Published : 14 Jul 2026, 06:53 PM
সবার অনুশীলন শেষ হলেও, হুলিয়ান আলভারেসের প্রায়ই শেষ হতো না। যখন সতীর্থরা ইংরেজি শেখার জন্য, টেনিস খেলার জন্য কিংবা বাড়ি ফিরে স্রেফ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছুটতেন, তখন তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরত- আরও ভালো করতে হবে। কোচের কাছ থেকে কয়েকটি বল চেয়ে নিয়ে নিজের মতো কাজ করে যেতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন মাঠে। বাঁ পায়ে ক্রস করা এবং ওই পায়েই গোল করা, একই জিনিস করতেন আবার ডান পায়ে। ফ্রি-কিক, পেনাল্টি, সব অ্যাঙ্গেল থেকে হেড, মাথার সব পাশ ব্যবহার করে হেড, ড্রিবলিং, প্রথম স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কিংবা গোল করা; কী না করতেন নিজে নিজে!
কোনো হইচই বা লোকদেখানো কিছু নয়, নিভৃতে খাটতেন তিনি মনের আনন্দে। আর এই সবকিছুই ছিল তার দশম জন্মদিনের আগের কথা!
আর্জেন্টিনার কর্দোবার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বাসিন্দার ছোট্ট শহর কালচিনে শৈশব কেটেছে আলভারেসের। অল্প বয়স থেকেই একজন পেশাদার ফুটবলারের মতো আচরণ করতেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক ছিল না, ফুটবলই যে একদিন তার ক্যারিয়ার হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। তবুও তিনি এমনভাবে অনুশীলন করতেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন এবং ভাবতেন যেন তিনি ইতিমধ্যেই সেই পেশাদার জগতের অংশ। হুলিয়ান আলভারেস ঠিক এমনই ছিলেন।

নিজ শহরের মাঠে বেড়ে ওঠা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের এই ফরোয়ার্ড এসেছেন পরিশ্রমী এক পরিবার থেকে, যেখানে জীবন ছিল সাদামাটা। কিন্তু আলভারেসের ধ্যানজ্ঞান ছিল ফুটবল। এই খেলাটি তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। লাজুক ও শান্ত স্বভাবের ছেলেটি ভবিষ্যতে কী হতে চায়, যখনই স্কুলের শিক্ষকরা জানতে চাইত, তার একটিই উত্তর ছিল- ‘ফুটবলার।’
বয়স যখন দুই, তখন থেকেই বড় দুই ভাই অগাস্তিন ও রাফায়েলের সঙ্গী ফুতুরাস এস্ত্রেলিতাস ফুটবল স্কুলে যেতেন আলভারেস। সেখানে অন্য বাচ্চারা যখন বিরক্ত হয়ে পড়ত, বাড়ি ফেরার নানা বাহানা খুঁজত কিংবা কিছু খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ত; আলভারেস তখন তার চেয়ে বড় বল নিয়ে খেলায় মত্ত থাকতেন। বড় ভাইদের অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন, তাদের মতো হতে চাইতেন।
আলভারেসের মা মারিয়ানা ছিলেন নার্সারি স্কুলের শিক্ষিকা। আর বাবা গুস্তাভো প্রথমে গ্রামাঞ্চলে কাজ করতেন, পরে পরিবহন খাতে যুক্ত হন। বাবা-মা দুইজনই ব্যস্ত থাকায়, ফুটবল শেখার স্কুলে আলভারেস ও তার ভাইদের প্রায়ই নিয়ে যেতেন দাদি তিতা।
৪ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত আলভারেজকে কোচিং করিয়েছেন রাফায়েল ভারাস; প্রথমে ফুটবল স্কুলে এবং পরে ক্লাব আতলেতিকো কালচিনে। ফুটবলের প্রতি ছোট আলভারেসের আগ্রহ, তাড়না, নিবেদন মন ছুঁয়ে গিয়েছিল কোচের। ফিফাকে এনিয়ে ভারাস বলেন, “আমার মনে আছে, একদিন তার দাদির দিকে তাকিয়ে বলছিলাম, ‘এই ছেলে একদিন আমাদের সবাইকে বাঁচাবে।’ কথাটি আমি মজা করেই বলেছিলাম, কিন্তু সেটা বলেছিলাম এমন একটি শিশুর প্রতিভা দেখে, যার সফল হওয়ার সব রকমের সম্ভাবনা ছিল।”
আজ ক্লাব আতলেতিকো কালচিনও আলভারেসের উত্থানের সুফল পেয়েছে। এই ফরোয়ার্ডের রিভার প্লেট, ম্যানচেস্টার সিটি ও আতলেতিকো মাদ্রিদে দলবদলের ফলে ক্লাবটি ‘ট্রেনিং কম্পেনসেশন’ (খেলোয়াড় গড়ার খরচ বাবদ অর্থ) হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়েছে। সেই অর্থে ক্লাবটি পেশাদার মানের ঘাসের মাঠ, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা এবং আরও অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করতে পেরেছে; যা একসময় তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
এখন ২৬ বছর বয়সী আলভারেস আর্জেন্টিনা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন। তবে তিনি এমন কোনো খেলোয়াড় ছিলেন না, যাকে গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল কিংবা যিনি নির্দিষ্ট কোনো বয়সে এসে হঠাৎ জ্বলে উঠেছেন। নিজের প্রথম ম্যাচগুলো থেকেই ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা, প্রতিটা বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায়ই তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে থাকতেন।
আলভারসের বয়স তখন ১১ কিংবা ১২, দেফেনসোরেস দে হেমস ক্রাইকের বিপক্ষে একটি ম্যাচের কথা এখনও মনে পড়ে অনেকেরই। তখন ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা দলের হয়ে চারটি গোলই করেছিলেন আলভারেস। কিন্তু এরপরও তার দেখানোর বাকি ছিল আরও কিছু। প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, গোলরক্ষককে পাশ কাটিয়ে তিনি ‘রাবোনা’ (এক পায়ের পেছন দিয়ে অন্য পা ঘুরিয়ে শট নেওয়া) শটে গোল করেন।
আলভারেসের চোখধাঁধানো সেই গোলের স্মৃতিচারণ করে ভারাস বলেন, “দুই দলেরই পরিবার ও বন্ধুরা গোলটির জন্য দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ম্যাচ শেষে সব খেলোয়াড় তার সঙ্গে করমর্দন করেছিল।”
আলভারেস অনেক কম বয়সেই অবিশ্বাস্য পরিপক্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলাটি পড়তে পারতেন। সবসময় অন্যের পরামর্শ শুনতেন এবং নিজেকে উন্নত করতে মুখিয়ে থাকতেন। ক্যারিয়ারে এতদূর আসার পথে এই গুণগুলো নিশ্চিতভাবেই রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
উদীয়মান প্রতিভা আলভারেসের ওপর নজর ছিল রিভার প্লেট, বোকা জুনিয়র্স এবং সান্তা ফে-র বিখ্যাত ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ ক্লাব রেনাতো সেসারিনির। তবুও বেশ কয়েক বছর তার পরিবার সেই বড় ক্লাবগুলোর হাতছানিতে সাড়া দেয়নি। কালচিনে আলভারেসের শৈশবের জীবনটা ছিল বাইসাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানো, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এবং শহরের শান্ত ও নির্মল পরিবেশের মাঝে সময় কাটানো। সেই সুখস্মৃতিগুলো এখনও হৃদয়ে লালন করার কথা ফিফাকে বলেছেন তিনি।
“যখন কালচিনের নাম শুনি, সঙ্গে সঙ্গেই আমার বন্ধু ও পরিবারের কথা মনে পড়ে। এই জায়গা মানেই আমার শৈশব। ওই শহরটি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। অনেকগুলো সুন্দর বছর, দারুণ সব স্মৃতি যা আমি সবসময় লালন করি।”
ছোট্ট শহর কালচিনে একটু বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন আলভারেস, ফুটবলার হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলেছেন তিনি; এমন কথা তখন অনেকেই বলতেন। কিন্তু কোচ ভারাসের অনুপ্রেরণা আর নিজের চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন এই ফুটবলার।
ওই সময় নিয়ে ভারাস বলেন, “অনেকেই ভেবেছিল, সে তার সুযোগ হাতছাড়া করেছে, তার বয়স বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু আমি সবসময় তার বাবাকে বলতাম, হুলিয়ান যদি চায় সে ১৮ বছরে ক্লাব ছাড়তে পারে এবং এখনও ফুটবলার হতে পারে। এক পর্যায়ে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিল। সে জানাল, পেশাদার ফুটবলার হতে রিভার প্লেটে যাচ্ছে।”
আতলেতিকো কালচিন ছাড়ার তিন বছর পর, ২০১৮ সালের অক্টোবরে মার্সেলো গায়ার্দোর কোচিংয়ে রিভার প্লেটের মূল দলে অভিষেক হয় আলভারেসের। মূল দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার জন্য ছয় মাসের কিছু বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় তাকে। এরপর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি।
কালচিন শহরটি মূলত গড়ে উঠেছিল স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর হাত ধরে, যা একসময় সয়াবিন ও ভুট্টার ওপর নির্ভরশীল ছিল। আজকাল এই অঞ্চলের চারপাশের ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলফালফা (এক ধরণের উদ্ভিদ) চাষ হয়। হুলিয়ান আলভারেসের জন্মস্থান দেখতে অনেক পর্যটকই এখানে আসেন।
কালচিনের খুদে ফুটবলাররা আলভারেসের মতোই হতে চায়। এই শহরের সবচেয়ে বড় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জয়ের পর তার মর্যাদা আরও আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে আলভারেসের মতোই, এই শহরটিও কিন্তু প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
স্প্যানিশ ভাষায় লা-আরানা, ইংরেজিতে ‘স্পাইডার-ম্যান’ নামেও ফুটবল বিশ্বে পরিচিত আলভারেস। শৈশবের লুকোচুরি আর দৌড়ঝাঁপ খেলার সময় নামটি পেয়েছিলেন তিনি। অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতার কারণে ছোট্ট আলভারেসের ব্যাপারে মনে হতো তিনি মাঠের প্রতিটি জায়গায় একসঙ্গে উপস্থিত। প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করে দিতেন, আবার সহজেই তাদের ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যেতেন। যেন তার সবার চেয়ে বেশি হাত-পা আছে। ঠিক মাকড়সার মতো। পরে এই ডাকনামটি স্বাভাবিকভাবেই সুপারহিরো ‘স্পাইডার-ম্যান’ পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়।
তাকে নিয়ে ফুটবল আঙিনায় অনেক আলোচনা চললেও, তিনি যেন সবকিছু থেকে একটু আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। এতটাই প্রচারবিমুখ ও সাদাসিধে জীবনযাপন করেন যে, কালচিনে তার সফরগুলোর খবর কেউ টেরই পায় না। সেখানকার মেয়র ক্লাউদিও কাওন যেমন বলেন, “ও যখনই ফেরে, সবকিছু খুব ব্যক্তিগত রাখে, বন্ধু আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। স্বাভাবিকভাবেই, প্রতিবার যদি এই খবর ছড়িয়ে পড়ে, তবে পুরো শহর ওর বাড়ির সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যাবে। আর হুলিয়ানকে যতটুকু চিনি, ও সবার জন্যই দরজা খুলে দেবে।”

মাঝে মাঝে মেয়র ভাবেন আগামী ২০ বা ৩০ বছর পর, কিংবা আলভারেসের খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলে পরিস্থিতি কেমন হবে। সে কি ফিরে আসবে? শৈশবের চেনা জীবন কি তাকে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনবে?
“আমি বিশ্বাস করি, মানুষ যখন অনেক বড় হয়ে একদম শিখরে পৌঁছায়, তখন শেষ পর্যন্ত সে তার শেকড়েই ফিরে আসে। এখানেই সে বড় হয়েছে, এখান থেকেই জীবনের পাঠ নিয়েছে। তার সংস্কৃতি তো এখানেই।”
চার বছর আগে কাতারে, আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের খরা কাটানো বিশ্বকাপ জয়ের পথে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন আলভারেস। আসরে চারটি গোল করেছিলেন তিনি, যার মধ্যে দুটি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে। সঙ্গে আসরে একটি অ্যাসিস্টও ছিল তার।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি আলভারেস। প্রথম পাঁচ ম্যাচে জালের দেখা পাননি তিনি। কোয়ার্টার-ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে চোখধাঁধানো গোলে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন তিনি। ম্যাচটি ৩-১ ব্যবধানে জিতে সেমি-ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা।
শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ছুটতে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে শেষ চারে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। আগামী ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় ১টায় (এএম) মুখোমুখি হবে দুই দল। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দলকে কতটা সাহায্য করতে পারেন আলভারেস, সেটা সময়ই বলবে।