শ্রেষ্ঠত্বের আসনে না বসেও যারা সেরা: নেদারল্যান্ডস

বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ফাইনালে কীভাবে খেলা উচিত এ নিয়ে মাঠে দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল ডাচরা।

আব্দুল মোমিনআব্দুল মোমিনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Nov 2022, 05:02 AM
Updated : 17 Nov 2022, 05:02 AM

সিংহাসনে বসতে হলে জিততে হবে বিশ্বকাপ। পরতে হবে মুকুট। সমর্থকদের মন জয় করতেও উঁচিয়ে ধরতে হবে ট্রফি। অন্যথায়? লেখা হবে ব্যর্থতার গল্প, জীবনভর বয়ে বেড়াতে হবে না পাওয়ার হাহাকার। ফুটবলে এসবই চিরাচরিত নিয়ম। তবে আছে কিছু ভিন্নতাও। সমর্থক থেকে শুরু করে বোদ্ধাদের মুখে মুখে শোনা যায় তেমনই কয়েকটি ‘বিশ্বজয়ী’ দলের গল্প। যাদের মাথায় নেই কোনো মুকুট। তবে সুন্দর, দাপুটে আর নজরকাড়া ফুটবলে তারা জয় করে নিয়েছিল সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মন।

বিশ্বসেরার মঞ্চে সেই দলগুলো আবির্ভুত হয়েছিল সম্ভাব্য সেরা হিসেবে, ফেভারিটের তকমা গায়ে মেখে। রক্ষণ, মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগ-কোনোখানেই কোনো ঘাটতি ছিল না তাদের। তাদের একমাত্র ক্ষুধা ছিল সাফল্য, জয়টাকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল তারা। প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ঙ্কর, আর সমর্থকদের চোখে শিল্পী। কিন্তু শেষটা তাদের হয়েছিল অবিশ্বাস্য; বিশ্ব সেরা হওয়ার হাতছানিতে এসে ফিরতে হয়েছিল একরাশ হতাশা নিয়ে।

জয়ীদের নামই মনে রাখে সবাই। দ্বিতীয় কে হয়েছিল মনে রাখে না কেউ। উজ্জ্বল তিন ব্যতিক্রম আছে ফুটবলে- ১৯৫৪ বিশ্বকাপের হাঙ্গেরি, ১৯৭৪ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডস এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দল।

কাতার আসরকে সামনে রেখে ফিরে দেখার দ্বিতীয় পর্বে থাকছে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করা, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের একটির শিকার নেদারল্যান্ডসের কথা

টোটাল ফুটবলের নেদারল্যান্ডস

“কেবল বিজয়ীরাই ইতিহাস রচনা করে” কিংবা “লড়াইয়ে দ্বিতীয় হওয়া কাউকে কেউ মনে রাখে না”-প্রচলিত প্রবাদ দুটি সবসময় সত্য হয় না। হয় না বলেই ১৯৭৪ বিশ্বকাপের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস দল ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতির মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়। দোলা দেয় অনুক্ষণ।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ও তারকাসমৃদ্ধ দলগুলোর একটি গত শতাব্দীর ৭০ এর দশকের নেদারল্যান্ডস। ‘টোটাল ফুটবল’-এর বিপ্লব, একগাদা স্টাইলিশ আর শৈল্পিক ফুটবলারে গড়া দল। সব মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা আর ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করা দলটি আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে।

নেদারল্যান্ডসের দুই ক্লাব ফেইনুর্ড ও আয়াক্সের সম্মিলিত শক্তি মিলেই মূলত গড়ে উঠেছিল বিশ্ব ফুটবলে দাপট দেখানো সেই ডাচ দলটি। ক্লাব দুটির দর্শন যদিও ছিল ভিন্ন; তবে তাদের খেলোয়াড়রা যখন জাতীয় দলের জার্সি পরতো, তখন তারা যেন হয়ে উঠতো ‘স্বর্গে গড়া দল।’

ক্লাব দুটির খেলোয়াড়রাই যে কেবল বিশ্ব কাঁপানো ডাচ দলের নিউক্লিয়াস ছিল, ঠিক তাও নয়। তখনকার অনন্য ‘টোটাল ফুটবল’ কৌশলের সঙ্গে বিশ্বের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আয়াক্স। ভীষণভাবে আলোচিত এবং চর্চিত এই ফুটবল দর্শন বা ধরনের জন্ম কিংবদন্তি কোচ রিনুস মিকেলস এর মস্তিষ্কে, আয়াক্সেই তা বাস্তব হয়ে ওঠে। পরে ক্লাব বার্সেলোনাতেও এই টোটাল ফুটবলের সৌরভ বয়ে নেন তিনি।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নেদারল্যান্ডসের কোচ ছিলেন ফ্রাঞ্জিশেক ফাডরোঙ্ক। তবে বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হওয়ার পর তার জায়গায় মিকেলসকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওই সময়ের সবচেয়ে সফল ক্লাব আয়াক্স, যারা ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত টানা চারবার ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে উঠেছিল এবং চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল টানা তিনবার। দলটির অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে ক্রুইফের পাশাপাশি বড় অবদান ছিল ইয়োহান নিশকেন্স, রুড ক্রল ও ইয়োনি রেপের। নেদারল্যান্ডস দলেও কোচ মিকেলসের মূল হাতিয়ার ছিলেন তারাই।

৭৪ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডস, কোচ মিকেলস, ক্রুইফ এবং টোটাল ফুটবল-সব এক সূত্রে গাঁথা। নিজের দর্শনের প্রতি কোচ এতটাই মগ্ন ছিলেন যে তার বাস্তবায়নে কঠিন এবং রূঢ় সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছিল তাকে। ওই সময়ে প্রতিষ্ঠিত গোলরক্ষক ইয়ান ফন বেভেরেনকে বাদ দিয়ে বেছে নেন ইয়ান ইয়ংব্লুচকে। কারণ, বল পায়ে বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। এছাড়া মিডফিল্ডার আরি হানকে খেলান সেন্টার ব্যাক হিসেবে।

স্বপ্নাতুর চোখে বিশ্বজয়ের মিশনে চূড়ান্ত ফেভারিটের তকমা গায়ে সেঁটে পশ্চিম জার্মানিতে পা রাখে ডাচরা। শুরুটাও হয় আলো ঝলমলে, উরুগুয়েকে ২-০ গোলে হারিয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে হোঁচট খেলেও (গোলশূন্য ড্র) শেষ ম্যাচে বুলগেরিয়াকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম ধাপ পার করে নেদারল্যান্ডস।

দ্বিতীয় রাউন্ডের গ্রুপ পর্বে তাদের পারফরম্যান্স ছিল আরও দাপুটে। দুই গ্রুপের ওই রাউন্ডে নেদারল্যান্ডস ছিল ‘এ’ গ্রুপে; প্রতিপক্ষ শিরোপাধারী ও তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি ও শক্তিশালী আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তাদের ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর পশ্চিম জার্মানি ও ব্রাজিলকে হারায় ২-০ ব্যবধান। প্রথম দুই রাউন্ডে আট প্রতিপক্ষের জালে ১৪ বার বল পাঠানো নেদারল্যান্ডস হজম করে মাত্র একটি গোল!

৭ জুলাই ১৯৭৪, মিউনিখের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে গড়ায় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। দেশকে প্রথমবারের মতো বিশ্বসেরা সাফল্য এনে দেওয়ার পথে একটি মাত্র জয় দূরে ছিল নেদারল্যান্ডস। প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি; ২০ বছর আগে যারা ‘দা মাইটি ম্যাগিয়ার্স’ হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙে উঁচিয়ে ধরেছিল বিশ্বসেরার ট্রফি। হ্যাঁ, ৫৪’র বিশ্বকাপে তাদের জয় বিস্ময়কর হলেও ৭৪-এ তারাও ছিল সমান ফেভারিট। কেবল স্বাগতিক শক্তি বলেই নয়, জার্মান দলেও ছিল তারকার সমাহার; ছিলেন কিংবদন্তি জার্ড মুলার।

দুই জায়ান্টের লড়াই শুরু হতেই আঘাত হানে নেদারল্যান্ডস। জার্মানরা বলে ছোঁয়ানোর আগেই পেনাল্টি আদায় করে নেন ক্রুইফ, দ্বিতীয় মিনিটে সফল স্পট কিকে স্কোরলাইন ১-০ করেন নিশকেন্স।

তবে ওই গোলটাই যেন হয়ে ওঠে সব নষ্টের মূল! মিডফিল্ডার ফন হানেশেন পরবর্তীতে খোলাসা করেছিলেন তাদের পথচ্যুত হওয়ার কারণ। বলেছিলেন, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছিল।

“(ওই গোলের পর) আমরা তখন ভাবছিলাম: তারা জার্মান-তারা তো আমাদের বন্ধু নয়। তাই, চলো তাদের সমর্থকদের সামনেই তাদের নিয়ে মজা করি।”

“মূল সমস্যাটা ছিল, আমাদের দলের এক অংশ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল টুর্নামেন্ট জুড়ে আমরা যেমন খেলেছি তেমনই খেলতে, আর অন্যভাগ প্রতিপক্ষকে নিয়ে মজা করতে চাইছিল। একারণেই আমাদের ম্যাচ পরিকল্পনা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।”

২৫ মিনিটের মাথায় পল ব্রাইটনারের স্পট কিকে সমতা টানার পর বিরতির খানিক আগে মুলারের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানরা। সেই বিভক্তি জোড়া লাগেনি; ব্যবধানও আর ঘোচাতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট পরে জার্মানি। ‘টোটাল ফুটবল’-এর শিল্পীরা জায়গা করে নেয় ইতিহাসের এমন এক পাতায়, যেখানে নিজেদের নাম লিখতে চাইবে না কেউ; বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয় এবং সুন্দর ফুটবল উপহার দেওয়া দল হয়েও বিশ্বকাপ জিততে না পারাদের তালিকায়।

১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত পরের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস দলে ক্রুইফ ছিলেন না ঠিকই, তারপরও শক্তিশালী দল ছিল তারা। প্রতাশিতভাবে উঠেছিল ফাইনালেও; কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। ফাইনালে তাদেরকে বিমুখ করে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

পরে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আসরেও ব্যর্থতা ডাচদের সঙ্গী ছিল ছায়ার মতো। জোহানেসবার্গের ফাইনালে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। স্পেন পায় প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ। তৃতীয়বারের মতো ‘কমলা জার্সিধারীরা’ হয়েছিল বেদনায় নীল। এবার কি হবে, কে জানে?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক