Published : 02 Jul 2026, 12:28 AM
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধনের কাজে হাত দিয়েছে তারা, নিয়েছে অংশীজনের মতামতও।
মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনা চলছে। বর্ষা মৌসুম, বার্ষিক পরীক্ষা, ভৌগলিক অবস্থানসহ সার্বিক বিষয়ে তুলে ধরে ভোটের প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা গুছিয়ে নিচ্ছেন ইসি কর্মকর্তারা।
মধ্য অগাস্টের মধ্যে সব প্রস্তুতি গুছিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কোন নির্বাচন কবে থেকে শুরু হবে, তা নির্ধারণ করা হতে পারে।
সংসদে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে’ আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি শুরু করেছে।
মঙ্গলবার সংসদে টেবিলে উত্থাপিত নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।
ধাপে ধাপে ভোটের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করবে ইসি।
মঙ্গলবার জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা অক্টোবরকে একটা টার্গেট ধরে কাজ করছি। মাঠ পর্যায়ের সব তথ্য আমরা পেয়ে গেছি যে, কতটি ভোটের জন্য এখন প্রস্তুত রয়েছে। আমরা হিসাব নিয়েছি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কতগুলো ২০২৬ সালে ও ২০২৭ সালে নির্বাচন করা যায়; প্রায় সবই করা যায়। আমরা আলোচনা করব (সরকারের সাথেও), ‘নিড বেসিসে’ করব।”
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের আচরণবিধির খসড়া নিয়ে ৩০ জুনের মধ্যে অংশীজনের মতামতও পেয়েছে ইসি।
এ নির্বাচন কমিশনার জানান, মাস-খানেকের মধ্যে বিধি সংশোধনের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর চলমান প্রস্তুতির পরবর্তী ধাপের কাজও শুরু হবে। এখনও কবে ভোট হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যথাসময়ে কমিশন সভায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ভোট করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনের সময় ও ধাপ নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক শিক্ষাসূচি, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়। সাধারণত নভেম্বরের ৩য় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুল কলেজে বার্ষিক পরীক্ষা হয়। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে মাধ্যমিক পরীক্ষা হওয়ার ঘোষণা রয়েছে।
তফসিল ঘোষণার আগে-পরে করণীয় সব কাজের সারসংক্ষেপ ও বাস্তবায়নসূচি তৈরি করছে ইসি সচিবালয়।
নির্বাচন পরিচালনা শাখার ইসির উপ সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, সার্বিক তথ্য ও প্রস্তুতিমূলক কাজের অগ্রগতি এবং প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নসূচি প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। কমিশন যখনই যে নির্দেশনা দেবে, সেভাবে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা ও ভাবনায় সেপ্টেম্বর-মার্চ
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, অতীতে এক ধাপের নির্বাচন থেকে অন্য ধাপের নির্বাচনের সময়ের (সপ্তাহ খানেক) ব্যবধান কম ছিল। মাঠপর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ব্যালট পেপার পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম থাকায় ভোটকেন্দ্রসহ আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।
ধাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থা (যেমন—হাওর, চরাঞ্চল, পার্বত্য জেলা), আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) এবং ধর্মীয় উৎসব বিবেচনা করার জন্য প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা করছে ইসি কর্মকর্তারা।
সারাদেশকে হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চল, নদীপ্রধান ও চরাঞ্চল এবং সমতল ও শহরাঞ্চল—এই চার ভাগে ভাগ করে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে ভোট করা উপযুক্ত সময় বিবেচনা করা হচ্ছে।
হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, নদীপ্রধান ও চরাঞ্চলের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ এবং সমতল ও শহরাঞ্চলের জন্য বর্ষাকাল বাদে যেকোনো সময় নির্বাচন আয়োজনের উপযুক্ত সময় বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সিটি করপোরেশনে এখন প্রশাসক রয়েছে। পৌরসভা আর ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া এবার (প্রথম ধাপে) আপাতত আমাদের পরিকল্পনা নেই। এ দুটি দিয়ে নির্বাচন শুরু করতে হবে। যদি এবার বন্যা হয় তাহলে পৌরসভা দিয়েও আমরা শুরু করতে পারি নির্বাচন, অথবা ইউনিয়ন থেকে শুরু করতে পারি।”
ইউপি’র হালনাগাদ তথ্য
|
৪৫৮০ টি ইউপি |
ভোট হয়েছে |
সীমানা/তালিকা/মামলা জটিলতায় আটকে |
|
২০২১-২২ অর্থ বছর এর আগে |
২৮৯টি |
|
|
২০২১-২২ অর্থ বছর |
৩,৯৮১ টি- সাত ধাপে করতে সময় ৬-৭ মাস |
|
|
২০২৩-২৪ অর্থ বছর |
৯২টি |
|
|
|
|
১০৮টি |
২০২১ সালের এপ্রিল, নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সাত ধাপে ভোট হয়েছে।
এবারও ইউনিয়ন পরিষদের ভোট ধাপে ধাপে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
“ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ধাপে ধাপে ২০০ বা ২৫০ বা ৩০০ করে যেভাবে করা হত, সেভাবে হতে পারে। বর্ষা, বন্যা, পাবলিক পরীক্ষা বিবেচনায় নিয়ে থাকবে ইসির।”
ইউপি ছাড়া পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ২০২৪ সালের অগাস্টে অপসারণ করা হয়। এরপর সেখানে প্রশাসক নিয়োগ হয়। স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ পদই এখন নির্বাচন উপযোগী রয়েছে।
পৌরসভার ক্ষেত্রে
|
৩৩০টি |
ভোট হয়েছে |
সীমানা/তালিকা/মামলা জটিলতায় আটকে |
|
২০২০-২১ অর্থবছর |
২৪৭টি- ছয় ধাপে করতে ৫ মাস |
|
|
২০২১-২২ অর্থবছর |
৬৭ টি |
|
|
|
|
১৬ টি |
২০২০ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে ছয় ধাপে ভোট হয়েছে।
মাঠ পযায়ের ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৩২০টি পৌরসভা এখন নির্বাচন উপযোগী রয়েছে; বাকিগুলো সীমানা ও আইনি জটিলতায় নির্বাচন উপযোগী নয়।
এবারও এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের মার্চ সময়কে ভোটের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করে প্রস্তাব রাখছে ইসি সচিবালয়।
উপজেলা পরিষদ
|
৫০০ টি (এ বছর নতুন ৫টি) |
ভোট হয়েছে/মেয়াদোত্তীর্ণ |
সীমানা/তালিকা/মামলা জটিলতায় আটকে |
|
২০২৪ |
৪৬৯টি চার ধাপ+ বিশেষ ধাপে করতে ৪ মাস
|
|
|
|
১৭টি মেয়াদোত্তীর্ণ হয় নি |
|
|
|
|
৮ টি +১টি নবগঠিত |
|
২০২৬ সালে নতুন উপজেলা |
|
৫টি |
২০২৪ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে চার ধাপে এবং বিভিন্ন ধাপে স্থগিতগুলো নিয়ে আরেকটি বিশেষ ধাপ মিলিয়ে পৌনে পাঁচশ’ উপজেলার ভোট হয়।
সিটি করপোরেশন হালনাগাদ
|
১৩ টি (এ বছর নতুন ১টি) |
ভোট হয়েছে |
নতুন |
|
২০১৯-২০ অর্থবছর |
২টি |
|
|
২০২০-২১ |
১ টি |
|
|
২০২১-২২ |
২টি |
|
|
২০২২-২৩ |
৬টি |
|
|
২০২৩-২৪ |
১টি |
|
|
২০২৬ সালে নতুন সিটি |
|
১টি |
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম সিটি, ২০২২ সালের জুনে কুমিল্লা সিটি ও ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়।
২০২৩ সালের মে মাসে গাজীপুর সিটি, জুনে খুলনা সিটি ও বরিশাল সিটি এবং রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ভোট হয়।
সবশেষ ২০২৪ সালের মার্চে ময়মনসিংহ সিটিতে ভোট হয়েছে। এ বছর মে মাসে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি: সংসদে ফখরুল
স্থানীয় নির্বাচন: মাঠ প্রস্তুতির অগ্রগতির তথ্য পর্যালোচনা করছে ইসি
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সংসদে ফখরুল
স্থানীয় নির্বাচন: অগাস্টে তফসিলের ভাবনা ইসির