Published : 23 Jun 2025, 11:34 AM
পৃথিবীতে কোনও গ্রহাণু বা অ্যাস্টারয়েড আঘাত হানছে– শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমনটি সত্যিই ঘটতে পারে, এটি এক বাস্তব হুমকি, যা ঠেকানোর জন্য এখনও প্রস্তুত নই আমরা।
এ বছরের শুরুর দিকে ‘২০২৪ ওয়াইআর৪’ নামের এক গ্রহাণু শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা, যেটির ২০৩২ সালে পৃথিবীতে আঘাত হানার ঝুঁকি রয়েছে এক থেকে দুই শতাংশ।
তবে নতুন তথ্য বলছে, এ গ্রহাণুটির পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার কোনও ঝুঁকি নেই। কিন্তু এ ঘটনা সবাইকে আবারও ভাবিয়ে তুলেছে, ভবিষ্যতে সত্যিই যদি কোনও ভয়ংকর গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন কী হবে? এ দায়িত্ব কে নেবে?
‘সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি’র নতুন এক গবেষণাপত্রে গ্রহাণু খনন ও পৃথিবীকে রক্ষা উভয়কেই ঘিরে থাকা অগোছালো অনেক জটিল নীতিগত, আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর নজর দিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যারোস্পেস’-এ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি’র বায়োএথিসিস্ট ড. এভি কেনডাল বলেছেন, তারা এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় কাজ করছেন, যেখানে গ্রহাণু নিয়ে কাজের স্পষ্ট কোনও নিয়ম-কানুন বা নেতৃত্ব নেই।
তিনি বলেছেন, বিভিন্ন কোম্পানি ও দেশ গ্রহাণু থেকে মূল্যবান খনিজ সংগ্রহে আগ্রহ দেখালেও কে মহাকাশের সম্পদের মালিক হবে, কীভাবে এসব সম্পদ করের আওতায় আনা হবে বা সম্পদ খননকারীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে সে সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট কোনো আইন নেই।
আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, মহাকাশ ও পৃথিবী উভয়ক্ষেত্রেই দস্যুতা, কর্পোরেট লোভ ও পরিবেশের ক্ষতি এড়িয়ে চলার বিষয়টি।
ড. কেনডাল বলেছেন, পৃথিবীকে আসন্ন গ্রহাণুর আঘাত থেকে রক্ষার জন্য এসব বিষয় বিশেষভাবে জরুরি। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র ডার্ট মিশনে ‘ডিডিমোস’ নামের এক উল্কাপিণ্ডকে সফলভাবে ধাক্কা দিয়ে সেটিকে তার পথে থেকে সরিয়ে দিয়েছিল ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সহযোগিতায় তৈরি এক মহাকাশযান। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম বাস্তব পরীক্ষা, যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, কীভাবে বিপজ্জনক মহাকাশ পাথরকে পৃথিবীকে আঘাত আনা থেকে থামানো যেতে পারে।
এ মিশন বিজ্ঞানীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল ভবিষ্যতে কোনও প্রাণঘাতী উল্কাপিণ্ডের পথ কীভাবে পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু ড. কেনডাল সতর্ক করে বলছেন, এক্ষেত্রে একই দলের ওপর নির্ভর করা, বিশেষ করে যখন রাজনীতি বা অর্থায়নের মতো সমস্যা জড়িয়ে রয়েছে তাতে ঝুঁকি থাকে।
তিনি বলেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার পাশাপাশি নাসার বাজেটে কাটছাঁট, সংস্থাটির সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে। এসব জটিলতা সত্যিকারের হুমকির বিরুদ্ধে সাড়া দিতেও বিজ্ঞানীদের দুর্বল করে দিতে পারে।
এই মুহূর্তে পৃথিবী সুরক্ষার দায়িত্ব সমন্বয়ের জন্য কাজ করছে জাতিসংঘ সমর্থিত ‘স্পেস মিশন প্ল্যানিং অ্যাডভাইসরি গ্রুপ’ বা এসএসপিএজি। তবে ড. কেনডালের অনুমান, তারা কেবল ধরে নিতে পারেন না যে, এ ব্যবস্থা সব সময় ঠিকমতো কাজ করবে, বিশেষ করে সবচেয়ে জরুরি সময়ের বেলায়।
এর বদলে পৃথিবী রক্ষার স্পষ্ট নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা বলেছেন তিনি, যেসব নীতিমালা ঠিক করে দেবে কে কী করবে, কে অর্থ দেবে ও সংকটের সময় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে।
এক্ষেত্রে তিনি ‘ডোন্ট লুক আপ’ নামের সিনেমাটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন, যেখানে গুরুতর এক গ্রহাণুর হুমকিকে নিজেদের লাভের জন্য উপেক্ষা করেছিল মানুষেরা। সিনেমাটি কাল্পনিক হলেও এর বার্তা সত্যি। কারণ স্পষ্ট নিয়ম না থাকলে ভালো উদ্দেশ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
ড. কেনডাল বলেছেন, এখন সময় এসেছে অপ্রকাশিত বা অস্পষ্ট চুক্তির বাইরে গিয়ে মহাকাশ নীতিমালা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে কথা বলার, বিশেষ করে যখন খনন ও প্রতিরক্ষা মিশন আরও সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে। বিপদ ঘটার পর চিন্তা করা শুরু করলে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।