তি তৈরি করে মহাকাশের দিকে ছুটে যাবে। যাত্রার শুরুতে রকেটের দুই পাশে থাকা দুটি বুস্টারই প্রয়োজনীয় শক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ যোগান দেবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
অ্যাপোলো মিশন শেষ হওয়ার পর আর্টেমিস ২-ই হবে নাসার প্রথম মিশন, যেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো আবারও চাঁদে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এ অভিযানে চার নভোচারীর একটি দল কেবল ১০ দিনে ‘চাঁদে গিয়ে’ আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
তবে উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে এ বিশাল আকারের রকেট তৈরির প্রক্রিয়াটি মোটেও দ্রুত ছিল না, বরং বেশ ধীর গতির। রকেটের দুই পাশের একেকটি বুস্টার ১০টি আলাদা অংশ জুড়ে তৈরি। এসব অংশ আমেরিকার ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে তৈরির পর রেলগাড়িতে করে প্রায় এক হাজার ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আটটি অঙ্গরাজ্য পেরিয়ে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে এনেছে নাসা।
রকেটের মূল অংশটির উন্নয়নও ছিল ঠিক ততটাই ধীর গতির। নিউ অরলিন্সের মিশাউড সেন্টার থেকে বিশাল এক মালবাহী নৌযানে করে এক হাজার সাড়ে চারশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে কেনেডি স্পেস সেন্টারে আনা হয়েছে এ অংশকে।
আর্টেমিস-১ মিশনটির পর রকেটের ‘হিট শিল্ড’ বা তাপ সুরক্ষা কবচে কিছু সমস্যা ধরা পড়ায় এ কর্মসূচিটি কিছুটা পিছিয়ে যায়। তবে এখন নাসা বলেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চারজন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে এ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হবে।
সবচেয়ে বড় রকেট তৈরির নেপথ্যে কী?
অধিকাংশ রাশিয়ান রকেট ও ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেটের মতো অনেক রকেটই সাধারণত শোয়ানো অবস্থায় বা আড়াআড়িভাবে জোড়া দেওয়া হয়। তবে নাসার বিশাল ‘ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং’ বা ভিএবি-এর ভেতরে লম্বালম্বিভাবে তৈরি হয়েছে আর্টেমিস ২ রকেটটি।
এ জোড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয় রকেটের দুই পাশের বুস্টারগুলো দিয়ে। কর্মীরা একটির পর একটি অংশ ধাপে ধাপে সাজিয়ে এসব বুস্টার তৈরি করেছেন। রকেটটি যত লম্বা হতে থাকে তত এর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কর্মীরা পর্যায়ক্রমে একবার একপাশের ও পরে অন্যপাশের অংশ যোগ করতে থাকেন।
প্রতিটি অংশ খুব সাবধানে সারিবদ্ধ করে বোল্ট দিয়ে শক্ত করে আটকানো হয়। এভাবেই পাঁচটি করে আলাদা অংশ জুড়ে দুটি পূর্ণাঙ্গ বুস্টার তৈরি হয়েছে, যার একেবারে মাথায় বসানো হয় অগ্রভাগ বা ‘নোজ কোন’।
রকেটের দুই পাশের বুস্টারগুলো পুরোপুরি জোড়া লাগানো হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ হচ্ছে এর মূল অংশ বা ‘কোর’ বসানো। এ অংশটি লম্বায় ২১২ ফুট ও এর ভেতরে প্রায় ৭ লাখ গ্যালন অতি-শীতল জ্বালানি জমা থাকে। বুস্টারগুলোর সঙ্গে এই মূল অংশের সংযোগ ঘটানোর কাজটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

এজন্য বিশালাকার এ রকেটটিকে প্রথমে লম্বালম্বিভাবে ওপরে তোলা হয়, তারপর বুস্টার দুটির মাঝখানের অত্যন্ত সরু জায়গায় খুব সাবধানে নামিয়ে এনে একবার ঠিকঠাক বসে যাওয়ার পর মূল অংশটিই পুরো রকেটের মেরুদণ্ড বা প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করে।
কঠিন কাজটি শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে ‘লঞ্চ ভেহিকল স্টেজ অ্যাডাপ্টার’ বসানন নাসার কর্মীরা, যা রকেটের কাঠামোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এর ভেতরের সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখে।
সবশেষে বসানো হয় ‘ইন্টারিম ক্রায়োজেনিক প্রপালশন স্টেজ’, যা রকেটের উপরের অংশ এবং সবার উপরের অংশে বসানো হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ও এর জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা।
রকেট তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর এখন এ বছরই, খুব দেরি হলে এপ্রিল আর দ্রুততম সময়ে ফেব্রুয়ারিতেই এই ঐতিহাসিক মিশন শুরুর আশা করছে নাসা। ২০২২ সালের ‘আর্টেমিস ১’ মিশনটি ছিল মানুষবিহীন। তবে ‘আর্টেমিস ২’ হবে এ মিশনের প্রথম মানুষবাহী মিশন। এ মিশনে চাঁদের মাটিতে নামবেন না চারজন নভোচারী। তবে এ মিশনই হবে গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মানুষের পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে ভ্রমণ।
এই মিশনে থাকছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন। মহাকাশযানটি যখন গভীর মহাকাশে থাকবে, তখন এর প্রতিটি সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করাই হবে এ দলের প্রধান কাজ।
আর্টেমিস মিশন কেন পিছিয়ে গিয়েছিল?
মিশনটি মূলত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা ছিল। তবে আর্টেমিস ১ মিশনের সফল সমাপ্তির পর ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানের ‘হিট শিল্ড’ বা তাপ সুরক্ষা কবচে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘আনইভেন অ্যাবলেশন’ বলে। এ সমস্যা নভোচারীদের জীবনের জন্য খুব বড় কোনো ঝুঁকি না হলেও নাসা কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। ইঞ্জিনিয়াররা যতক্ষণ না এ সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করেছেন ততক্ষণ অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়াররা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনে হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা কবচে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে তারা। তবে আর্টেমিস ২-এর ক্ষেত্রে মহাকাশযানের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথ বা গতিপথ কিছুটা বদলে দিলেই নভোচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মহাকাশযানটির প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় এই কৌশলে রকেটটির গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল থেকে কমিয়ে কেবল ৩২৫ মাইলে নামিয়ে আনা হবে। ঠিক সেই মুহূর্তেই এর প্যারাসুটগুলো নিরাপদে খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন…
৫০ বছর পর চন্দ্রাভিযানে যাচ্ছে নাসা, চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি