Published : 14 Jul 2026, 05:51 PM
টুর্নামেন্টটি 'পাতানো' সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সত্ত্বেও ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ সেমি-ফাইনালে নিজের প্রিয় রেফারিকেই পেলেন লিওনেল মেসি। ডেইলি মেইলের বিশাল শিরোনাম এটি। ইংল্যান্ডের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা এরকম চটকদার শিরোনাম করবে, এতে বিস্ময়ের বেশি কিছু নেই বটে। মেসির ‘প্রিয় রেফারি’ বলাটাও হয়তো বাড়াবাড়ি। তবে ইসমাইল এলফাতকে মেসির সৌভাগ্যের রেফারি বললে ভুল খুব একটা মনে হয় হবে না!
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সেমি-ফাইনালে প্রধান রেফারির দায়িত্ব পেয়েছেন এই এলফাত। ৪৪ বছর বয়সী রেফারির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ম্যাচ এটি। মেজর লিগ সকারে তিনি যে ম্যাচগুলো পরিচালনা করেছেন, সবকটিই মেসির জন্য ছিল ফলপ্রসূ।
এলফাতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মরক্কোয়। ডিভি লটারি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান ১৮ বছর বয়সে। ২০০১ সালে নতুন দেশে পাড়ি জমানোর পর তিনি ২০০৬ সালে অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সেসময় ইউএসএল লিগ টু-এর দল অস্টিন লাইটনিংয়ের হয়ে ফুটবলও খেলতেন এলফাত। তিনি ছিলেন স্ট্রাইকার। তবে রেফারিংয়ের মান নিয়ে অভিযোগ করতেন তিন নিয়মিতই। একসময় খেলা ছেড়ে রেফারি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও শুরু করেন। পরে এক পর্যায়ে রেফারিংকেই পেশা হিসেবে নেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও পেয়ে যান।
মেজর লিগ সকারে চতুর্থ রেফারি হয়ে তার পথচলা শুরু ২০১১ সালে। পরের বছর থেকেই নিয়মিত রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। যা সুনামের সঙ্গে করছেন এখনও।
ফিফা তালিকাভুক্ত রেফারি হন তিনি ২০১৬ সালে। প্রথম বড় কোনো ফিফা টুর্নামেন্টে সুযোগ পান তিনি ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে। সেবার টুর্নামেন্টের ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্বও পান তিনি। ওই বছর কনক্যাকাফ গোল্ড কাফ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে সুযোগ পান তিনি। পরে ২০২০ অলিম্পিকস, ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সেও পা পড়ে তার।
বিশ্বকাপে প্রথম সুযোগ মেলে ২০২২ আসরে। সেবার তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেন এলফাত। গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল ও ঘানা, ব্রাজিল ও ক্যামেরুনের ম্যাচের পর শেষ ষোলোয় ক্রোয়েশিয়া-জাপান ম্যাচের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত তিনটি ম্যাচে বাঁশি বাজিয়েছেন। প্রথমটি ছিল গ্রুপ পর্বে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচ, পরেরটি স্পেন ও উরুগুয়ে ম্যাচে। এরপর শেষ ষোলোয় ব্রাজিল-নরওয়ের লড়াই সামলান তিনি।

এই তিন ম্যাচে একটি লাল কার্ড ও আটটি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন এলফাত। কিছু বিতর্কের জন্মও হয়েছে তার পরিচালনায় ম্যাচগুলিতে।
স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের পর স্প্যানিশ গণমাধ্যমের আক্রমণের শিকার হন এই রেফারি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, উরুগুয়ের ফুটবলারদের তিনি যথেষ্ট কঠোর ছিলেন না, যে কারণে ম্যাচটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও ম্যাচের একেবারে শেষদিকে পাউ কুবার্সিকে উঁচু ট্যাকল করার জন্য উরুগুয়ের মিডফিল্ডার আগুস্তিন কানোবিয়োকে লাল কার্ড দেখান।
তবে, স্প্যানিশ গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় অভিযোগটি আসে নিকোলা দে লা ক্রুসে করা একটি ট্যাকলকে কেন্দ্র করে, যা নিকো উইলিয়ামসকে আহত করে। ম্যাচ শেষে উইলিয়ামস এটিকে বলেন তার ‘জীবনের বাজে দিনগুলির একটি।’
ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচেও একটি উল্লেখযোগ মুহূর্ত ছিল। মাতেউস কুইয়া ফাউলের শিকার হলে তিনি প্রথমে ব্রাজিলের পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেন। তবে ভিএআর হস্তক্ষেপ করলে এলফাত তার সিদ্ধান্ত পাল্টে দেন। ব্রুনো গিমারাইস যদিও সেই পেনাল্টি কাজে লাগাতে পারেননি।
এসবের কোনোটিই অবশ্য খুব বড় কিছু নয় এবং রেফারির পথচলায় এরকম নানা কিছুই হয়ে থাকে। মেসির সঙ্গে তার সৌভাগ্যের সংস্পর্শ যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে।
আর্জেন্টাইন মহাতারকা ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরই লিগস কাপ জিতে নেয় ক্লাবটি। সেই ফাইনালে রেফারি ছিলেন এলফাত। ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে ম্যাচটিতে গোলের দেখা পান মেসি। পরে টাইব্রেকারেও বল পাঠন জালে। ২২ শটের টাইব্রেকারে ১০-৯ গোলে জিতে যায় মায়ামি।
এছাড়া মেজর লিগ সকারে এলফাত রেফারির দায়িত্বে থাকা আরও তিন ম্যাচে খেলে তিনটিই জিতেছেন মেসি, গোল করেছেন চারটি।
তাকে মেসির সৌভাগ্যের রেফারি বললে খুব বাড়াবাড়ি হয় না সম্ভবত।
আর্জেন্টিনার জন্যও আছে সৌভাগ্যের ইঙ্গিত। গত বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের ম্যাচে চতুর্থ রেফারি ছিলেন এই এলফাত!
ইংল্যান্ডের ম্যাচ তিনি পরিচালনা করেননি এখনও।
দুই দলের জন্য সতর্কতার বার্তাও আছে। এই মৌসুমে মেজর লিগ সকারে এলফাতের রেকর্ড ইঙ্গিত দেয় যে, নোটবুক বের করতে তার কোনো দ্বিধা নেই। বিশ্বকাপের জন্য মৌসুম স্থগিত হওয়ার আগে তিনি যে ১০টি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, তাতে ৪১টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন, তিনজন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তিনটি পেনাল্টি দিয়েছেন।
এই সেমি-ফাইনালে এলফাতের দুই সহকারী যুক্তরাষ্ট্রের কোরি পার্কার ও কাইল অ্যাটকিন্স। ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে এই দুজনই ছিলেন এলফাতের সহকারী। চতুর্থ রেফারির দায়িত্বে থাকছেন ইতালির মাউরিসিও মারিয়ানি।