Published : 09 May 2026, 12:01 PM
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের আগে টিকটক পরিকল্পিতভাবে রিপাবলিকানপন্থী কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষকরা বলছেন, এ জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্মটি কেবল ব্যবহারকারীর পছন্দই তাদের দেখায়নি, বরং প্রতিপক্ষের নেতিবাচক বিভিন্ন দিকও নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
এ গবেষণা সামাজিক মাধ্যমের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ। এতে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের আগে তিনটি অঙ্গরাজ্যে টিকটকের অ্যালগরিদম পরিকল্পিতভাবে রিপাবলিকানপন্থী কনটেন্ট বা ভিডিওগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
এ গবেষণার জন্য গবেষকরা শত শত নকল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যাতে তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের মতো আচরণ করে। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ডেমোক্র্যাটিক বা রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক ভিডিওগুলো দেখা হত।
এরপর তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন, টিকটকের মূল ফিড অর্থাৎ ‘ফর ইউ’ পেইজে টিকটক কোন ধরনের ভিডিওগুলো দেখার পরামর্শ দিচ্ছে। তারা লিখেছেন, “আমরা ভিডিও দেখানোর ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করেছি।”
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪২ শতাংশ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী মনে করেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে যোগ হওয়ার জন্য এসব প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব অ্যাপের ‘রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম’ কীভাবে তাদের ফিডে আসা বিভিন্ন তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তা অনেক সময়ই স্পষ্ট নয়।
টিকটকের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে একটি গবেষণা শুরু করেন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির আবু ধাবি ক্যাম্পাসের অধ্যাপক তালাল রাহওয়ান ও ইয়াসির জাকি।
টিকটক বর্তমানে রাজনৈতিক তথ্যের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের সমর্থন ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনের মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ১০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, টিকটক কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, “নকল অ্যাকাউন্ট দিয়ে করা এ কৃত্রিম পরীক্ষাটি সাধারণ মানুষ আসলে কীভাবে টিকটক ব্যবহার করে তার প্রতিফলন নয়। বাস্তবে মানুষ আমাদের প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কনটেন্ট খুঁজে পায় ও দেখে। ব্যবহারকারীরা ডজনেরও বেশি ফিচারের মাধ্যমে তাদের ফিড নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যা সম্পর্কে গবেষকরা সম্ভবত অবগত নন।”
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বট রিপাবলিকানপন্থী ভিডিও দেখার জন্য তৈরি হয়েছিল তারা ডেমোক্র্যাটপন্থী বটগুলোর তুলনায় প্রায় ১১.৫ শতাংশ বেশি নিজেদের মতাদর্শের ভিডিও দেখতে পেয়েছে।
এ ভারসাম্যহীনতা বিরোধী মতাদর্শের ভিডিও দেখার ক্ষেত্রেও ছিল। ডেমোক্র্যাটপন্থী বটগুলোর ‘ফর ইউ’ পেইজে রিপাবলিকানপন্থী ভিডিও আসার সম্ভাবনা প্রায় ৭.৫ শতাংশ বেশি ছিল।
গবেষকরা এ পরীক্ষায় ৩২৩টি নকল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন এবং সেগুলোর অবস্থান নিউ ইয়র্ক, টেক্সাস ও জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার ২৭ সপ্তাহ জুড়ে তারা মানুষ ও এআইয়ের সমন্বয়ে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রেকমেন্ডেড ভিডিও বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণার অন্যতম লেখক অধ্যাপক রাহওয়ান বলেছেন, “আমাদের গবেষণার এসব ফলাফল কেবল নিজের মতাদর্শকে জোরালো করার বিষয় নয়, বরং রিপাবলিকান অ্যাকাউন্টগুলোর তুলনায় বিভিন্ন ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকাউন্টকে বেশি পরিমাণে অ্যান্টি-ডেমোক্র্যাটিক কনটেন্ট দেখানো হয়েছে।
“মানুষ যা পছন্দ করে, অ্যালগরিদম কেবল তা-ই দেখাচ্ছিল না, বরং এমনটি এক পক্ষকে অন্য পক্ষের নেতিবাচক সমালোচনা বা মন্তব্যগুলো বেশি করে দেখাচ্ছিল।”
ভিডিওগুলোতে কোন ধরনের বিষয় উঠে আসবে সে ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা গেছে গবেষণায়। গবেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোতে অভিবাসন ও অপরাধ বিষয়ক বিরোধী মতাদর্শের ভিডিও বেশি দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোতে গর্ভপাত বিষয়ক বিরোধী মতাদর্শের ভিডিও বেশি এসেছে।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির পিএইচডি গবেষক হাজেম ইব্রাহিম বলেছেন, “এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, অ্যালগরিদম এমন সব কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা প্রতিপক্ষকে তাদের দুর্বল জায়গায় আঘাত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এমনটি কেবল নির্দিষ্ট আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ার চেয়েও বেশি পরিকল্পিত ও উদ্বেগের বিষয়।”
গবেষণার বটগুলোকে ‘মক’ জিপিএস ও ভিপিএন-এর মাধ্যমে তিনটি ভিন্ন অবস্থানে রাখা হয়েছিল, যেখানে ছিল ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত নিউ ইয়র্ক, রিপাবলিকান অধ্যুষিত টেক্সাস ও নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্র জর্জিয়া।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, তাদের এসব ফলাফল কেবল এসব নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যের জন্যই প্রযোজ্য, এর বাইরে সব ক্ষেত্রে এমনটি নাও মিলতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, অনেক ব্যবহারকারী বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম নিজেরাই পছন্দমতো কনটেন্ট বেছে নেন ও সাজান। তবে টিকটকের ‘ফর ইউ’ পেইজে ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের তুলনায় কম।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পেইজটি ‘প্রায় পুরোপুরি প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়’। টিকটকের একজন মুখপাত্র এ দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, ব্যবহারকারীদের কাছে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের অনেক বিকল্প রয়েছে।
গবেষক ইব্রাহিম বলেছেন, “টিকটকে ব্যবহারকারীদের কাউকে ফলো করার প্রয়োজন হয় না, সিস্টেম নিজেই তাদের ভিডিও দেখার সময়ের মতো আচরণগত সংকেত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কী দেখবে।
“এ কারণেই অ্যালগরিদমের প্রভাব নিয়ে গবেষণার জন্য টিকটক চমৎকার জায়গা। কারণ এখানে ব্যবহারকারীর নিজস্ব পছন্দের সুযোগ অনেক কম থাকে। ফলে এখানকার বিভিন্ন বৈষম্যের জন্য ব্যবহারকারীর পছন্দকে দায়ী করা কঠিন।”
গবেষকরা বলেছেন, তাদের এ গবেষণায় ব্যবহারকারীরা কোন ধরনের রাজনৈতিক কনটেন্ট বা ভিডিওর মুখে পড়েন তা বেরিয়ে এলেও এসব ভিডিও মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আচরণের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে বা কেন এ বৈষম্য তৈরি হয় তা বিশ্লেষণ করা হয়নি। এসব বট কেবল প্ল্যাটফর্মে একজন ব্যবহারকারীর প্রাথমিক অভিজ্ঞতার চিত্রটি তুলে ধরেছে।