Published : 11 Jul 2026, 08:33 AM
সাও পাওলো থেকে ক্যানসাস সিটি। মাঝে পেরিয়ে গেছে এক যুগ। আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড দলের খোলনলচেও পাল্টে গেছে অনেকটাই। মাঝের সময়ে, বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ ফিরে পেয়েছে আর্জেন্টিনা। ৭২ বছর পর, কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছে সুইজারল্যান্ড। দুই দল এবার, সেরা আটের ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়।
তাই ঘুরে-ফিরে আসছে, ১২ বছর আগের অতীত। শেষ ষোলোর সেই স্মৃতি অবশ্য সুইজারল্যান্ডের জন্য ছিল বিষাদের। দারুণ লড়াই করে, তারা ম্যাচ টেনে নিয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। আনহেল দি মারিয়ার একমাত্র গোলে স্বপ্ন গুঁড়িয়েছিল সুইসদের। এবার তারা উজ্জীবিত, ১৯৫৪ সালের পর, কোয়ার্টার-ফাইনালের মঞ্চে ফেরার আত্মবিশ্বাসে।
ওই ম্যাচের পর দুই দল গিয়েছে অনেক বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনার জন্য অবশ্য প্রাপ্তির গল্পই বেশি। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে, জার্মানির কাছে সেই হৃদয়ভাঙা হারের কষ্ট তারা ভুলেছে ২০২২ সালে, কাতারের আসরে। শিরোপার স্বাদ তারা ফিরে পেয়েছে, ৩৬ বছরের দীর্ঘ খরা কাটানোর পর।
দলীয়ভাবে বদল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সাও পাওলোর সেই ম্যাচে খেলা দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এসেছেন মাত্র তিন জন। আর্জেন্টিনার কেবল মেসি, সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত জাকা ও রিকার্দো রদ্রিগেস।
মেসি অবশ্য আজও আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা। ৩৯ বছর বয়সের কারণে, শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকে অবশ্য চূড়ায় নেই তিনি, কিন্তু এই বিশ্বকাপেও যেন সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে, এই মহাতারকাকে ঘিরে। শেষ ষোলোর ম্যাচেও তিনি অধিনায়কের মতো টেনেছেন আর্জেন্টিনাকে। দুই গোলের ব্যবধান ঘুচিয়ে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে, সেরা আটে উঠেছে মুকুট ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে আসা আলবিসেলেস্তারা।
শেষ বত্রিশের ম্যাচে কেইপ ভার্ডও ভুগিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। এরপর শেষ ষোলোয় মিশর। সেদিন ১১ মিনিটের ঝড়ে, শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দেওয়ার পর, মেসি দলকে সতর্ক করে দেন। পাশাপাশি তুলে ধরেন, সতীর্থদের হার না মানসিকতার দিকটিও।
“আবারও আমরা ভীষণ ভুগলাম, কিন্তু এটাই বিশ্বকাপ। সব ম্যাচই এমনই হবে। তবে, এই দল কখনও হাল ছাড়ে না এবং শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যায়।”
গত তিন আসরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া সুইজারল্যান্ড এবার ইতিহাস লিখছে। ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবারের মতো সেরা আটে এসেছে মুরাত ইয়াকিনের দল। বিশ্বকাপের আঙিনায় অতীতের সব অর্জন ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ তাদের সামনে। কলম্বিয়াকে শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে হারানোর পর, তাদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। সুইস অধিনায়ক জাকার কণ্ঠেও তার প্রতিধ্বনি। মেসিকেও প্রশংসায় ভাসালেন তিনি।
“মেসির সাথে এই যুগে থাকতে পারা অনেক বড় ব্যাপার। ২০১৪ সালে, ব্রাজিলে আমরা তার বিপক্ষে খেলেছিলাম এবং হেরেছিলাম। আমরা তার মান, সামর্থ্য জানি, তার দলের সামর্থ্যও জানি।”
সুইস ডিফেন্ডার রড্রিগেসও প্রশংসায় ভাসালেন প্রতিপক্ষকে।
“আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত একটা দল। খুবই শক্তিশালী সব খেলোয়াড় এবং ভালো একজন কোচ আছে তাদের। তারা কীভাবে খেলে, সেটা আমরা জানি এবং তাদের আছে সেরা খেলোয়াড় (মেসি)।”
শক্তি-সামর্থ্যে পিছিয়ে থাকলেও, সুইজারল্যান্ড আগের মতো রক্ষণাত্মক দল নয়। জোয়ান মানজাম্বি হাঁটুর চোট কাটিয়ে ফিরলে তাদের মাঝমাঠ নিশ্চিতভাবে শক্ত পায়ে দাঁড়াবে। এই মিডফিল্ডারের অনুপস্থিতিতে কলম্বিয়া ম্যাচে যে সৃষ্টিশীলতার কমতি দেখা গিয়েছিল, সেটা হয়তো থাকবে না ক্যানসাস সিটিতে।
সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন আতশি কাঁচের নিচে ফেলে বিশ্লেষণ করছেন, কেইপ ভার্ড ও মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দুটি। স্কালোনির দলের কোন দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত করবেন, তাও খুঁজেও পেয়েছেন বলে দাবি তার। দিলেন, জমজমাট ম্যাচের প্রতিশ্রুতি।
“বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলব, এটা আমাদের জন্য চমৎকার সুযোগ। একই সাথে, আমরা বুঝতে পেরেছি, আর্জেন্টিনা অজেয় নয়। কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে আকর্ষণীয় একটি ম্যাচ হবে।”
খুব সম্ভবত, মিশর ম্যাচের দল নিয়ে সুইজল্যান্ডের বিপক্ষে নামবেন স্কালোনি। তিনি নিজেও সুইজারল্যান্ডকে ‘অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ ঐতিহ্যের অধিকারী’ এবং ‘দুর্দান্ত খেলোয়াড়’ নিয়ে গড়া দল মানছেন। আর্জেন্টিনাকে যারা আরেকটি অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাবে, এই সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এবার আর্জেন্টিনার নায়ক কে হবেন?
এক যুগ আগে, দি মারিয়া নিষ্পত্তি করে দিয়েছিলেন। সেই হতাশা আজও সুইসদের সঙ্গী, কিন্তু ছয় যুগ পর কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার উচ্ছ্বাসও এবার আছে তাদের। আছে প্রথমবারের মতো সেমি-ফাইনালে ওঠার হাতছানি। সেই পথে আবারও সুইজারল্যান্ডর প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা ও মেসি।