Published : 20 May 2026, 10:22 AM
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করা মামলায় হেরেছেন ইলন মাস্ক। এর মাধ্যমে সাবেক দুই বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতার মধ্যকার লড়াইয়ের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল বটে, তবে মঞ্চ প্রস্তুত হল আরও বড় এক যুদ্ধের।
এ দুই বিলিয়নেয়ারই এখন রেকর্ড গড়ার মতো মোটা অংকের আইপিও বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’-এর সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্স-এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
কোম্পানিটি এ সপ্তাহেই তাদের আইপিও’র তথ্য প্রকাশের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, অল্টম্যানের এআই কোম্পানি ওপেনএআইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য ৮৫ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি, যা এ বছরের শেষদিকে শেয়ার বাজারে পথচলা শুরুর লক্ষ্য নিয়েছে।
২০১৫ সালে মাস্ক ও অল্টম্যান মিলে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে এক তিক্ত বিরোধের জেরে মাস্ক আলাদা হয়ে যান ও মামলা করেন।
‘ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর ম্যানেজিং পার্টনার জিন মানস্টার বলেছেন, “মূল বিষয়টা হচ্ছে, নাটকের অংশটুকু এখন শেষ। এখন আমরা আসল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবো এবং দেখতে পারবো, কোম্পানি দুটি এআইকে ঘিরে কতটা বড় ব্যবসা গড়ে তুলতে পারে।”
স্পেসএক্স ও ওপেনএআই উভয় কোম্পানির পেছনের গল্পই বেশ জটিল। আর এত চড়া দামে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদের কোম্পানির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর শতভাগ আস্থা থাকতে হবে।
বিষয়টি বিশেষভাবে প্রযোজ্য মাস্ক ও অল্টম্যানের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। মাস্ক যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, সেখানে অল্টম্যানকে তিন বছরেরও কম সময় আগে তার নিজের বোর্ডের সদস্যরাই বরখাস্ত করেছিলেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে অল্টম্যান ও মাস্কের এ মুখোমুখি লড়াই গত তিন সপ্তাহ ধরে এক নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি করেছিল। বিষয়টি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই মডেল ও প্রযুক্তি তৈরির বহুবছরের মূল প্রতিযোগিতা থেকে সবার মনোযোগ কিছুটা সরিয়ে দিয়েছিল। আর এ এআই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দুই ব্যক্তিত্ব হলেন অল্টম্যান ও মাস্ক।
২০২৪ সালে ওপেনএআই ও অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মাস্ক। তার অভিযোগ, কোম্পানিটিকে অলাভজনক রাখার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল অল্টম্যানরা তা ভেঙেছেন। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গত দুই বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছিল।
সোমবার আদালতের এক পরামর্শক জুরি প্যানেল সিদ্ধান্ত দিয়েছে, মাস্ক মামলাটি করতে অনেক দেরি করে ফেলেছেন। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্স অবিলম্বে এ সিদ্ধান্তটির সঙ্গে একমত হয়েছেন।
আদালত অবশ্য মাস্কের করা ‘দাতব্য বিশ্বাসের অবমাননা’র বিভিন্ন অভিযোগ সত্যি নাকি মিথ্যা তা খতিয়ে দেখেনি, বরং তারা বলেছে, মামলাটি তিন বছরের আইনি সময়সীমার বাইরে চলে গেছে।
মাস্কের আইনজীবীরা বলেছেন, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে ‘নাইনথ সার্কিট ইউএস কোর্ট অফ আপিলস’-এ আবেদন করবেন। অন্যদিকে, মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে এ সিদ্ধান্তকে কেবলই ‘ক্যালেন্ডারের টেকনিক্যাল সমস্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
“যারা মামলাটি খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখেছেন, তাদের কারও মনেই কোনো সন্দেহ নেই যে অল্টম্যান ও ব্রকম্যান একটি দাতব্য কোম্পানিকে চুরি করে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। এখন একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, তারা ঠিক কখন এমনটি করেছিলেন!”
‘পরাজয় মেনে নিতে না পারা মানুষ’
স্পেসএক্সের বিনিয়োগকারীদের জন্য এ আপিলের পরিকল্পনাটি মোটেও ভালো খবর নয় বলে জানিয়েছেন রস গারবার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাস্কের বিভিন্ন কোম্পানির বড় সমর্থক। তবে একইসঙ্গে অনেকগুলো ব্যবসায় সময় ও মনোযোগ ভাগ করার জন্য তিনি মাস্কের সমালোচনাও করেছেন।
‘গারবার কাওয়াসাকি’র প্রধান নির্বাহী রস গারবার বলেছেন, “সাধারণ মানুষ তাকে কীভাবে দেখছে তা তিনি বোঝেন না। মানুষ তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখছে, যে নিজের পরাজয় মেনে নিতে পারে না। অন্য একজন সফল হচ্ছে দেখে তিনি হিংসা করছেন।”
গারবার বলেছেন, অলাভজনক কোম্পানিগুলোর দায় রক্ষা করা নিয়ে মাস্ক যে উদ্বেগ দেখাচ্ছেন তা দিয়ে তিনি কাউকেই বোকা বানাতে পারছেন না।
গেল বছর কোম্পানিটির কর নথির ওপর ভিত্তি করে নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, আইন অনুসারে ন্যূনতম যে পরিমাণ অর্থ দানের কথা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে মাস্ক ফাউন্ডেশন এবং তাদের দাতব্য তহবিলের বেশিরভাগ অর্থই গেছে মাস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন কোম্পানিতে।
গারবার বলেছেন, “মাস্ক আমেরিকার দাতব্য কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করছেন এ ধারণাটি হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর বিষয়। তিনি নিজেই বুঝতে পারছেন না তাকে কতটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে এসব কথার মাধ্যমে।”
এ আইনি ঝামেলা ছাড়াও স্পেসএক্স নিয়ে মাস্কের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাজানোর ক্ষেত্রে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারি চুক্তির অধীনে মহাকাশে বড় ও পুনরায়ব্যবহারযোগ্য রকেট পাঠানোই এ কোম্পানির মূল কাজ।
এ সপ্তাহে তারা টেক্সাসের স্টারবেইস লঞ্চপ্যড থেকে ‘স্টারশিপ’ রকেটের নতুন এক সংস্করণসহ এর ১২তম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এ ছাড়াও স্পেসএক্সের মালিকানায় রয়েছে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। স্পেসএক্সের সঙ্গে অধিভুক্ত হয়েছে মাস্কের এআই স্টার্টআপ এক্সএআই, যার মধ্যে রয়েছে মাস্কেরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানি এক্স।
গত মাসে কোম্পানিটি বলেছে, তারা ৬ হাজার কোটি ডলারে এআই কোডিং স্টার্টআপ ‘কারসর’ কিনে নেওয়ার চুক্তি সই করেছে। বড় ও বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ওপর মাস্কের একচ্ছত্র ও অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
গত সপ্তাহে বিভিন্ন সরকারি পেনশন ব্যবস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পেসএক্স নির্বাহীদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তারা সবাই যৌথভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করেন।
সেই চিঠিতে তারা কোম্পানির ‘অদ্ভুত ও চরমপন্থী পরিচালনা কাঠামো’ ও বিনিয়োগকারীদের অধিকার বা প্রতিকার পাওয়ার অভাব নিয়ে নিজেদের একগুচ্ছ উদ্বেগের কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন।
তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, “মাস্কের সময় ও মনোযোগ বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।”
তারা আরও বলেছেন, স্পেসএক্স ও টেসলা উভয় কোম্পানিতেই মাস্কের পারিশ্রমিক বা পে-প্যাকেজ নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে। ফলে কোম্পানি দুটি ‘অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, যেখানে তারা তাদের এ যৌথ প্রধান নির্বাহীর মনোযোগ নিজের দিকে ধরে রাখার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে’।
অল্টম্যানের পরবর্তী পদক্ষেপ
এ বিচার প্রক্রিয়াটি ওপেনএআইয়ের জন্য চূড়ান্ত বিজয় হলেও তা এর সমাপ্তি উদযাপনের চেয়ে স্বস্তিই বেশি এনেছে। অল্টম্যান এখন তার পুরো মনোযোগ আবার ‘বে ব্রিজ’-এ, অর্থাৎ যেখানে তার কোম্পানির মূল কার্যালয় সেখানে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।
তবে তার আগে মাস্কের আইনজীবীরা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের ভাবিয়ে তোলার মতো বেশ কিছু ইস্যু বা বিতর্ক সামনে নিয়ে এসেছেন। বাদীপক্ষে থাকা মাস্কের আইনজীবীরা বারবার অল্টম্যানের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ও তার বিরুদ্ধে অবিশ্বস্ত ও নিয়মিত মিথ্যা বলার অভিযোগ এনেছেন।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় অল্টম্যানকে এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যারা বছরের পর বছর ধরে তার আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যাদের মধ্যে ওপেনএআইয়ের সাবেক কর্মী ও বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দারিও আমোদেই’ও রয়েছেন।
২০২৩ সালে যে বোর্ড সদস্যরা অল্টম্যানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছিলেন তাদের নিয়েও অল্টম্যানকে বেশ চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। ওই সময় বোর্ড বলেছিল, অল্টম্যান তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘সবসময় স্পষ্ট বা আন্তরিক ছিলেন না’।
জবাবে অল্টম্যান আদালতে বলেছেন, “আমি বোর্ডকে ধোঁকা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করিনি।”
এর পাশাপাশি রয়েছে অর্থের বড় সমস্যা। অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, আধুনিক ও সর্বাধুনিক বিভিন্ন এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং রিসোর্স বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে কোম্পানির মোটা অংকের পুঁজির প্রয়োজন।
কোম্পানিটি এরইমধ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে। এরপরও তারা রেকর্ড গতিতে নগদ অর্থ খরচ করে চলেছে।
অল্টম্যান আইপিও ছাড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এ মোটা অংকের খরচের বিপরীতে কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল যে আসলেই লাভজনক তা প্রমাণের জন্য বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে তার ওপর অনেক চাপ রয়েছে।
পাশাপাশি অল্টম্যানকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম অ্যানথ্রপিক, যা কর্পোরেট বা এন্টারপ্রাইজ ও এআই কোডিংয়ের বাজারে সফলতা পাচ্ছে।
গেল মাসের শেষদিকে মামলার এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে অ্যানথ্রপিক নতুন এক এন্টারপ্রাইজ এআই সার্ভিস কোম্পানি, আর্থিক খাতের জন্য এআই এজেন্ট ও টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে অবস্থিত ‘এক্সএআই কোলোসাস ১’ বা ডেটা সেন্টারে বড় কম্পিউটিং সক্ষমতার চুক্তি ঘোষণা করেছে।
এরইমধ্যে অল্টম্যানকে তার কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রদবদলের বিষয়টিও সামাল দিতে হচ্ছে। এ বিচার চলাকালীন কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও এ মামলার অন্যতম প্রধান বিবাদী গ্রেগ ব্রকম্যান আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেনএআইয়ের প্রোডাক্ট স্ট্র্যাটেজির দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন।
এপ্রিলে ফিদজি সিমো তার স্নায়বিক-প্রতিরোধ সক্ষমতা সংক্রান্ত জটিলতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত ছুটিতে যাওয়ার পর ব্রকম্যান আপদকালীন বা অস্থায়ী ভিত্তিতে এ অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
‘লংবো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর প্রধান নির্বাহী জেক ডলারহাইড বলেছেন, ওপেনএআই’কে এ বাস্তবতার মুখেও পড়তে হবে যে, স্পেসএক্স সম্ভবত তাদের আগেই শেয়ার বাজারে চলে যাবে এবং অ্যানথ্রপিকও তাদের একদম ঘাড়ের ওপরই নিঃশ্বাস ফেলছে।
“অল্টম্যানের আদালতের এ জয়ের আনন্দ হয়ত খুব বেশিদিন টিকবে না। কারণ মাস্কের স্পেসএক্স ও এর ফলশ্রুতিতে এক্সএআই’ই প্রথম পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে শেয়ার বাজারে আসবে এবং প্রথম আসার সুবিধা হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বড় ধরনের সাড়াও পাবে।
“অল্টম্যান যদি সতর্ক না হন তবে পরবর্তী আইপিও’র ক্ষেত্রে অ্যানথ্রপিকও একই কাজ করতে পারে। তখন এই শীর্ষ সারির এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য তৃতীয় আইপিও হিসেবে বাজারে আসার কারণে বিনিয়োগকারীদের যেটুকু আগ্রহ অবশিষ্ট থাকবে তা নিয়েই ওপেনএআই’কে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।”