জিপিএ-৫ পেয়েছে রাকিব, কাঁদছে পরিবার
“শুধু আমরা না, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও আপ্লুত। রেজাল্ট দিয়েছে, কোথায় সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করব, সেখানে কান্নাকাটি করছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার স্বপ্ন ছিল রাকিবুল ইসলাম রাকিবের। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসে ভর্তি হয়েছিলেন কোচিং সেন্টারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণের আগেই খুন হন তিনি।
তার মৃত্যুর দেড় মাস পর গত শনিবার প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ফল। তাতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন রাকিব।
যে ফলাফল ঘিরে পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষকদের আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল, সেই ফলই এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে বেদনার কারণ।
রাকিবের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গাইলের সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। এ বছর ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
বাংলাদেশে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার।
রাকিবের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জীবন বলেন, দুই ভাইয়ের মধ্যে রাকিব ছিলেন ছোট। তাদের বাবা কৃষিকাজ করেন, মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন রাকিব। কোনো ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি।
“আমি তেমন ভালো ছাত্র ছিলাম না। এ কারণে ঢাকায় এসে ছোট ব্যবসা করছি, পাশাপাশি পড়াশোনাও করছি। রাকিব গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। কিন্তু রেজাল্টটা দেখে যেতে পারল না।
“ওর এত ভালো রেজাল্টেও আমাদের কাঁদতে হচ্ছে। শুধু আমরা না, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও আপ্লুত। রেজাল্ট দিয়েছে, কোথায় সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করব, সেখানে কান্নাকাটি করছি।”
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেই ঢাকায় চলে এসেছিলেন রাকিব। ভর্তি হয়েছিলেন ফার্মগেইটের ফোকাস কোচিং সেন্টারে। সেখানেও তিনি পরীক্ষায় প্রথম হতেন বলে জানান জীবন।
তিনি বলেন, “১৮ সেপ্টেম্বরও ওর কোচিংয়ে পরীক্ষা ছিল। শিট দেবে বলে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামের এক লোক তাকে বাসা থেকে ডেকে নেয়। এরপর তো আর ফেরেনি।”
মামুনের সঙ্গে রাকিবের পরিচয় হল কীভাবে? জীবন বলেন, ফেইসবুকের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়েছিল। মামুন নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে রাকিবকে পড়াশোনার বিষয়ে সহযোগিতা করার কথা বলেছিলেন।
“১৬ সেপ্টেম্বর শিট দেওয়ার কথা বলে শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে ওই লোক ওকে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে যায় বলে জানতে পেরেছি। ওই দিন রাকিবকে খুন করে। এআই দিয়ে ওকে জীবিত দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে চার লাখ টাকাও নেয়। আসামির গ্রামের বাড়ি নীলফামারী থেকে ৬ অক্টোবর কবর খুঁড়ে রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়।”
তবে কী কারণে রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনো জানতে পারেননি বলে জানান জীবন।
“যে আমার ভাইকে খুন করেছে, তার ফাঁসি চাই। এ ঘটনার পর থেকে আব্বু-আম্মুর অবস্থা অনেক খারাপ। সব সময় কান্নাকাটি করে। আসামির দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবেন।”
রাকিবকে ঘিরে পরিবারের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে জীবন বলেন, তাদের সব আশা ছিল ছোট ভাইকে নিয়ে। বাবার একার আয়ে সংসার ও পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হওয়ায় তিনি নিজেও ব্যবসা শুরু করেছিলেন।
জীবন বলেন, “ঢাকায় কোচিং করতে আসার সময় আম্মুকে বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করবে। এরপর বিদেশে যাবে পড়তে। গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, ভাইটা খুন হল।
“রাষ্ট্রেরও অনেক ক্ষতি হল। বেঁচে থাকলে হয়ত সে দেশের জন্যও কিছু না কিছু করত। এ ঘটনার পর কাফরুল থানার ওসি আব্বুকে বলেছিলেন, গাছ লাগিয়েছিলেন, ফলও ধরেছিল, কিন্তু খেতে পারলেন না।”
বন্ধুদেরও স্বপ্ন ছিল
বন্ধু মহিউদ্দিন বুলবুল ও ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে পূর্ব শেওড়াপাড়ার একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন রাকিব। সেখান থেকে ফার্মগেইটের ফোকাস কোচিং সেন্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতেন তারা।
রাকিবের বন্ধু ইসমাইল হোসেন বলেন, “আমরা দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছি। এক কলেজে পড়তাম। একসঙ্গে ভার্সিটিতে যাব, এমন পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রাকিব খুন হল। খুব খারাপ লাগছে।”
রাকিব সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন বলে জানান আরেক বন্ধু মহিউদ্দিন বুলবুল।
তিনি বলেন, “ও ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমরা একই কলেজে পড়াশোনা করেছি। তারপর কোচিং করতে ঢাকায় আসি। রাকিব ছিল ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। এক-দুবার পড়লেই সব পড়া পারত। এইচএসসি পরীক্ষার সময় পুরো হল ওর হেল্প নেয়।”
ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে বুলবুল বলেন, সেদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত টানা পড়াশোনা করেছিলেন রাকিব। এরপর মামুন বাসার নিচে এসে তাকে ডেকে নিয়ে যান।
বুলবুল বলেন, “ওই লোকটার কথা ও মাঝেমধ্যে বলত। ফেইসবুকে পরিচয়। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, পড়াশোনার বিষয়ে আমাদের হেল্প করতে পারবে। প্রায়ই তার সম্পর্কে গল্প করত।”
পরে বুলবুল জানতে পারেন, রাকিবকে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে আটকে রাখেন মামুন। তার ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়।
বুলবুলের ভাষ্য, রাকিব কান্নাকাটি করলে মামুন তার ‘ঘাড় মটকে’ হত্যা করেন।
রাকিবের ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়ে বুলবুল বলেন, তাদের এলাকায় একজন ব্যারিস্টার রয়েছেন। গ্রামে গেলে এলাকার মানুষ তাকে সম্মান করেন। তা দেখেই ব্যারিস্টার হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল রাকিবের।
বুলবুল বলেন, “আমরা জানতাম, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল তে ভর্তি হতে পারবে। কারণ ও ওই রকম ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। ওর রেজাল্ট দেখার পর তো আমরা সবাই ইমোশনাল হয়ে পড়ি। ব্রিলিয়ান্ট একজনকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি।”
রাকিবের মরদেহ কার্টনে ভরে মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বুলবুল।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হোক।”
রাকিবের সঙ্গে পূর্ব শেওড়াপাড়ার বাসায় কাটানো সময়ের স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় বুলবুলকে। এ কারণে ওই বাসা ছেড়ে টঙ্গীতে বাসা নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
“আমি এখন গ্রামের বাড়ি ঘাটাইলে আছি। পরিবারের লোক ভয়ে ঢাকা যেতে দিতে চাচ্ছে না। ভাবতেছে, যদি রাকিবের মতো আমিও খুন হই।”
মামলার অভিযোগ ও বর্তমান অবস্থা
রাকিবকে খুঁজে না পেয়ে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে গত ৫ অক্টোবর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কাফরুল থানায় মামলা করেন তার বড় ভাই জীবন।
ওই দিনই সন্ধ্যায় রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে তাকে নিয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামে অভিযান চালানো হয়। মামুনের দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকে ৬ অক্টোবর মাটিচাপা অবস্থায় কার্টনে ভরা রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
৭ অক্টোবর মামুনকে আদালতে হাজির করে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার।
আদালতে দেওয়া আবেদনে বলা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর রাকিবকে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে ‘ঘাড় মটকে’ হত্যা করেন মামুন। এরপর রাকিবের পরনের কাপড় খুলে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে টেপ দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন তিনি। কাপড়চোপড় ফেলে দেন সিটি করপোরেশনের ময়লার বাক্সে।
ওই দিন রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় করে কার্টনটি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। সেখান থেকে বাসে রংপুর যান। পরে আরেকটি বাসে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছান।
পরদিন সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিয়ে বাড়িতে যান। সারাদিন বাড়ির পাশের সুপারিবাগানে সেটি রেখে সন্ধ্যার পর মাটিচাপা দেন।
আদালতের আবেদনে বলা হয়, রাকিবকে হত্যার পর তার পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন মামুন। পরে পরিবার চার লাখ টাকা দেয়।
মামুনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইল। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
মামলার লাশ গুমের অভিযোগে দণ্ডবিধির ২০১ ধারা এবং হত্যার অভিযোগে ৩০২ ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শ্যামল কুমার হালদার বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। অনেক প্রসেস থাকে। তদন্তে একটু সময় লাগবে। শুনেছি, ছেলেটা এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।”
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম জানান, মামলার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ১০ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, রাকিব পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে থেকে ফার্মগেইটের ফোকাস কোচিং সেন্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করেন। এরপর রাকিব বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বাইরে যাওয়ার কথা বলেন।
রাকিব বাসায় না ফেরায় ইসমাইল ও বুলবুল তার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন। তখন অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, রাকিব তাদের সঙ্গে আছেন এবং ১০ মিনিটের মধ্যে চলে যাবেন।
এ খবর পেয়ে রাত ১২টা ২৩ মিনিটের দিকে রাকিবের নম্বরে ফোন করেন তার বড় ভাই জীবন। একজন ফোন ধরে বলেন, রাকিবকে ফিরে পেতে হলে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর রাকিবের দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে রাকিবের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবার চার লাখ টাকা দেয়। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও রাকিবকে ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন অপহরণকারীরা।
পরে মামুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলায় হত্যা ও লাশ গুমের ধারা যুক্ত করার আবেদন করা হয়। সেখানে বলা হয়, মামুন রাকিবকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, হত্যা এবং মরদেহ গুমের অপরাধ করেছেন।
