Published : 09 May 2026, 03:23 PM
বিশ্বজুড়ে ইনস্টাগ্রামের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ফিচারটি বন্ধ করে দিয়েছে মেটা। ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা এখন থেকে আর ডাইরেক্ট মেসেজ বা ডিএম-এ মেসেজ পাঠানোর ক্ষেত্রে এ প্রাইভেসি সুবিধাটি পাবেন না।
বিবিসি লিখেছে, মেসেজের ওপর থেকে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সরিয়ে নেওয়ার এ সিদ্ধান্তটি ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি মেটার জন্য বড় এক ইউ-টার্ন। এর আগে মেটা এ প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার জন্য সেরা মানদণ্ড হিসেবে প্রচার করেছিল।
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন হচ্ছে অনলাইন মেসেজিংয়ের সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি, যেখানে কেবল প্রেরক ও প্রাপকই মেসেজটি দেখতে পারেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রচারকর্মীরা এর বিরোধিতা করে আসছিলেন।
তাদের মতে, এ প্রযুক্তির কারণে ইন্টারনেটে উগ্র বা আপত্তিকর বিষয় ছড়িয়ে পড়ে ও কর্তৃপক্ষ সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
মেটার এ সিদ্ধান্তকে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন দাতব্য সংগঠন স্বাগত জানালেও ব্যক্তিগত প্রাইভেসি রক্ষা কর্মীরা এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ফিচারটি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ইনস্টাগ্রাম এখন থেকে ব্যবহারকারীদের সব মেসেজ, ছবি, ভিডিও ও ভয়েস নোট দেখতে বা অ্যাক্সেস করতে পারবে।
অথচ ২০১৯ সালে মেটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মেসেজিং সিস্টেমে এ প্রযুক্তি যোগ করবে। সে সময় তারা বলেছিল, ব্যবহারকারীদের ভবিষ্যৎ হবে ‘ব্যক্তিগত ও গোপন’।
২০২৩ সালে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে এ প্রযুক্তির কাজ সম্পন্ন এবং পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রামে ঐচ্ছিক হিসেবে চালু করেছিল মেটা। পরিকল্পনা ছিল, ভবিষ্যতে এ ফিচারটিই হবে মেসেজ পাঠানোর ডিফল্ট বা সাধারণ পদ্ধতি।
দীর্ঘ সাত বছর পর মেটা ইনস্টাগ্রামে এ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ইনস্টাগ্রাম এখন থেকে কেবল ‘স্ট্যান্ডার্ড এনক্রিপশন’ সুবিধা দেবে।
স্ট্যান্ডার্ড এনক্রিপশন হচ্ছে, প্রয়োজন পড়লে ইন্টারনেট সেবাদাতা কোম্পানি কারো ব্যক্তিগত মেসেজ বা তথ্য দেখতে পারবে। জিমেইলসহ বেশিরভাগ বড় অনলাইন সেবায় এ সাধারণ পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন যেমন ‘এনএসপিসিসি’ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল, প্রযুক্তিটি শিশুদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সংগঠনটির প্রতিনিধি রানি গোভেন্ডার বলেছেন, মেটার এমন পদক্ষেপে “আমরা সত্যিই আনন্দিত।” এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের আড়ালে অপরাধীরা শনাক্ত হওয়া থেকে বেঁচে যায়। ফলে শিশুদের উত্ত্যক্ত বা নির্যাতনের মতো ঘটনা আড়ালেই থাকে।
অন্যদিকে, ব্যক্তিগত প্রাইভেসি রক্ষা কর্মীরা মনে করছেন এ সিদ্ধান্তটি বড় পিছুটান। ‘বিগ ব্রাদার ওয়াচ’-এর মায়া টমাস এ সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে বলেছেন, ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন শিশুদের অনলাইন তথ্য নিরাপদ রাখার অন্যতম প্রধান উপায়। মেটা সরকারি চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন’ তারা।
দীর্ঘদিনের লড়াই
২০১৯ সাল থেকে মেটা ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এ প্রযুক্তি আনার কারিগরি চ্যালেঞ্জ ঠেকানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সমালোচনার মুখে তাদের এ পরিকল্পনাকে সমর্থন করে আসছিল। তবে ইনস্টাগ্রামে ফিচারটি চালুর পরিকল্পনা বাতিলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি মেটা।
এর পরিবর্তে, মার্চে মেটা নীরবে অ্যাপের শর্তাবলীতে পরিবর্তন আনে, যেখানে বলা হয়, “২০২৬ সালের ৮ মে থেকে ইনস্টাগ্রামে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড মেসেজিং আর কাজ করবে না। আপনার কোনো চ্যাটিং এ পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত হলে আপনার প্রয়োজনীয় মিডিয়া বা মেসেজগুলো ডাউনলোডের উপায় সেখানে দেখতে পাবেন।”
মেটা সাংবাদিকদের বলেছে, খুব সামান্য সংখ্যক ব্যবহারকারী এ ফিচারটি বেছে নেওয়ায় তারা তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কোনো ঐচ্ছিক ফিচারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর আগ্রহ সাধারণত কম থাকে। কারণ তা চালু করতে বাড়তি ঝামেলার প্রয়োজন হয়।
‘গ্রিশাম কলেজ’-এর আইটি অধ্যাপক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া বেইনসসহ আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সিদ্ধান্তটি ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি রক্ষায় মেটার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া বেইনস বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের যোগাযোগ, অর্থাৎ আমাদের পোস্ট, লাইক ও মেসেজগুলোকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে যাতে তারা নির্দিষ্ট গ্রাহক বুঝে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে।
“বর্তমানে মেটার মতো কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে, যার জন্য মেসেজের তথ্য মূল্যবান হতে পারে। আমার মনে হয়, এ সিদ্ধান্তের পেছনে আরও জটিল কোনো কারণ রয়েছে।”
ইনস্টাগ্রাম আগে বলেছিল, তারা এআই প্রশিক্ষণের জন্য ডাইরেক্ট মেসেজ ব্যবহার করে না। কোম্পানিটি তাদের প্রাইভেসি রক্ষার অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এবং ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরিও এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে রাজি হননি।
গত মাসে মেটা তাদের কর্মীদের বলেছে, অফিসের ডিভাইসে তাদের ক্লিক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড এখন থেকে কোম্পানির এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য ডেটা হিসেবে সংগ্রহ করা হবে।
‘বিগ ব্রাদার ওয়াচ’-এর মতো প্রচারকর্মীরা বলছেন, মেটার এ সিদ্ধান্ত পুরো সামাজিক মাধ্যম শিল্পের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ কিছুদিন আগেও মনে করা হচ্ছিল, সব প্ল্যাটফর্ম এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের পথেই এগোচ্ছে।
● বর্তমানে সিগন্যাল, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার, অ্যাপলের আইমেসেজ ও গুগল মেসেজে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ডিফল্ট বা সাধারণ পদ্ধতি হিসেবে চালু আছে।
● টেলিগ্রাম ফিচারটি ব্যবহারের সুযোগ দিলেও তা ডিফল্ট হিসেবে থাকে না।
● এক্স ডিএমের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা রেখেছে, তবে সমালোচকদের মতে তা শিল্পের সঠিক মানদণ্ডের নয়।
● ছবি ও ভিডিওর জন্য এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্ন্যাপচ্যাট। ভবিষ্যতে টেক্সট মেসেজেও তা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা।
● ডিসকর্ড তাদের ভয়েস ও ভিডিও কলগুলোকে ডিফল্টভাবে এনক্রিপ্টেড করার পরিকল্পনা করছে।
মার্চে টিকটক বলেছে, ডাইরেক্ট মেসেজের জন্য এ প্রযুক্তি চালুর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। এর ঠিক চৌদ্দ দিন পর ইনস্টাগ্রাম তাদের ব্যবহারের শর্তাবলী আপডেট করে নিশ্চিত করেছে, তারা ফিচারটি চালুর প্রক্রিয়া আর বাড়াবে না।
অধ্যাপক বেইনসসহ অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এসব সিদ্ধান্ত এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রযুক্তির বিস্তারকে ধীর করে দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু মেসেজিং অ্যাপের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।