Published : 11 Jun 2026, 02:41 PM
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ধুম লাগার মধ্যেই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বড় ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকি বেড়েছে এবং সবচেয়ে বড় গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি হয়ে উঠেছে চীনা হ্যাকাররা– এমনই বলছে শীর্ষ এক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ক্রাউডস্ট্রাইক বলেছে, গেল এক বছরে প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানির জন্য চীনভিত্তিক হ্যাকাররাই গুপ্তচরবৃত্তির সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রাউডস্ট্রাইকের দাবি, এসব হ্যাকিং অভিযান চীন সরকারের কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মেধা সম্পদ বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এবং কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পেছনে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের যে আগ্রহ রয়েছে এ হ্যাকিংয়ের ধরন তারই প্রমাণ।
বিদেশি রাষ্ট্র ও সাইবার অপরাধী উভয় পক্ষের কাছেই প্রযুক্তি খাত আবারও প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে যেসব কোম্পানি কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, আইটি সেবা, পরামর্শ এবং সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন করে তাদের ওপর আসা বিভিন্ন হুমকি ক্রাউডস্ট্রাইকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে আক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির নাম প্রকাশ করেনি ক্রাউডস্ট্রাইক।
এদিকে, এ হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ও পুরো প্রতিবেদনটিকেই ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস।
রয়টার্স লিখেছে, ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাইবার হামলার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ক্রাউডস্ট্রাইক।
কোম্পানিটির কাউন্টার অ্যাডভারসারি অপারেশন্স প্রধান ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম মেয়ার্স বলেছেন, এমন সময়ে এ তথ্য সামনে এল যখন এআই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির বাজারমূল্য ও বিনিয়োগ আকাশচুম্বী। ঠিক এ কারণেই এআই কোম্পানিগুলো হ্যাকারদের সবচেয়ে লোভনীয় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক উদাহরণের কথা উল্লেখ করে ২৩ এপ্রিল হোয়াইট হাউসের ‘অফিস অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পলিসি’ চীনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে।
তারা বলেছে, চীনভিত্তিক কিছু কোম্পানি নিজেদের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিভিন্ন এআই মডেল গোপনে হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ‘পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বড় ধরনের অভিযান’ চালাচ্ছে।
মেয়ার্স বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বর্তমানে এআই তৈরির প্রতিযোগিতা বা কোল্ড ওয়ার চলছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যেই এই খাতে বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
“এ হুমকি কেবল সামনের সারির বিভিন্ন ল্যাবের জন্যই নয়, বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করা ছোট এআই মডেল ডেভেলপারদের জন্যও সমান বিপজ্জনক।”
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “চীন সব ধরনের হ্যাকিং কার্যক্রমের বিরোধী এবং আইন অনুসারে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। সাইবার নিরাপত্তার অজুহাতে চীনের ওপর এমন অপবাদ ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে।”
মুখপাত্রটি আরও বলেছেন, এআইয়ের উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “ওই সময় দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এআই প্রযুক্তি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে সংলাপ শুরু করতে একমত হয়েছেন।”
ক্রাউডস্ট্রাইক প্রতিবেদনে বলেছে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং অভিযানগুলোও প্রযুক্তি খাতের জন্য ‘বড় হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিতে আইটি চাকরি হাতিয়ে নিচ্ছে।
এসব কর্মীর বেতনের বড় একটি অংশ চলে যায় পিয়ংইয়ং সরকারের তহবিলে। পাশাপাশি, কোম্পানির ভেতরে থাকা এসব পদকে তারা তথ্য বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করছে।
এ ছাড়া রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগ থাকা হ্যাকার দলগুলোও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষেত্রবিশেষে মারাত্মক ম্যালওয়্যার হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের প্রযুক্তি খাতকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
একই সময়ে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিকে টার্গেট করা বিভিন্ন সাইবার অপরাধী চক্রের তৎপরতাও ব্যাপকহারে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ক্রাউডস্ট্রাইক।
এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির তথ্য বা সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ বিক্রির জন্য হ্যাকারদের দেওয়া বিজ্ঞাপনের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।