Published : 01 Jul 2026, 01:33 PM
গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার এক দশক পূর্ণ হলেও মামলার বিচার এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এক বছরের বেশি সময় পার হলেও আপিল বিভাগে এখনো শুনানি শুরু হয়নি।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আসামিপক্ষের আর্থিক অক্ষমতা, আপিল বিভাগের মামলাজট এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পেতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হাই কোর্ট সাত দণ্ডিত আসামির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০২৫ সালের মে মাসে ছয় দণ্ডিত আসামি আপিল বিভাগে পৃথকভাবে খালাস চেয়ে লিভ টু আপিল করেন। তবে এখনো শুনানির কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আপিল বিভাগে বর্তমানে পাঁচজন মাননীয় বিচারপতি আছেন। সারা দেশের মামলার যে চাপ, প্রত্যেকের কাছেই তার মামলাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
রাষ্ট্রের কাছে এ মামলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, "হোলি আর্টিজান মামলার বিচার কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর একটা গুরুত্ব আছে।"
তবে কবে মামলাটির নিষ্পত্তি হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে রাজি হননি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, "আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা থাকলেও নানা বাস্তবতার কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলা সম্ভব নয় যে, এত দিনের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি হবে।"

'আরও কয়েক বছর লাগতে পারে'
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে হাই কোর্টে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর তার সঙ্গে আর আসামিপক্ষের যোগাযোগ হয়নি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আপিল বিভাগে তো সশরীরে উপস্থিত হতে হয় না, অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ডের মাধ্যমে আপিল ফাইল করতে হয়। হাই কোর্টে রায়ের পর আসামিপক্ষ আমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেনি।
“যতটুকু শুনেছি, তারা লিভ টু আপিল করেছেন। তবে সেটি শুনানির জন্য এখনো গৃহীত হয়নি বলেই আমার মনে হচ্ছে। সাধারণত ফৌজদারি মামলায় শুনানির আগে মক্কেলরা আইনজীবীদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ করেন না।"
আপিল শুনানিতে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরিফুল ইসলাম মামলাজটের কারণে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতির কথা বলেন।
"আপিল বিভাগের অবস্থা খুবই খারাপ। ছোটবেলায় অঙ্কে পড়া সেই 'তৈলাক্ত বাঁশে বানরের ওঠার' মত অবস্থা তৈরি হয়েছে এখানে। প্রতিদিন এত মামলা জমা হয় যে, কার্যতালিকায় কোনো মামলা আজকে শীর্ষ বিশে থাকলেও এক সপ্তাহ পর দেখা যায় সেটি একশর নিচে চলে গেছে।"
বিচারাধীন মামলার চাপ কমাতে আপিল বিভাগে বেঞ্চ বাড়ানোর তাগিদ দেন আরিফুল। পাশাপাশি আপিল শুনানিতে বিলম্বের কারণ হিসেবে নিজের একটি ধারণার কথাও তিনি বলেন।
"আইনে তো আসামিদের এর চেয়ে বেশি সাজা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই সরকারও হয়ত ভাবছে যে, তাদের উদ্দেশ্য তো পূরণ হয়েই গেছে।"
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নাহিদুল ইসলাম বলছেন, বর্তমানে আপিল বিভাগে ২০১৯ সালে দায়ের হওয়া একই ধরনের ফৌজদারি লিভ টু আপিল আবেদনগুলোর শুনানি চলছে।
"সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী আমাদের এই আবেদনগুলোর শুনানির পালা আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।"
তার ভাষ্য, সময়মত লিভ টু আপিল দায়ের করা হলেও এরপর মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার মত আর্থিক সক্ষমতা দণ্ডিত আসামিদের অনেকের নেই।
"আমরা তো যথাসময়ে খালাস চেয়ে লিভ টু আপিল করে রেখেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় নাই। আসামিরা দরিদ্র থাকায় কোনো ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত নেননি। আমাদের তো জানেন যে, একটা মোস্ট সিনিয়র আইনজীবী নিয়ে ওখানে শুনানি করাটা আসলে টাকার ব্যাপার।"

কী কারণে আপিল?
খালাস চেয়ে আপিল করার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে, তা এই মামলার ক্ষেত্রে ‘প্রযোজ্য না’।
“এমনকি রায়ে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, ওই আইনে তো মৃত্যুদণ্ড নাই। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন সাহেব ও সংশ্লিষ্টরা কোর্টকে প্রচুর প্রেশার করেছিলেন যেন দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে এদেরকে কিছু একটা লাইফ সাজা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আমৃত্যু কারাদণ্ড লিখে দেওয়া হয়, যদিও আমৃত্যু কারাদণ্ড আইনেও নাই।"
তদন্তের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া কয়েকজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়েও আপত্তি তুলেছেন নাহিদুল ইসলাম।
এ আইনজীবীর অভিযোগ, পরিবারকে ‘ভয়ভীতি দেখিয়ে’ এসব জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল। কয়েকজন আসামির পরিবারের সদস্যদের ‘আটকে রেখে স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া’ হয়েছিল।
মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনজীবী। তার ভাষ্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত তানভীর কাদরীর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে তাহরীম কাদরীকে সাক্ষী করা হয়েছিল, যিনি সে সময় অন্য একটি মামলায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ছিলেন।
"এমন একজন শিশুর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়াটা আইনগতভাবে যথাযথ হয়নি বলে আমরা মনে করি।"
এছাড়া মামলার অন্যতম আসামি মামুনুর রশীদ রিপনকে ভারত থেকে দেশে আনার পর দীর্ঘ সময় ‘গোপন হেফাজতে’ রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন নাহিদুল ইসলাম।

কেন মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড
হোলি আর্টিজান মামলায় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি শহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ সেই সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়।
গত বছরের ১৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাই কোর্ট এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়।
সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে’ যে, হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি ২২ জনকে হত্যা করেছিলেন। পরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে ওই পাঁচ হামলাকারী নিহত হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জীবিত থাকলে ওই পাঁচ হামলাকারীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত।
তবে আপিলকারী সাত আসামির ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত ‘একই অভিপ্রায়ের’ নীতির ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, যা হাইকোর্টের মতে ‘সঠিক হয়নি’, কারণ ঘটনার সময় তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
তবে ‘পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ এবং হামলায় প্ররোচনা’ দেওয়ার অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে’ বলে মনে করেছে হাই কোর্ট।
সে কারণেই হাই কোর্ট তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। পরে হামলার ‘ভয়াবহতা, নৃশংসতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর এর প্রভাব বিবেচনায়’ সেই সাজাকে 'আমৃত্যু কারাদণ্ড' হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়েছিল। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ ২১১ জন সাক্ষীর তালিকা দিলেও, তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১১৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ২৭ নভেম্বর সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ।
মামলার অভিযোগপত্রে তাদের সবাইকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবির’ সদস্য বলা হয়েছিল।
তাদের মধ্যে আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় ৬ অগাস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশৃঙ্খলার মধ্যে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন।

যেভাবে ঘটেছিল হোলি আর্টিজান হামলা
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর হোলি আর্টিজান বেকারিতে আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও গ্রেনেড নিয়ে হামলা চালায় পাঁচ জঙ্গি।
হামলাকারীরা ছিলেন—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।
প্রায় ১২ ঘণ্টার জিম্মি সংকটের মধ্যে তারা ২০ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি।
জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযানের প্রস্তুতিকালে জঙ্গিদের ছোড়া বোমায় নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন খান।
পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত 'অপারেশন থান্ডারবোল্ট'-এর মাধ্যমে জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটে। সেই অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হন এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর ২ জুলাই গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস।
দুই বছরের বেশি তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তৎকালীন পরিদর্শক হুমায়ুন কবির আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
তদন্তে বলা হয়, 'নব্য জেএমবি' দীর্ঘ ছয় মাস পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং জঙ্গিবাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।
পুরনো খবর
হলি আর্টিজান মামলায় ৭ জঙ্গির ফাঁসির রায়, একজন খালাস
হলি আর্টিজান: আপিলে ৭ জঙ্গির সাজা পাল্টে আমৃত্যু কারাদণ্ড
গুলশান হামলা: ১২ ঘণ্টার বিভীষিকা
গুলশান হামলা: প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ কর্মকর্তাদের বর্ণনায় সেই রাত
কোন্দলে সৃষ্ট ‘নব্য জেএমবি’ যেভাবে গুলশান হামলায়