Published : 15 Jul 2026, 12:43 AM
দেশজুড়ে অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় দেশের অধিকাংশ জেলায় মৎস্য, প্রাণি ও কৃষির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, চূড়ান্ত হিসাবে যা আরও বাড়তে পারে। কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি।
মৎস্য অধিদপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে শুধু এ খাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ কোটি ৯৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।

যার মধ্যে খামার, পুকুর, দীঘি মিলিয়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার জলযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, মাছ, মাছের পোনা, চিংড়ি ও খামারের অবকাঠামো ভেসে গিয়ে বিপুল অঙ্কের এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সারাদেশে ৪২টি উপজেলার ৬০২টি ইউনিয়নের ৩০ হাজার ৩৬টি পুকুর, দীঘি, ঘের, খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। বন্যায় এ বিভাগে ৩১৪টি ইউনিয়নে ১৯ হাজার ৬২৩টি পুকুর বা দীঘি এবং ৭৮৪টি চিংড়ি ঘের সম্পূর্ণ ভেসে গেছে।
ভেসে যাওয়া মাছ, চিংড়ি ও পোনা, মৎস্য খাতের অবকাঠামো, জাল ও নৌকার ক্ষতিসহ সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৭৪ কোটি ২৯ লাখ ৮ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণিসম্পদ খাতে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই সর্বমোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যার পানি ও চারণভূমি প্লাবিত হওয়ায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির তীব্র খাদ্যসংকট, বাসস্থান ধ্বংস এবং নানাবিধ রোগবালাইয়ের কারণে খামারিরা চরম আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন।

গেল ৫ জুলাই রাত থেকে টানা কয়েক দিনের অতি ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের ৪৩টি জেলার ফসলি জমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির এ প্রতিবেদন তৈরি করলেও বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলাগুলোর মোট ৩৬টি উপজেলা এবং ১৫৬টি ইউনিয়ন সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছে।
এছাড়া মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলা বন্যার কবলে পড়েছে।
দুর্যোগোত্তর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে নিবিড় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে ভাষ্য অধিদপ্তরের।
এ বিষয়ে মৎস ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মঙ্গলবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের যেই যেই জায়গায় বন্যা হয়েছে, আমাদের অফিসার যারা রয়েছে মাঠ পর্যায়ে, তাদেরকে আমরা পুরো তালিকা করতে বলেছি, কোথায় কী ক্ষতি হয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে পরবর্তীতে আমরা আমাদের পদক্ষেপ নেব।”
৪৩ জেলায় ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর ফসল আক্রান্ত
টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের ৪৩টি জেলায় বড় ধরনের ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ৬ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব জেলায় মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত ও আক্রান্ত হয়েছে।
এর ফলে দেশের ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন কৃষক সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে দেশের প্রায় সবকটি বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রয়েছে। জেলাগুলো হলো—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, গাইবান্ধা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, পাবনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই ৪৩টি জেলায় মোট ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ লাখ ৭ হাজার ২৪৭ হেক্টর ফসলি জমি মাঠে দন্ডায়মান ছিল।
আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে, যা মাঠের মোট ফসলের একটি বড় অংশ।
জাতীয় চিত্রে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির।
জাতীয়ভাবে আউশ আবাদের ৭৯ হাজার ৫৫০ হেক্টর এবং আমন বীজতলার ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে।
এর ফলে ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৪৯ জন আউশ চাষি এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ২৬৭ জন আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত চাষি চরম সংকটে পড়েছেন।
এছাড়া ১৭ হাজার ৮৩৪ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত থাকায় বিপাকে পড়েছেন দেশের ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৩৬ জন সবজি চাষি। অন্যদিকে পাট চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬২ জন কৃষক, যেখানে ৭২৩ হেক্টর পাটখেত আক্রান্ত হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ৩০ হাজার ২৩ হেক্টর আউশ আবাদ, ২ হাজার ৭২২ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮২৮ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। এই জেলায় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কক্সবাজারে ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমির আউশ আবাদ, ৮৯৫ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ২ হাজার ৭২০ হেক্টর সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া নোয়াখালীতে ৩১ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমির আউশ, ২ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ১১ হাজার ৬৮৭ হেক্টর সবজিখেত আক্রান্ত হয়েছে।
পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমির আউশ এবং বান্দরবান জেলায় ১৩৫ দশমিক ৮ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরগুনায় আউশ আবাদের বড় বিপর্যয় ঘটেছে। জেলাটিতে আবাদ হওয়া আউশের মধ্যে ৩২ হাজার ২৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের জন্য একটি বড় আঘাত। পাশাপাশি জেলাটিতে ৭৬৩ দশমিক ৩৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
পার্শ্ববর্তী জেলা ঝালকাঠিতে ৯৫০ হেক্টর আউশ ও ৮৫০ হেক্টর আমন বীজতলা এবং পটুয়াখালীতে ৫২০ হেক্টর আউশ আবাদ আক্রান্ত হয়েছে।

বরিশালের চিত্রও আশঙ্কাজনক, সেখানে ৫৪০ হেক্টর আউশ এবং ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। ভোলা জেলায় ৪৫০ হেক্টর আউশ জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে।
বন্যা ও অতিবৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পায়নি দেশের অন্যতম অর্থকরী ও মসলা জাতীয় ফসলও। সারাদেশে মোট ৭৫৩ হেক্টর মরিচের খেত আক্রান্ত হয়েছে।
এর মধ্যে মেহেরপুর জেলায় সর্বোচ্চ ২১০ হেক্টর মরিচের জমি আক্রান্ত হয়েছে, আর পাবনায় আক্রান্ত হয়েছে ৯৪ হেক্টর জমি। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ১০ হেক্টর এবং চাঁদপুরে ৬ হেক্টর মরিচখেত পানির নিচে চলে গেছে।
অন্যদিকে মৌলভীবাজারে ৭৪৫ হেক্টর আদা ও ৬৪৮ হেক্টর হলুদ এবং রাঙামাটিতে ২৪০ হেক্টর ফলবাগান আক্রান্ত হয়েছে। বরিশালে ১৬৪ হেক্টর ও পটুয়াখালীতে ৩২ হেক্টর পানবরজ আক্রান্ত হয়েছে।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে নওগাঁয় ৪ হাজার ৩৪০ হেক্টর আউশ আবাদ, ২৪৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ১৭৪ হেক্টর জমির সবজি আক্রান্ত হয়েছে। যশোরে ৬৮২ হেক্টর জমির আউশ আবাদ, ৩১০ হেক্টরের বোনা আমন এবং ৪৫৩ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় ১৫৫ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ৯২ হেক্টর আমন বীজতলা আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে।
ঢাকা বিভাগে ঢাকার ৩০ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ৫৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমির সবজি, নরসিংদীতে ২২ হেক্টর জমির আউশ ও ২৪৩ দশমিক ৭৫ হেক্টর জমির সবজি এবং মুন্সীগঞ্জে ৬৬ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে।
ফরিদপুরে ৪৩ হেক্টর ও রাজবাড়ীতে ১৮০ হেক্টর জমির সবজি আক্রান্ত হয়েছে। শরীয়তপুরে শেষ মুহূর্তে ১৪০ হেক্টর জমির সবজি ও ৫০ হেক্টর বোনা আমন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ মূলত প্রাথমিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অনেক এলাকায় এখনো পানিবন্দি অবস্থা রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উন্নত হলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা তৈরি ও জরুরি কৃষি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেখানেই খোঁজ নেবেন দেখবেন যে পরশুদিন পানি ছিল, আজকে পানি নেই। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি আমাদের তো সাতটা (জেলা) ‘ব্যাডলি এফেক্টেড’। পানি নেমে গেছে কিছু জায়গায়। পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণটা নিরূপণ হবে।
“তারপর ওখানে পদক্ষেপটা আমরা নেব। সেটা আমনের প্রণোদনা হতে পারে, শাকসবজি হতে পারে। আর অন্যান্য জেলাগুলোতে (সাত জেলার বাইরে) জলাবদ্ধতা হয়েছে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে। দেখবেন যে আজকে বৃষ্টি নেই, আগামীকালই ওই জায়গাগুলোতে পানি নেমে গিয়েছে। ক্ষতি হবে কি না, আমরা তো এর পরে, দুই একদিন পরে আমরা নিশ্চিত হব যে কত শতাংশ ক্ষতি হল বা কতটুকু ক্ষতি হল।”
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সবচেয়ে বেশি যেটা ক্ষতির পরিমাণ, যেটা নিরূপণ করা হচ্ছে, সেটা হল আমাদের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন বীজতলা নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের এই পূর্বাঞ্চল যেটা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল, ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ওখানে একজন প্রতিমন্ত্রী আছেন দায়িত্ব নিয়ে। আর কালকে অপরাহ্নে কৃষিমন্ত্রী নিজে ওখানে অবস্থান নেবেন। কৃষকদের কাছে কাছে দাঁড়াবেন, পাশে দাঁড়াবেন। যার যা, যে যে প্রয়োজন, সব দেওয়া হবে। সরকার পাশে আছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক কৃষকের পাশেই সরকার।”
বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৬
বন্যাকবলিত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবজার, চট্টগ্রাম, মৌলভী বাজার ও হবিগঞ্জে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মঙ্গলবারের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, এসব জেলার ৫৯টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার দুর্যোগে এ পর্যন্ত মারা গেছে রাঙামাটিতে ৩, বান্দরবানে ৬, কক্সবাজারে ৩১ (স্থানীয় ১৮ জন, রোহিঙ্গা ১৩ জন), চট্টগ্রামে ১৫ ও মৌলভীবাজারে ১ জন।

আর বন্যায় মোট ৩৯ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে খাগড়াছড়ির ১ জন, বান্দরবানের ২ জন, কক্সবাজারের ২৪ জন (স্থানীয় ১৯ জন, রোহিঙ্গা ৫ জন) ও চট্টগ্রামের ১২ জন রয়েছেন।
এদিকে বন্যা মোকাবিলায় মঙ্গলবার সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি সভা হয়েছে।
সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত সেবা ও সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, “বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।”
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই।”
সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, দুর্গত মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে।”
একই সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুদ ও বিতরণে সমন্বয় জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র মূল্যায়ন করে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।
এছাড়া কৃষি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে নতুন বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, এলজিইডির আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে উদ্ধার, ত্রাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে সরকারের তরফে বলা হয়েছে।