উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
Published : 05 Jun 2026, 10:56 PM
ট্রফি নিয়ে ফটোসেশন শেষে সুইমিংপুলের এক কোণে গল্পে মশগুল হলেন দুই কোচ পিটার জেমস বাটলার ও ক্রিসপিন ছেত্রি। ক্যামেরাম্যানদের প্রয়োজন মিটিয়ে দুই অধিনায়ক মারিয়া মান্দা ও সঙ্গীতা বাসফোরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভক্তদের সেলফির দাবি মেটালেন। দুজন গল্প করলেন হাসিমুখে। মারিয়া ও সঙ্গীতার ভাষা এক-বাংলা। মারিয়া বাংলাদেশি, সঙ্গীতা পশ্চিম বঙ্গের মেয়ে। গল্পও তাই চলল বেশ খানিকটা সময়। ফাইনালের আগে এমনই সম্প্রীতির আবহ চারপাশে। তবে, শিরোপা লড়াই ঘিরে ঠিকই ভেতরে-ভেতরে ছড়াচ্ছে উত্তাপ।
গোয়ায় এদিনের তাপমাত্রাও গরম না, ক্ষণে-ক্ষণে হওয়া বৃষ্টিতে বেশ নরম-ই। জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় যখন মুখোমুখি হবে দুই দল, তখন কী আর আবহ থাকবে এমনটা?
একে অন্যকে বধের নেশায় বুঁদ হয়েই যে দলবল নিয়ে মাঠে নামবেন মারিয়া ও সঙ্গীতা। সেখানে সম্প্রীতির সুরের মূর্ছনা নয়, সঙ্গীতাদের থাকবে উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের হারানো মুকুট ফিরে পাওয়ার তীব্র তাড়না। মারিয়াদের চাওয়া ২০২২ ও ২০২৪-এর সাফল্যের রেখাটা টেনে নিয়ে, হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চূড়ায় ওঠার।

দুই দলই উঠেছে একই হোটেলে। লবিতে, খাবারের টেবিলে, আরব সাগরের পাড়ে বিকেল-সন্ধ্যার পায়চারিতে দেখা হয় হরহামেশাই। আড্ডা জমে। বন্ধুত্বও তৈরি হয়। কিন্তু সব সম্পর্ক এক পাশে রেখে মারিয়া-আফঈদাদের মতো সঙ্গীতা-গ্রেসিরা যে মাঠে নামবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যে দল নিয়ে একসময় পর্তুগিজ শাসিত গোয়ায় পা রেখেছে বাংলাদেশ, তার শক্তি কিছুটা কমেছে মনিকা চাকমার ডান পায়ের গোঁড়ালির চোটে। চোট মারাত্মক না হলেও, ছন্দহীনতা ভোগাচ্ছে তাকে। বাংলাদেশ কোচ বাটলারও আকারে ইঙ্গিতে পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ভারতের বিপক্ষে মনিকার খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
অন্যদিকে, ভারতের শক্তি বেড়েছে মনিষা কল্যাণ যোগ দেওয়ায়। পেরুর ক্লাবে খেলা এই ফরোয়ার্ড ফিফা উইন্ডোর আগে ছাড়া না পাওয়ায় গ্রুপ পর্ব ও সেমি-ফাইনালে খেলতে পারেননি। তার অনুপস্থিতিতেই আভীকা সিং-দাঙ্গমেই গ্রেসিরা মালদ্বীপকে উড়িয়ে দেন ১১-০ গোলে, বাংলাদেশকে হারান ৩-০ ব্যবধানে। সেমি-ফাইনালে ভুটানকে হারাতে অবশ্য ঘাম ঝরাতে হয়; তবে, ১-০ গোলের জয়ে নিশ্চিত হয় দুই আসর পর ভারতের ফাইনাল খেলা।
দেশের হয়ে ১৫ গোল করা মনিষা স্বাভাবিকভাবে মুখিয়ে আছেন, গত তিন ম্যাচে তার অনুপস্থিতির ‘ক্ষতিটুকু’ ফাইনালে পুষিয়ে দিতে। ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে পেয়ে অধিনায়ক সঙ্গীতাও যেন সংবাদ সম্মেলনে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে, দ্রুত গোল চাই তার।

বাংলাদেশের আক্রমণভাগের জন্য এবার যেন গোল করাটা ভীষণ কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে। মালদ্বীপকে ৪-২ গোলে হারানো ম্যাচে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর ১১ সেকেন্ডের গোল আর নেপালের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে ঋতুপর্ণার করা অলিম্পিক গোল নিয়েই যত মাতামাতি। এর বাইরে গোল পাওয়া তিন জনের মধ্যে একজন ফরোয়ার্ড সুরভি আকন্দ প্রীতি, বাকি দুজন ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকু ও মিডফিল্ডার উমহেলা মারমা।
বাংলাদেশের দুর্ভাবনার আছে আরও। গত দুই আসরের মতো এবার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ শক্ত মুঠোয় নিতে পারছে না দল। রক্ষণে আফঈদা, কোহাতিরাও গড়বড় করে ফেলছেন প্রায়ই। সুইডেন প্রবাসী আনিকাকে দুই উইং থেকে পর্যাপ্ত রসদ যোগাতে পারছেন না ঋতুপর্ণা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র। এর সাথে আছে গ্রুপ পর্বে ছন্নছাড়া ফুটবল খেলে ভারতের বিপক্ষে বড় হারের ক্ষত।
নেপাল ম্যাচের আগেও ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল দল। শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুর শোক জেঁকে ধরেছিল সবাইকে। তবে, মাঠের অনুশীলন ছাড়াই নেপালের বিপক্ষে স্বস্তির জয় মেলায়, স্বস্তি ফিরেছে দলের অন্দরে। শিউলির প্রিয়জন হারানোর শোক এক সুঁতোয় বেঁধেছে সবাইকে।
একদিনের রিকভারি শেষে শুক্রবার ফাইনালের আগে দলের সবাইকে নিয়ে মাঠের প্রস্তুতি সেরেছেন বাটলার। অবশ্য, এই ইংলিশ কোচ গুরুত্ব দিচ্ছেন, টুর্নামেন্ট শুরুর দিন সকালে দলের সাথে যোগ দেওয়া ভিডিও অ্যানালিস্টের সেশনের ওপর। টিম হোটেলে ভিডিও সেশনই বেশি চলছে। প্রস্তুতি মাঠ নিয়ে উষ্মা, বহিরাগতদের আনাগোনা, নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যেও তিনি ফাইনালের মহারণের জন্য তৈরি করছেন দলকে।
নানা প্রতিকূলতার পাশাপাশি পরিসংখ্যানও নেই বাংলাদেশের পক্ষে। সাফে ৯ ম্যাচের দেখায় ভারতের জয় এখন ৬টি, দুটি বাংলাদেশের, এক ম্যাচ ড্র। এ আসরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল দেওয়া দল ভারত, ১৫টি। পাশাপাশি নিজেদের জালও অক্ষত রেখেছে প্রতিযোগিতার রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ গত তিন ম্যাচে পাঁচ গোল দিয়ে হজম করেছে ছয়টি! খেলাও ভারতের মাঠে, যে ডেরায় আজও বাংলাদেশ জিততে পারেনি। গত দুই আসরে ভারতের বিপক্ষে মারিয়ারা জিতেছিলেন নেপালের কাঠমাণ্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে।
অনেক কিছু পক্ষে না থাকলেও, ফাইনাল নিয়ে দুই কোচের ভাবনা অবশ্য অভিন্ন। বাটলার বলেছেন, ভিন্ন এক ম্যাচ হবে। ছেত্রিও তাতে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশকে যেন আরেকটু এগিয়ে রাখলেন। বললেন, কোনা কিছু হারানোর ভয় না নিয়েই মাঠে নামবে বাংলাদেশ। চাপটা থাকবে ভারতের উপরই।
নানা মুখী চাপে-তাপে কোন দল ভেঙে পড়বে, সেই উত্তর মিলে যাবে ফাইনালের শেষের বাঁশি বাজার পর। তবে তার আগ পর্যন্ত ধুন্ধুমার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা, ২০১৬ সালের পর প্রথমবার ফাইনালের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। শিলিগুঁড়িতে জিতেছিল ভারত। এবার সে হারের মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার উপলক্ষ বাংলাদেশের সামনে।
দুই দলের ডাকনামও দিচ্ছে লড়াইয়ের ইঙ্গিত। বাংলাদেশের নাম বেঙ্গল টাইগ্রেস ও ভারতের দি ব্লু টাইগ্রেস। বাঘিনীদের লড়াইয়ে সম্প্রীতির সুবাতাস থাকে নাকি?