Published : 27 Jan 2026, 10:59 AM
মস্তিষ্কের কোষে নেশার আবেশ ছড়িয়ে অ্যালকোহল বা মদ বদলে দিয়েছে মানবজাতির ইতিহাস। আনন্দ আর উৎসবের প্রতীক সেই মদ এখন ক্যান্সারের ঝুঁকি ও শারীরিক অসুস্থতার বার্তা বহন করে। সেই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের বদলে যাওয়া রুচির কারণে মদের সঙ্গে মানুষের এক কোটি বছরের পুরানো ‘প্রেমের সম্পর্কে’ যেন ফাটল ধরেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইকোনমিস্ট লিখেছে, জিভে শ্যাম্পেইনের বুদবুদ, বিয়ারের তিতকুটে স্বাদ বা লাল আঙুর গাঁজানো রস–যাই হোক না কেন, অ্যালকোহল শরীরে ঢোকামাত্র নিজের উপস্থিতির জানান দেয়। মুখগহ্বরের পাতলা ঝিল্লি যখন এর এক ফোঁটা শোষণ করে, তখন প্রথমেই হালকা জ্বালাপোড়া বা রাসায়নিক স্পন্দনের অনুভূতি হয়। পেট খালি থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মদ রক্তপ্রবাহে মেশে, শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায়।
অ্যালকোহলের দ্রুত ভ্রমণের রহস্য লুকিয়ে আছে এর রসায়নে। মদের আসল নাম ইথানল, যা ক্ষুদ্র ও চটপটে এক অণু। পানিতে দ্রবণীয় ও খুব সহজেই একজন নিনজার মতো ‘ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার’ বা মস্তিষ্কের সুরক্ষা দেয়াল টপকে যেতে পারে। এর পরেই শুরু হয় আসল খেলা!
মানব মস্তিষ্কে জেঁকে বসে ইতিহাসকে নতুন রূপ দিয়েছে অ্যালকোহল। গাছ থেকে মানুষের পূর্বপুরুষদের নিচে নেমে আসা থেকে শুরু করে আধুনিক শহর গড়ে তোলা পর্যন্ত সব কিছুতেই এর ভূমিকা রয়েছে। তবে অ্যালকোহল যেমন আনন্দ ও উৎসব নিয়ে আসে, তেমনই বয়ে আনে রোগ-শোক। এ কারণে অ্যালকোহলের প্রতি মানুষের যে চিরচেনা ভালোবাসা, তাতে এখন চির ধরেছে।
বিভিন্ন উন্নত দেশে অ্যালকোহলের বিক্রি কমছে। অনেকের ধারণা, বিশ্বজুড়ে মদ্যপান এখন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ এরপরই কমতে শুরু করবে।
তবে কি ইতিহাসের সেরা এই ‘উৎসবের আসর’ ভেঙে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে সেই সম্পর্কের কথা জানতে হবে, যার আণবিক ছাপ লাখ লাখ বছর আগেই মিলেছিল।
শুরুতেই আসা যাক জৈব-রসায়নে। ইথানল এতটাই বিষাক্ত যে বেশিরভাগ প্রাণী তা খেলে দ্রুত মাতাল হয়ে পড়ে বা বিষক্রিয়ায় মারা যায়। তবে এক্ষেত্রে মানুষ ব্যতিক্রম। কারণ, মানুষের শরীরে দুই ধরনের এনজাইম বা পাচক রস আছে, যা বাউন্সারের মতো এই বিষকে শরীর থেকে বের করে দেয়। অ্যালকোহল হজমের এ ক্ষমতা মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রোথিত।
প্রায় এক কোটি বছর আগে মানুষ, শিম্পাঞ্জি ও গরিলাদের এক সাধারণ পূর্বপুরুষের শরীরে এমন এক জিনগত পরিবর্তন ঘটে, যা তাদের শরীর থেকে আরও দ্রুত ইথানল বের করে দিতে সাহায্য করত।
অক্সফোর্ডের অধ্যাপক রবিন ডানবার বলেন, এ পরিবর্তনটি ঘটেছিল প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে যাওয়ার সময়। ওই সময় বিভিন্ন ক্রান্তীয় বনাঞ্চল এবং প্রায় ৯০ শতাংশ বনমানুষ বা এপস বিলুপ্ত হয়েছিল। এর মধ্যে এক বিশেষ বংশধারা গাছ ছেড়ে মাটিতে খাবার খুঁজে খাওয়ার অভ্যাসের মাধ্যমে টিকে যায়।
গাছে থাকা বনমানুষরা তাজা ফল খেলেও যারা মাটিতে নেমে এসেছিল, তারা খেত নিচে পড়ে থাকা ফল, যেগুলো পচে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে অ্যালকোহল তৈরি করত। এভাবেই হয়ত মানুষের পূর্বপুরুষেরা অ্যালকোহলের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে, যা তাদের ক্যালরি খুঁজে নিতে সাহায্য করেছিল। এ বিষয়টিকে বলে ‘মাতাল বানর’ মতবাদ।
এ মতবাদ বলছে, অ্যালকোহলের গন্ধ ও স্বাদের প্রতি আকর্ষণ মানুষের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার লড়াইয়ে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল। তবে তাদের সেই ‘নেশা’ ছিল বেশ হালকা।
পানামার বুনো তালগাছের পেকে যাওয়া ফলের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেগুলোতে অ্যালকোহলের মাত্রা ৫ শতাংশের বেশি ছিল না, যা এ সময়ের জনপ্রিয় হাইনিকেন বিয়ারের সমান।
ইতিহাসের কোনো এক সময়ে মানুষ নিজ থেকেই মদ বা নেশাজাতীয় পানীয় তৈরি করতে শিখে গিয়েছিল। এর প্রথম জোরালো প্রমাণ মেলে, প্রায় ১০ হাজার বছর আগের নমুনায়।
চীনের ‘জিয়াহু’ নামের এক নব্যপ্রস্তরযুগীয় স্থানে কিছু মাটির পাত্রের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলোতে চাল ও ফলের ওয়াইনের সঙ্গে মেশানো এক ধরনের প্রাচীন মধু-মিশ্রিত মদ ছিল। ধারণা করা হয়, মানুষ সম্ভবত এরও অনেক আগে থেকে খোল বা পশুর চামড়ার থলিতে মদ তৈরি করত।
মদ বা নেশাজাতীয় পানীয় মানুষকে বড় বড় বসতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। কোনো দলে সদস্য সংখ্যা একশর বেশি হলে সবার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন এমন কিছু সামাজিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, যা অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
ড. ডানবার বলেছেন, হালকা নেশা বা উৎসবের মাধ্যমে পালন করা সামাজিক বিভিন্ন রীতিনীতিই সম্ভবত এসব বড় বড় জনপদকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছিল।
আদিম সমাজে দলবদ্ধভাবে ভোজ বা উৎসবের আয়োজনের অনেক প্রমাণ রয়েছে। অ্যালকোহল মূলত সেসব আয়োজনকে আরও শক্তিশালী করেছে, যা একটি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে। যেমন একসঙ্গে হাসাহাসি করা; গান গাওয়া, নাচা, গল্প বলা ও উপাসনা করা।
এ ধরনের প্রতিটি কাজই শরীরে ‘এনডরফিন’ হরমোন তৈরি করে, যা অ্যালকোহলও করে থাকে। মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক ‘ওপিওয়েড’ বা আফিম হিসেবে পরিচিত এ হরমোন মানুষের মনে আনন্দ, তৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি তৈরি করে। অল্প মাত্রায় মদ্যপান উদ্বেগ কমায় ও মনের জড়তা কাটিয়ে মানুষকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
ড. ডানবার বলছেন, এনডরফিন সিস্টেম মানুষের ব্যথা সহ্যের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় এবং মনে এক ধরনের ‘আপনত্বের’ অনুভূতি তৈরি করে। এভাবেই সামাজিক মদ্যপান মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করত, যা আদিম সমাজকে একে অপরকে সহযোগিতা করতে, বিবাদ মেটাতে ও জোট গঠনে সাহায্য করেছিল।
‘সেরোটোনিন’ ও ‘ডোপামিন’ নামে মস্তিষ্কের দুটি নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয় মদ, যা মানুষকে আরও মিশুক করে তোলে। তখন মানুষ কথা বলতে বেশি পছন্দ করে, অন্যের কৌতুকগুলো তখন বেশি মজার মনে হয়। অন্যকে দেখতে আরো আকর্ষণীয় লাগে, যাকে বলে ‘বিয়ার গগলস’ বা নেশার ঘোরে সুন্দর দেখা।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, দু-এক পেগ মদ্যপানের পর একজন মানুষকে একজন সচেতন ব্যক্তির কাছেও আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। তবে কেন এমনটি হয়, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
একটি তত্ত্ব বলছে, সামান্য পরিমাণ অ্যালকোহল পান করলে মানুষের চেহারায় এক ধরনের সজীবতা বা দীপ্তি আসে, যা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। আরেকটি ধারণা বলছে, সামান্য মদ্যপান মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে তোলে, আর প্রফুল্ল চেহারাই অনেকের কাছে আকর্ষণীয়।
‘নেশার ঘোরে মানব ইতিহাস’
মদ মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। মূলত মস্তিষ্কের এ অংশটিই বিচারবুদ্ধি ও নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কাজটিন করে। ফলে মাতাল অবস্থায় সমালোচনা করার প্রবণতা কমে আসে এবং মানুষ অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে অ্যালকোহল তরুণ প্রজন্মকে সময়ের আগে ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন মিলনে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করেছে।
মদ্যপান সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে–এ ধারণা আধুনিক বিভিন্ন গবেষণাও সমর্থন করে। ড. ডানবার বলেন, যারা নিয়মিত স্থানীয় পানশালা বা পাবে আড্ডা দেন, তাদের বন্ধু-বান্ধব বা পরিচিত মহলের পরিধি বড় ও নিবিড় হয়। এসব নিবিড় সম্পর্কই মানুষের জীবনে অধিক সন্তুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। মজবুত সামাজিক সম্পর্ক মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এভাবেই ইতিহাসের প্রতিটি ধাপে মদের গ্লাসের টুং টাং শব্দের তালে তালে মানব সভ্যতা এগিয়েছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস, চীন ও মায়া সাম্রাজ্যসহ আরও অনেক দেশেই মানুষ দেবতাদের উদ্দেশ্যে সুরা উৎসর্গ করতেন। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে মাতাল করা উৎসবের আয়োজন হত, এমনকি পিরামিড নির্মাতাদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ হিসেবেও মদ দেওয়া হত।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়া’র অধ্যাপক এডওয়ার্ড স্লিঙ্গারল্যান্ড বলেছেন, অ্যালকোহল কেবল উন্নতির সঙ্গী ছিল না, বরং তা ছিল উন্নতির পূর্বশর্ত।
২০২১ সালে প্রস্তাবিত তার ‘ড্রাঙ্ক হাইপোথিসিস’ অনুসারে, মানুষের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ওপর অ্যালকোহলের প্রভাবই মূলত বড় মাপের ও স্তরবিন্যাসিত সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা গোত্রবাদী প্রাইমেটদের (মানুষ) অপরিচিতদের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ করে দিয়েছিল।
তবে সভ্যতার ওপর নেশার এই প্রভাব আসলে কতটা গভীর তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘হিউম্যানিটিস অ্যান্ড সোশাল সায়েন্সেস কমিউনিকেশনস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৮৬টি কম শিল্পোন্নত সমাজকে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তাতে দেখা যায়, মধু-মিশ্রিত মদ, ওয়াইন বা বিয়ারের মতো পানীয়ের উপস্থিতি ও উচ্চতর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। তবে কৃষিকাজের প্রভাবটি সরিয়ে দিলে এ সম্পর্কটি বেশ ক্ষীণ হয়ে আসে। কারণ কৃষিকাজই মূলত উন্নত রাজনৈতিক সংহতি ও মদ তৈরির প্রধান চালিকাশক্তি।
এখন প্রশ্ন হল, আদিম মানুষ কি চাষী হওয়ার কারণে প্রচুর মদ্যপান করত? নাকি তারা মাতাল হতে পারত বলেই আজ এত সভ্য? পণ্ডিতদের এই বিতর্ক হয়ত শেরির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চলতেই থাকবে।
‘মানুষকে অপরিচিতের সঙ্গে মিশে কাজ করতে শিখিয়েছে মদ’
মানুষকে এখন তার পূর্বপুরুষদের মতো পচা ফল খুঁজে বেড়াতে হয় না, মদ পাওয়া এখন অনেক বেশি সহজ। যে পরিমাণ জিন পান করলে একজন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষ মারা যাবেন, সেটি কারখানায় তৈরি করতে মাত্র কয়েক পেনি খরচ হয়।
বেশিরভাগ দেশ মদ্যপান নিয়ন্ত্রণে রাখতে এর ওপর চড়া হারে ট্যাক্স বসায়। তবে ট্যাক্স খুব বেশি হয়ে গেলে মানুষ তখন ঘরে তৈরি অবৈধ মদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ব্রিটেনের ‘পানপ্রিয়’ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল গর্ব করেই বলতেন, “মদ আমার কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে আমি মদের কাছ থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা আদায় করে নিয়েছি।”
চার্চিলের ক্ষেত্রে এমনটি সত্য হোক বা না হোক, অনেকের ক্ষেত্রেই তা খাটে না।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ মানুষ অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে মারা যান। যকৃৎ, দাম্পত্য জীবন ও ক্যারিয়ার সবই ধ্বংস করে দিতে পারে মদ।
দীর্ঘকাল ধরে ভাবা হত, পরিমিত মদ্যপান স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সামান্য পরিমাণ মদ্যপানও শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, অ্যালকোহলের কোনো মাত্রাই শরীরের জন্য নিরাপদ নয়। মদকে ‘বিষাক্ত, মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত ও আসক্তি তৈরিকারী উপাদান’ এবং ‘প্রথম শ্রেণির ক্যানসার তৈরিকারী বস্তু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তারা।
যাদের শরীরে জিনগতভাবে অ্যালকোহল হজমের ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
পূর্ব এশীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৫৪ কোটি মানুষের শরীর ‘অ্যাসিটালডিহাইড’ বা অ্যালকোহলের এক বিষাক্ত উপজাত ভাঙতে হিমশিম খায়। ফলে মদ্যপানের পর অনেকের মুখ স্পষ্ট লাল হয়ে যায়, যাকে চলতি ভাষায় বলে ‘এশিয়ান ফ্লাশ’।
‘ভবিষ্যতের সুরা’
বর্তমানের এ পরিবর্তনের দিকে কড়া নজর রাখছে মদ শিল্প বা পানীয় উৎপাদক বিভিন্ন কোম্পানি। এখন মদের বিকল্প হিসেবে অ্যালকোহলহীন বা নামমাত্র অ্যালকোহল মেশানো পানীয়, যাকে পেশাদার ভাষায় ‘লোলো’ বলে, তা তৈরির দিকে ঝুঁকছে তারা।
আগে অ্যালকোহলবিহীন বিয়ারের স্বাদ খুবই বাজে ছিল। তবে এখনকারগুলো বেশ সুস্বাদু। বিশ্বজুড়ে এর বাজারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে এই বাজার ছিল ২৬০০ কোটি ডলারের, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ ৪৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মদের বিকল্প তৈরির আরেকটি উপায় হল, ভিন্ন সব উপাদান ব্যবহার করে এমন পানীয় তৈরি করা, যা অ্যালকোহলের মতোই আনন্দদায়ক অনুভূতি দেবে। জিনসেং, এল-থিয়ানিন, অশ্বগন্ধা, লায়ন্স মেন (এক ধরনের মাশরুম) বা সিবিডি’র মতো ভেষজ উপাদানে তৈরি এসব ‘ফাংশনাল ড্রিঙ্কস’ মানুষকে শান্ত করতে, চনমনে রাখতে বা সামাজিক মেলামেশায় জড়তা কাটাতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ভেষজ জগত সুরাপ্রেমীদের সামনে এমন অসংখ্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদান মেশানো পানীয়ও বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে, যা মানসিক প্রশান্তি দিতে কার্যকর। তবে আসল মদের মতো স্বাদ বা কার্যকর কোনো ভেষজ পানীয় তৈরি করা বেশ কঠিন। ‘ইম্পসিব্রু’, গ্যাবির, থ্রি স্পিরিট ও কোলাইডারের মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ড এমনটি তৈরির চেষ্টা করেছে।
‘মদ ছাড়াই নেশার আমেজ পাওয়ার খোঁজ এখন তুঙ্গে’
বেঁচে থাকার সংগ্রামে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ক্যাফেইন, ধূমপান ও মদ্যপান করছেন। পাগল হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে মানুষের এমন কিছু একটা প্রয়োজন, যা কিছুটা স্বস্তি দেবে বা মনের অবস্থা বদলে দেবে।
মানুষ তার মনের অবস্থা পরিবর্তনের অনেক পথ খুঁজে বের করেছে। যেমন ধ্যান, সাইকেডেলিক ড্রাগস, অসংলগ্নভাবে কথা বলা, নাচ, ঢাক-ঢোল বাজানো বা মন্ত্র জপ করা।
এসব কিছুই সরাসরি মস্তিষ্কের অবস্থাকে বদলে দেয় বা চঞ্চল মনকে বর্তমান সময়ে স্থির করে। তবে গত এক কোটি বছর ধরে অ্যালকোহলের মতো এত বহুমুখী, সহজে বহনযোগ্য ও আনন্দদায়ক আর কিছুই ছিল না।
মদ্যপানের মতো কোটি বছরের পুরানো অভ্যাস রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে না। যেসব সমাজ শ্যাম্পেন দিয়ে সাফল্য উদ্যাপন করে, ওয়াইন দিয়ে যিশুর বন্দনা করে বা টাকিলা দিয়ে পার্টির আমেজ জমিয়ে তোলে, তারা খুব সহজে জিনসেং সোডার দিকে ঝুঁকবে না।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ড্রইংরুমের চিত্র বদলে যেতে পারে। অ্যালকোহলবিহীন বিয়ারের স্বাদ যত উন্নত হবে, মানুষ ততই তা পান করে সামাজিক আড্ডায় অংশ নিতে এবং নিরাপদে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে উৎসাহিত হবে।
বিভিন্ন ভেষজ বা কার্যকরী পানীয় যত উন্নত হবে, মানুষ মদ ছাড়াই একই রকম ‘কিক’ বা আমেজ খুঁজবেন। ভবিষ্যতে মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রভাবিত করার আরও অনেক সুনির্দিষ্ট উপায় বেরিয়ে আসবে। মানুষ হয়ত পুনরায় পরিমিত মদ্যপানের অভ্যাস ফিরে পাবে; ঠিক ততটুকুই পান করবে, যতটুকু তাদের আদিম যকৃৎ সহ্য করতে পারে।
চার্চিল হয়ত এমন ভবিষ্যৎ দেখে হতাশ হতেন। তবে অন্যরা হয়ত তা উদযাপন করবেন ফলের রসের ঝলমলে বোতলের ছিপি খুলে, যাতে মেশানো থাকবে এখনও আবিষ্কৃত না হওয়া কোনো এক ভেষজ নির্যাস।