ঢাকায় হত্যা করে নীলফামারীতে নিয়ে মাটিচাপা: সামাজিকমাধ্যমে পরিচয়, ‘মুক্তিপণের জন্য’ খুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে আসা রাকিব ১৬ সেপ্টেম্বর শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়।
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু এক কিশোরকে বাসায় ডেকে নিয়ে ‘মুক্তিপণের জন্য’ হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারই বন্ধুস্থানীয় আরেক যুবকের বিরুদ্ধে।
পুলিশ বলছে, রাজধানীর শুক্রবাদের একটি বাসায় ঘাড় মটকে ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়। পরে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআইর মাধ্যমে’ তাকে জীবিত দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছিল।
১৭ বছর বয়সি রাকিবুল ইসলাম ঢাকার শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায়।
এইচএসসির পর ঢাকায় এসে ফার্মগেটের ‘ফোকাস কোচিং সেন্টারে’ ভর্তি হয়েছিল রাকিব।
গেল ১৬ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় রাকিব, ওইদিন রাত থেকেই তার পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়।
সে অনুযায়ী রাকিবের পরিবারের তরফে বিকাশ ও নগদ নম্বরে কয়েকদফায় ৪ লাখ টাকাও পাঠানো হয়।
২১ সেপ্টেম্বর রাকিব নিখোঁজের ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি জিডি করেছিলেন তার বড়ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন।
ঘটনার তদন্তে নেমে মুক্তিপণ চাওয়া এবং টাকা পাঠানো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বরের সূত্র ধরে শুক্রাবাদ থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪) নামের ওই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বুধবার বিকালে রাজধানীর রমনা এলাকায় ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসে যুগ্ম কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম বলেছেন, তারা রাকিব ইসলাম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছেন।
মঙ্গলবার নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় গ্রেপ্তার মামুনের বাড়ি থেকে মাটি খুঁড়ে কিশোর রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, নিহত রাকিবের সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল।
মামুন এসএসসির পর ডিমলা থেকে ডিপ্লোমা পাশ করেন, এরপর ঢাকায় এসে গেল বছর ধানমন্ডিতে মার্কেটিংয়ের একটা কোর্সে ভর্তি হন। তখন থেকে শুক্রাবাদে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।
মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ কর্মকর্তা মহিদুল বলেন, “১৬ সেপ্টেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে রাকিবকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে ডেকে নেন মামুন, তারপর তাকে নিয়ে শুক্রাবাদে নিজের বাসায় যান।
“সেখানে রাকিবের কাছে মুক্তিপণ চেয়ে চাপ দেন এবং মারধর করেন মামুন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রাকিবের ঘাড় মটকে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়।”
এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাকিবের বড়ভাই জীবনকে ফোন করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “একটা পর্যায়ে রাকিবের পরিবার চারটি বিকাশ নম্বর এবং তিনটি নগদ নম্বরে ৪ লাখ টাকাও পাঠায়। সেই নম্বরগুলোর সূত্র ধরে প্রযুক্তির সহায়তায় কাজ করে আমরা ফাইন্ড আউট করতে সক্ষম হই। অবস্থান শনাক্ত করে সোমবার বিকালে মামুনকে আমরা হেফাজতে নিই।”
মহিদুল ইসলাম বলেন, “ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন স্বীকার করেন যে, তিনি রাকিবকে হত্যা করেছেন।”
রাকিবের লাশ ডিমলায় নিয়ে লাশ মাটিচাপা দেওয়া প্রসঙ্গে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “রাকিবের লাশ গুম করার জন্য গায়ের কাপড়চোপড় খুলে ময়লার ভাড়াড়ে ফেলে দেয়। তার দেহটাকে একটা কার্টনের মধ্যে ঢুকিয়ে অ্যাডহেসিভ টেপ দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে রাখে।
“রাত সাড়ে ১০টার দিকে মামুন তার বাসার দারোয়ানকে রিকশা ডেকে আনতে বলেন। পরে দারোয়ানের সহায়তায় কার্টনটি নিচে নামিয়ে রিকশায় তুলে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে চলে যান। সেখান থেকে একটি বাসে করে রংপুর চলে যান।”
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পরদিন রংপুর থেকে লোকাল বাসে করে ডিমলা এবং সেখান থেকে কার্টনসহ ভ্যানে করে নিজের বাড়ি যান মামুন। প্রথমে কার্টনটি সুপারিবাগানে রাখেন, রাতে লাশটি মাটিচাপা দিয়ে পরদিন ঢাকা ফিরে আসেন তিনি।
তিনি বলেন, “মঙ্গলবার আমরা মামুনকে নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি যাই এবং ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় মামুনের দেখানো জায়গা থেকে রাকিবের লাশটি উত্তোলন করা হয়। লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
মামুনের বাড়ি থেকে আদায় করা মুক্তিপণের ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করার তথ্যও দেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম।
কাফরুল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “রাকিবকে হত্যার পরেও যখন মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছিল, তখন তার পরিবারের কাছে রাকিবের ভিডিও পাঠিয়ে জীবিত আছে বলে জানিয়েছিলেন মামুন। তিনি বলছিলেন রাকিব তার হেফাজতে সুস্থ আছে, টাকা পেলে ছাড়বে। আসলে এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও বানানো হয়েছিল।”
এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা মহিদুল বলেন, “মামুন দোষ স্বীকার করেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে আমরা বুঝতে পারব তার বক্তব্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না। আমাদের তদন্ত চলছে, তদন্তে আরো কারো যদি জড়িত থাকার প্রমাণ পাই তাহলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।”
গ্রেপ্তার মামুনের বাবা ডিমলা বালাপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড শাখা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আফসার আলী।
ডিমলা থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আফসার আলী জামায়াতের ওয়ার্ড শাখার সেক্রেটারি। তবে মামুনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হতে পারিনি। স্থানীয়দের মুখে শুনেছি আগে না-কী শিবির করতেন।”
