Published : 19 Sep 2025, 04:20 PM
না খেয়ে থাকার ১৭তম দিনে গুইডো রাইখস্ট্যাডটার বললেন, তিনি মোটামুটি ঠিকই আছেন, কেবল একটু ধীরে চলছেন। তবে ঠিক আছেন।
২ সেপ্টেম্বর থেকে স্যান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত এআই স্টার্টআপ ‘অ্যানথ্রপিক’-এর প্রধান কার্যালয়ের বাইরে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন রাইখস্ট্যাডটার। তার চকবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘হাঙ্গার স্ট্রাইক: ডে ১৫’। তবে তিনি আসলে ৩১ অগাস্ট থেকে খাওয়া বন্ধ করেছেন।
সেই বোর্ডে অ্যানথ্রপিকের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, “আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআইয়ের প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে”। এজিআই এমন এক এআই সিস্টেম, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমান বা তার চেয়েও বেশি।
বর্তমানে প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানদের মধ্যে জনপ্রিয় স্লোগান হয়ে উঠেছে এজিআই। বড় বড় কোম্পানি থেকে শুরু করে ছোট ছোট স্টার্টআপ পর্যন্ত সবাই এ বিতর্কিত মাইলফলকটিতে প্রথমে পৌঁছতে চাইছে। তবে রাইখস্ট্যাডটারের চোখে, বিষয়টি এক অস্তিত্বগত ঝুঁকির মতো, যা এসব কোম্পানি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না।
তিনি বলেছেন, “এজিআই বানানোর চেষ্টার মানে মানব-সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও শক্তিশালী সিস্টেম বা সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি করা। আর এসবই কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য। আমার মতে, এমনটি করা পাগলামি ও ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি ভয়াবহ রকমের ঝুঁকিপূর্ণ। এজিআই বানানোর চিন্তা এখনই বন্ধ করা উচিত।”
রাইখস্ট্যাডটারের মতে, এআইনির্ভর কোম্পানির প্রধানদের দৃষ্টি আকর্ষণের সবচেয়ে স্পষ্ট উপায় হল অনশন ধর্মঘট। আর এ মুহূর্তে তিনি একাই কেবল এমনটি ভাবছেন না।
২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছেন রাইখস্ট্যাডটার, যেখানে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও অ্যামোদেই এমন কিছু বলেছেন, যা রাইখস্ট্যাডটারের মতে এআই শিল্পের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার স্পষ্ট উদাহরণ।
ওই সাক্ষাৎকারে অ্যামোদেই বলেছেন, “এজিআইয়ের কারণে মানব সভ্যতার ভয়াবহ মাত্রায় কিছু ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা আমার হিসেবে ১০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে হতে পারে।”
অ্যামোদেই ও অন্যরা মনে করেন, এজিআইয়ের বিকাশ এখন অনিবার্য। ফলে তারা চেষ্টা করছেন যতটা সম্ভব দায়িত্বশীলভাবে এটিকে পরিচালনা করতে। তবে রাইখস্ট্যাডটারের মতে, এ কথা কেবল ‘মিথ’ এবং তাদের ‘নিজেদের স্বার্থে তৈরি করা গল্প মাত্র’।
রাইখস্ট্যাডটার বলেছেন, বড় পরিসরে মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন প্রযুক্তি তৈরি না করা এসব কোম্পানির দায়িত্ব। আর কেউ যদি এর ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন তবে তারও কিছুটা দায়িত্ব থেকে যায়।
“আমি আসলে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। আমি কেবল আমার সহনাগরিকদের জীবন ও মঙ্গলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার নিজেরও দুটি সন্তান রয়েছে।”
এ বিষয়ে ভার্জের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি অ্যানথ্রপিক।
রাইখস্ট্যাডটার আশা করছেন, তার এ কাজে এআই কোম্পানির কর্মীরা অনুপ্রাণিত হবেন ‘কোম্পানির যন্ত্রের মতো কাজ না করে মানুষ হিসেবে সাহস নিয়ে কাজ করতে’। কারণ তাদের ওপরও বড় দায়িত্ব রয়েছে, কেননা ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি তৈরি করছেন তারা’।
ভার্জ লিখেছে, রাইখস্ট্যাডটারের ভয় কেবল তার একার নয়, বরং এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অগণিত মানুষ এ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। এ এক বিভক্ত সম্প্রদায়, যেখানে এআই দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং সেগুলো ঠেকানোর সেরা উপায় কী– এসব বিষয় নিয়ে প্রচুর মতভেদ রয়েছে, এমনকি ‘এআই সেইফটি’ শব্দটিও বিতর্কিত। তবে একটি বিষয়ে বেশিরভাগই একমত যে, এআই যে পথে এগোচ্ছে তা মানবজাতির জন্য শুভ সংকেত নয়।
রাইখস্ট্যাডটার বলেছেন, প্রায় ২৫ বছর আগে কলেজে পড়ার সময় প্রথম ‘হিইম্যান লেভেল’ এআইয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হন। তখন বিষয়টি অনেক দূরের কোনো ভবিষ্যৎ বলে মনে হলেও ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেন তিনি।
রাইখস্ট্যাডটার বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, যুক্তরাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে এআই– এমনটাই তার বিশ্বাস।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাইখস্ট্যাডটারসহ ‘স্টপ এআই’ নামের দলের কয়েকজন সদস্য মিলে স্যান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ওপেনএআইয়ের অফিসের বিভিন্ন দরজা শিকল দিয়ে আটকে দেন। এ কাজের জন্য রাইখস্ট্যাডটারসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।
২ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিকের নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে অ্যামোদেইকে হাতে লেখা একটি চিঠিও পাঠান রাইখস্ট্যাডটার এবং কয়েকদিন পর তা অনলাইনে প্রকাশ করেন তিনি।
চিঠিতে তিনি অ্যামোডেইকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি এমন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা বন্ধ করেন, যেটিকে তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। চিঠিতে রাইখস্ট্যাডটার লিখেছেন, “আমার সন্তানদের জন্য, আমাদের পরিস্থিতির গুরুত্ব ও বিষয়টি কতটা জরুরী তা বিবেচনা করে আমি অ্যানথ্রপিকের অফিসের বাইরে অনশন শুরু করেছি… আপনার জবাবের প্রতীক্ষায়।”
রাইখস্ট্যাডটারের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে তার অনুপ্রেরণায় লন্ডনে অবস্থিত ‘গুগল ডিপমাইন্ড’-এর অফিসের বাইরে একই ধরনের প্রতিবাদ শুরু করেন দুইজন। এ ছাড়া তার সঙ্গে যোগ দিয়ে লাইভস্ট্রিমে অনশন শুরু করেছেন ভারতের একজন।
লন্ডনের অনশন ধর্মঘটে সাত দিন অংশ নিয়েছিলেন মাইকেল ট্রাজ্জি। তবে দুইবার প্রায় বেহুশ হয়ে পড়ার ঘটনা ও ডাক্তারের পরামর্শের কারণে অনশন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবুও আরেকজন অংশগ্রহণকারী ডেনিস শেরেমেটের পাশে রয়েছেন। শেরেমেট এখন ১০ দিন ধরে অনশন করছেন।
ট্রাজ্জি ও রাইখস্ট্যাডটার দুজনেরই এআইয়ের অগ্রগতির ফলে মানবজাতির ভবিষ্যত নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। তবে তারা নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না।
ট্রাজ্জি বলেছেন, ২০১৭ সাল থেকে তিনি এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে ভাবছেন। ডিপমাইন্ডের সিইও ডেমিস হ্যাসাবিসকে একটি চিঠিও লিখেছিলেন, যা পরে প্রকাশ্যে শেয়ার করেছেন তিনি।
রাইখস্ট্যাডটার ও ট্রাজ্জি উভয়ের কেউই এখনও পর্যন্ত হ্যাসাবিস ও অ্যামোদেইকে পাঠানো তাদের চিঠির কোনো উত্তর পাননি। এ বিষয়ে ভার্জের মন্তব্যের অনুরোধেও সাড়া দেয়নি গুগল।
তবুও রাইখস্ট্যাডটার ও ট্রাজ্জির বিশ্বাস, তাদের এ পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রযুক্তি সিইওদের কাছ থেকে কোনো না কোনোভাবে পথ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি মিলবে।
রাইখস্ট্যাডটারের মতে, “আমরা বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণহীন এক বিপদের প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছি। এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার সত্য কথা বলা, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা ও সাহায্য চাওয়া।”