Published : 21 Jun 2026, 01:46 PM
প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ অঞ্চলে ইতিহাসের প্রাচীনতম প্লেগ মহামারীর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের এ প্রাদুর্ভাবটি শিশু ও টিনএজারদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ছিল, যা মানব ইতিহাসে এ জীবাণুর আদি উৎপত্তির ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
ওই যুগে সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ অঞ্চলে শিকারী ও সংগ্রহকারীদের কিছু দল বাস করত। হরিণ, এল্ক, মুস, মাছ, সিল ও ‘মারমোট’ নামের এক ধরনের বড় ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মতো অনেক প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে তারা জীবনধারণ করতেন। এসব মানুষই ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন প্লেগ মহামারীর শিকার হয়েছিলেন।
গবেষকরা বলছেন, ওই এলাকার চারটি সমাধিস্থলে পাওয়া দেহাবশেষ থেকে প্রাচীন ডিএনএ পরীক্ষা করে প্লেগ জীবাণু ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’-এর সবচেয়ে পুরানো স্ট্রেইনের সন্ধান মিলেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের এসব মৃত্যু সেই চরম দুর্ভোগেরই পূর্বাভাস ছিল, যেখানে পরবর্তী হাজার হাজার বছর ধরে মানবজাতি বয়ে নিয়ে এসেছে এ রোগ।
সমাধিস্থলগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন, এ মহামারীটি তরুণ বা কম বয়সীদের জন্য বেশি প্রাণঘাতী ছিল। এর কারণ হিসেবে তারা এসব প্রাচীন স্ট্রেইনের এমন কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্যকে দায়ী করেছেন, যা বর্তমান যুগের প্লেগ জীবাণুতে আর দেখা যায় না।
এ গবেষণায় জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, মারমোট’ই ছিল এ ব্যাকটেরিয়ার আদি উৎস বা হোস্ট প্রজাতি এবং ইউরেশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আগে মধ্য বা উত্তর-পূর্ব এশিয়াতেই প্রথম প্লেগের উৎপত্তি হয়েছিল।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কোপেনহেগেন’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর বিবর্তন বিষয়ক জিনতত্ত্ববিদ এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক এসকে উইলারসলেভ বলেছেন, “মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাব ফেলা এ রোগের উৎপত্তি এবং এর প্রাথমিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণা নতুন গবেষণাটি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।”
বুধবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।
প্লেগের এর পরের প্রাচীনতম অস্তিত্বের খোঁজ মেলে ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার বছর আগে লাটভিয়ায়, যা বৈকাল হ্রদ থেকে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর বিবর্তন বিষয়ক জিনতত্ত্ববিদ ও এ গবেষণার প্রধান লেখক রুয়ারিড ম্যাকলিওড বলেছেন, “প্রাচীন ডিএনএ নিয়ে গবেষণার নতুন পদ্ধতির কারণেই আমরা জানতে পেরেছি, ঐতিহাসিক নথিপত্রের চেয়েও বেশি সময় ধরে রোগটি পৃথিবীতে রয়েছে, যা ‘জুনোটিক’ বা প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায় এমন রোগ, অর্থাৎ এ জীবাণু মানুষের চেয়ে ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেই বেশি টিকে থাকে। তবে বারবার মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে।”
এসব প্রভাবের মধ্যে রয়েছে ইউরোপের জনসংখ্যার বড় এক অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া দুটি বড় মহামারী, যেমন ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘প্লেগ অফ জাস্টিনিয়ান’ ও চতুর্দশ শতাব্দীর ‘ব্ল্যাক ডেথ’। ওই সময় ইঁদুরের দেহে থাকা সংক্রামিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে প্লেগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, মানুষ কৃষিকাজ শুরু ও জনবসতি গড়ে তোলা, অর্থাৎ যখন জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি ছিল তখনই প্লেগের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।
আবার অনেকের ধারণা ছিল, শুরুর দিকের প্লেগ জীবাণুর স্ট্রেইন হয়ত কম ছিল। তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের শিকারী-সংগ্রহকারী জনগোষ্ঠী, যারা হয়ত কেবল কয়েক ডজনের ছোট ছোট দলে দূরবর্তী বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়াত তাদের ওপর প্লেগের এ প্রাণঘাতী আক্রমণ এসব প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
বৈকাল হ্রদে মোট ৪৬টি মৃতদেহ পরীক্ষা করে ১৮টিতে ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ জীবাণুর উপস্থিতি মিলেছে। এ হার মধ্যযুগের কিছু প্লেগ আক্রান্ত গণকবরের চেয়েও বেশি।
গবেষক ম্যাকলিওড বলেছেন, এ শিকারী-সংগ্রহকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন বড় আকারের প্রাণঘাতী প্লেগের প্রমাণের দেখা পাওয়াটা ‘একেবারে বিস্ময়কর’।

‘এক রূপান্তরকালীন পর্যায়’
গবেষকরা সমাহিত প্লেগ আক্রান্তদের দাঁতে সংরক্ষিত একাধিক ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ জিনোম উদ্ধার করেছেন। এসব স্ট্রেইন মূল ব্যাকটেরিয়ার খুবই কাছাকাছি, যা হয়ত এর বিবর্তনীয় পূর্বসূরি থেকে কেবল দুই শতাব্দী আগে আলাদা বা রূপান্তরিত হয়েছে।
এসকে উইলারসলেভ বলেছেন, “রোগটি প্লেগের বিবর্তনের রূপান্তরকালীন এক পর্যায়কে নির্দেশ করে, যা এরইমধ্যে গুরুতর রোগ ছড়াতে পারলেও পরবর্তীকালের মহামারী তৈরিকারী বিভিন্ন স্ট্রেইনের মতো সব ধরনের অভিযোজন সক্ষমতা তখনও পায়নি।”
প্লেগের এসব প্রাচীন স্ট্রেইনে এমন জিনের ঘাটতি ছিল, যা মাছির মাধ্যমে কার্যকরভাবে রোগ ছড়াতে এবং পরে মহামারীগুলোর মতো মাছির কামড়ের জায়গা থেকে নিকটবর্তী ‘লিম্ফ নোড’ বা লসিকা গ্রন্থিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে ব্যথাদায়ক ফোলা ভাব তৈরিতে সাহায্য করে।
তাদের মধ্যে এমন এক জেনেটিক বৈচিত্র্য ছিল, যা আগের সময়ের প্লেগের স্ট্রেইনগুলোতে দেখা যায় না। এসব স্ট্রেইন মারাত্মক প্রদাহজনিত জটিলতা তৈরি করতে পারত, যার প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল ছিল শিশুরা। সমাধিক্ষেত্রে সমাহিতদের অনেকেই ছিল শিশু এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা ছিল আপন ভাই-বোন।
ম্যাকলিওড বলেছেন, “রোগের ঝুঁকিটি ৮ থেকে ১২ বছর বয়সীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বৈকাল হ্রদের অন্যান্য শিকারী-সংগ্রহকারীদের সমাধিস্থল, যেখানে প্লেগের অস্তিত্ব মেলেনি সেখানের মৃত্যুর হারের তুলনায় এমনটা স্পষ্টতই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র।
গবেষক ম্যাকলিওড বলেছেন, “প্লেগ সংক্রমণকে মারাত্মক করে তোলে এমন অন্যান্য জিনের উপস্থিতির কারণে বিষয়টি স্পষ্ট যে, প্রাগৈতিহাসিক প্লেগের এসব স্ট্রেইন ভিন্ন উপায়ে হলেও সমানভাবে প্রাণঘাতী।”
গবেষকদের অনুমান, শিকারী-সংগ্রহকারীরা মারমোটের খুব কাছাকাছি সংস্পর্শে আসে এবং এসব প্রাণীই মহামারীটিকে আরও উসকে দিয়েছে। এ রোগটি মারমোট থেকে মানুষের দেহে প্রবেশের পর তা মানুষের থেকে মানুষে কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।