টাঙ্গাইলের রাকিবের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর শোক বাড়িয়েছে পরিবারের
রাকিবের বাবা বলেন, “ধার-দেনা করে মুক্তিপণ দিয়েছিলাম তাকে ফিরে পাওয়ার আশায়। টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত পেলাম না।”
টাঙ্গাইলের গোপালপুরের রাকিবের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবারে। আনন্দ করার বদলে তার বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
কারণ অপহরণের পর সাধ্যমত মুক্তিপণ দিয়েও রাকিবকে ফেরত পায়নি পরিবার। নিখোঁজের ২০ দিন পর নীলফামারীর ডিমলায় মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় তার বস্তাবন্দী মরদেহ।
শনিবার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, “ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এ খবরে আমাদের অনেক আনন্দ হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, বড় হবে। কিন্তু ছেলের এই সাফল্যের আনন্দটুকুও উপভোগ করতে পারলাম না।”
তিনি বলেন, “ধার-দেনা করে মুক্তিপণ দিয়েছিলাম তাকে ফিরে পাওয়ার আশায়। টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত পেলাম না।”
রাকিবুল ইসলাম রাকিবের (১৮) বাড়ি গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদীর আটা গ্রামে। তার বাবা খাদেমুল ইসলাম কৃষক।
রাকিব ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। মেধাবী এ ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তুতির জন্য ঢাকার ফার্মগেট এলাকার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন।
রাকিবের পারিবার জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় রাকিব। পরে অপরিচিত এক যুবক তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে রাকিবের চোখ-মুখ বাঁধা ও নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় দরিদ্র কৃষক খাদেমুল ইসলাম ধারদেনা ও সুদে টাকা সংগ্রহ করে মুক্তিপণ হিসেবে চার লাখ টাকা অপহরণকারীদের পাঠান। কিন্তু টাকা পেয়েও রাকিবকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনায় পরিবারের অভিযোগের পর তদন্তে নামে পুলিশ এবং ঢাকার শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুন রহমান (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে।
পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামের একটি বাড়ির মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, রাজধানীর শুক্রবাদের একটি বাসায় ঘাড় মটকে ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়। পরে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআইর মাধ্যমে’ তাকে জীবিত দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছিল।
রাকিবুলের মা জাহুরা বেগম বলেন, “ছেলের ভালো ফলাফলে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একদিন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
“কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের বদলে এখন ছেলেকে হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।”
বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, “ছেলের ভালো ফলাফলে পরিবারের আনন্দ করার কথা থাকলেও সেই আনন্দের খবর এখন ছেলের শোক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
