নয় বছর পর নতুন রূপে ওসমানী উদ্যান, মন ভরবে নগরবাসীর?
“এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এখন যা আছে, এটাকে নিয়েই চলতে হবে। পিছিয়ে গেলে তো আর কিছু পাব না,” বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
শহুরে জীবনে ক্লান্তি ঘোঁচাতে সবুজে ঘেরা যে জায়গাটিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত নগরবাসী, ঐতিহাসিক সেই ওসমানী উদ্যানের দরজা নয় বছর বন্ধের পর খুলে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ এ সময়ে সবুজ উদ্যানে ইট-পাথরের মিশেলে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কর্মযজ্ঞ চলেছে। গাছপালা কেটে নগরবাসীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জাদুঘর, গ্রন্থাগার, শরীরচর্চাকেন্দ্র, শৌচাগার, ফুড কোর্ট, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং আর শিশুদের খেলার মাঠ।
যদিও এত লম্বা সময়ের পরও এসব স্থাপনা এখনও চালু হয়নি। ষোল দিন আগে, গত ২০ অক্টোবর উদ্যানের ফটকগুলো খুলে দেওয়া হলেও ভেতরে ঢুকে নানা বিড়ম্বনায় পড়ার কথা বলছেন নগরবাসী।
সংস্কারের আগে সেখানে প্রবেশে টাকা লাগত না। এখন প্রবেশে ১০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে। উদ্যানের ভেতরে প্রকাশ্যে ধূমপান, নির্জন কোণে বসে মাদক সেবনে মতো অস্বস্তিকার পরিবেশের পাশাপাশি শৌচাগার চালু না থাকার কথা বলেছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া উদ্যানের বাইরে ভবঘুরেদের উৎপাত ও হকারদের হাঁকডাকে উদ্যানের পরিবেশ যে নষ্ট হচ্ছে, সে কথাও বলেছেন তারা।
নগর কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। উদ্যানে প্রবেশ করতে ফি নেওয়ার প্রসঙ্গে তারা বলছেন, উন্মুক্ত করে দিলে ভবঘুরে আর মাদকসেবীরা অবাধে প্রবেশ করতে পারেন। তাদের নিয়ন্ত্রণে ফির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে প্রবেশ ফি নির্ধারণের বিষয়টিকে ‘নাগরিক অধিকারের পরিপন্থি’ বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। ‘রক্ষণাবেক্ষণ খরচের ফাঁদে পড়ে’ নাগরিকদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে প্রবেশমূল্য নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
আর সংস্কারের নামে ‘সবুজ ধ্বংস করে’ কংক্রিটের স্থাপনা বানিয়ে উদ্যানের ‘মৌলিক চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে’ বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
দুই বছরের প্রকল্প ৯ বছর
ওসমানী উদ্যানের অবস্থান গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কার্যালয় নগরভবন ও সচিবালয়ের মাঝখানে। ২৩ একরের বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত উদ্যানের নামকরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামানুসারে।
২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানটি সংস্কারের প্রকল্প নেওয়া হয়। পরের বছর জানুয়ারিতে ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নাম দিয়ে সংস্কারের প্রকল্প কাজের উদ্বোধন করেন সেসময়ের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
শুরুতে ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব পেলেও নানা অভিযোগের পরে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন করে কাজের দায়িত্ব পায় ‘পিএফ করপোরেশন’। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে একটি ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও দুটি ফটক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি কোম্পানি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) কাজটি করে।
নয় বছর পর গত ১৯ অক্টোবর সংস্কার করা উদ্যানটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করেন। পরদিন থেকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম পালা এবং দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দ্বিতীয় পালায় উদ্যান খোলা থাকছে।
বুধবার উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, ১০ টাকার টিকেট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ হাঁটাহাঁটি করছেন, কেউ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। ভেতরে সারি সারি লাগানো হয়েছে অর্জুন, কুর্ছি, হিজল, কাঠবাদাম, শিমুল, কাঠগোলাপ, বাতাবি লেবু, আমড়া, গামার, গর্জন, চিকরাশি, কৃষ্ণচূড়া, দেবকাঞ্চন, নাগলিঙ্গম, পাকুড়, সেগুন, বটবৃক্ষ ও মান্দারসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথে বসানো হয়েছে সড়কবাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা। রাখা হয়েছে ডাস্টবিনও।
শৌচাগারসহ কোনো স্থাপনাই চালু হয়নি
উদ্যানের ভেতরে ১২টি ফুড কোর্ট, জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ইনডোর গেমস রুম, জিমনেসিয়াম, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং ও শিশুদের খেলার মাঠের জন্য স্থাপনা ও জায়গা তৈরি করা হলেও সেগুলোর কোনোটিরই কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।
উদ্যানে আনসার সদস্যদের একজন রাহাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পর্যায়ক্রমে এগুলো খুলবে। কিন্তু এখনো ওয়াশরুমই বানানো হয়নি। আমরা অস্থায়ী একটা ওয়াশরুম ব্যবহার করি, যেটা কাজ চলার সময় ওয়ার্কারদের জন্য করা হয়েছিল।
“ওটার পরিবেশও খুবই নোংরা। বিশেষত মহিলারা ঘুরতে এসে খুবই বিড়ম্বনায় পড়েন।”
নাতিকে নিয়ে উদ্যানে আসা খুরশিদ আলম বলেন, “খবরে পড়লাম বাচ্চাদের খেলার জায়গা আছে। কিন্তু এখানে এসে অনেক খুঁজেও কিছু পাচ্ছি না।”
উদ্যানের এক কর্মী রনি বলেন, “বাচ্চাদের মাঠের জায়গা করা আছে। যারা ইজারা নেবে, তারা প্রয়োজন অনুসারে সব করে নেবে।”
স্থাপনাগুলো কবে নাগাদ চালু হবে- এ প্রশ্নে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যায়ামাগার, শিশুদের খেলার স্থান বা ক্যানটিন- ওগুলো আমাদের ‘অন প্রসেসে’ আছে। ওগুলো টেন্ডারে যাব তো, কন্ট্রাক্টে দিয়ে দেব আমরা। এটার জন্যই আমরা ওগুলো সব রেডি করছি।”
শৌচাগার চালু না হওয়ার বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বলেন, “লাল বিল্ডিংয়ে তো ওয়াশরুম আছে অলরেডি। আমরা যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করলাম, অনুষ্ঠানে তো ওয়াশরুম খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে ওইগুলো এখনও গণহারে চালু হয়নি।
“দুইয়েকটা কোম্পানি ইতোমধ্যে আমাদের সাথে কথা বলছে, বার্গেনিং (দরকষাকষি) হচ্ছে। আমরা যখন লিজ দেব, তখন ওইটা ঠিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। খুব শিগগিরই হস্তান্তর হয়ে যাবে। আর যদি তা নাও হয়, আমরা খাস কালেকশনের জন্য কোনো একটা গ্রুপকে দিয়ে দিতে পারি।”
ধূমপান, মাদক সেবন, আবর্জনা
উদ্যানের প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতা থাকলেও ভেতরে বিচ্ছিন্নভাবে অনেককে ধূমপান করতে দেখা গেছে। শিশুদের উদ্যানে নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা এতে অস্বস্তিতে পড়ার কথা বলছেন।
শিশু সন্তানকে বেড়াতে নিয়ে আসা ইমতিয়াজ রায়হান নামে একজন বলেন, “ঢাকা তো এমনিতেই বিষাক্ত জায়গা, এর মাঝে এখানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারব ভেবেছিলাম। কিন্তু এখানেও এসে দেখি প্রকাশ্যে লোকজন ধূমপান করছে। কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।”
ফুড কোর্ট ও লাইব্রেরির জন্য নির্মিত লাল রঙের ভবনের নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় এবং শুকনো লেকের নিচের অংশে বসে কয়েকজনকে মাদক সেবনও করতে দেখা গেছে।
সচিবালয়ের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে যুক্ত উদ্যানের ভেতরের লেকটির প্রায় পুরো অংশ পরিচ্ছন্ন দেখা গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনের অংশে প্লাস্টিক, সিগারেটের প্যাকেট ও চিপসের প্যাকেটসহ ময়লা-আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। যদিও তাদের অস্থায়ী কার্যালয়ের দুই পাশেই রয়েছে ডাস্টবিন।
লেকের ওই অংশে আবর্জনার বিষয়ে এনডিইর প্রজেক্ট ইনচার্জ শাহীন আলম বলেন, “আমাদের এখান থেকে ময়লা ফেলে না। এগুলো অন্যরা বাইরে থেকে ফেলে।”
তবে উদ্যানে দায়িত্বরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একজন বলেন, “ওরা (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) প্রতিদিনই ওই দিকে সকাল-বিকাল ময়লা ফালায়। আমরা কিছু বললে লাভ হবে না।”
বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আচ্ছা, দেখব ওটা। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আর নগর সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান বলেন, “এখন তো টাকা দিয়ে ঢুকতে হচ্ছে, রেস্ট্রিকশন হয়ে গেছে। বাইরের লোক তো ওভাবে ঢুকতে পারবে না। আর ভেতরে থাকা অস্থায়ী অফিসও আল্টিমেটলি থাকবে না।
“ওটা (এনডিই কার্যালয়ের সামনে লেকের অংশ) যদি অপরিষ্কার থাকে, আমি পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করছি। যাদেরই দায়িত্ব দেব, সব দায়দায়িত্ব তাদেরকেই দেব। আর মাদক সেবন করার বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখছি।”
ফটকের বাইরেও ময়লার স্তূপ, হকার ও ভবঘুরের উৎপাত
উদ্যানের ভেতরের অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাইরে চারপাশের ফুটপাতের পরিবেশ নিয়েও কথা বলছেন দর্শনার্থী ও পথচারীরা। তাদের অভিযোগ, ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও উদ্যানের আশপাশের ফুটপাতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। হকার আর ভবঘুরেদের কারণেও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
উদ্যানের পাশের এক দোকানকর্মী বলেন, “এখানে ফেললে ময়লার গাড়ি এসে নিয়ে যায়। আমরা এখানেই রাখি সবসময়।”
উদ্যানের ফটকের দুই পাশে ফুটপাতে হকাররা বসছেন। মনোয়ার খান নামে এক হকার বলেন, “এখানে আমি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করি। আগে চৌকি নিয়ে বসতাম। এখন তো খুব ধরপাকড়, তাই কাঁথা ঝুলাইয়া বসি।”
উদ্যানে আসা কাবেরী নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “ঢাকা শহরে যেখানে যাই, সেখানেই ভবঘুরের উৎপাত। অদ্ভুতভাবে তাকায়, হাসে, মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা কথাবার্তাও বলে।
“এই একটা জায়গা- ভাবলাম বিকালে সন্তান নিয়ে বেড়ানো যাবে। সেখানেও একই সমস্যা।”
ভবঘুরেদের উৎপাতের অভিযোগের ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “ভবঘুরের বিষয়টা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দেখে। আমরা বারবার সরিয়ে দিচ্ছি, আবার আসতেছে।
“তারপরেও আমরা তাদের (মন্ত্রণালয়) চিঠিও দিয়েছি, তারা হয়ত এগুলো দেখবে। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করা দরকার আমরা করছি।”
টিকেট বিক্রির হিসাবে ‘গড়মিল’
উদ্যানটিতে প্রবেশে তিনটি ফটক রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ সদরদপ্তর সংলগ্ন প্রধান ফটকটি এখনও বন্ধ। বাকি দুটি ফটক নগর ভবন সংলগ্ন ও জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন। এ দুটি ফটক দিয়ে দর্শনার্থীরা ভেতরে প্রবেশ করছেন।
জিরো পয়েন্ট ফটকের টিকেট বিক্রেতা মোহাম্মদ সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দুইটা গেইট। মিলিয়ে যদি হিসাব করা হয়, তাহলে দিনে মোটামুটি আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টিকেট তো বিক্রি হয়ই।”
১০ টাকার টিকেট দিনে আড়াই থেকে তিন হাজার বিক্রি হলে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় হওয়ার কথা। কিন্তু ডিএসসিসিতে হিসাব যাচ্ছে তিন থেকে চার হাজার টাকার, যা ২৫০ থেকে ৪০০ টিকেট বিক্রির অর্থ।
প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টিকেট বিক্রির তথ্য শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমার কাছে তো তথ্য আছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০। মানে ১০ টাকা করে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে আমাদের কাছে তথ্য আসছে। আমি বিষয়টা খতিয়ে দেখছি।”
‘উদ্যানও হয়নি পার্কও হয়নি, হয়েছে জগাখিচুড়ি’
সংস্কারের জন্য গাছ কেটে ও কংক্রিটের স্থাপনা বানিয়ে উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান।
প্রশাসক বলেন, “এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এখন যা আছে, এটাকে নিয়েই চলতে হবে। পিছিয়ে গেলে তো আর কিছু পাব না।”
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “এটা আগে যে উদ্যান ছিল, সেই উদ্যানের ক্যারেক্টারটা পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, উদ্যান বলতে যা বোঝায়। এটা একটা অ্যামিউজমেন্ট (বিনোদনমূলক) পার্কও হয় নাই, উদ্যানও হয় নাই; একটা জগাখিচুড়ি হয়েছে।
“এখন এই মুহূর্তে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটার যা-ই ফ্যাসিলিটি (সুযোগ-সুবিধা বা অবকাঠামো) করা হয়েছে, সেসব এখনও পুরোদমে চালু করতে পারেনি। এটার সামগ্রিক পরিবেশটাও এখনও নাগরিকদের যাওয়ার মতো আকর্ষণীয় না, এমনকি শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় উপাদানগুলোও এখনও যুক্ত করা হয়নি।”
উদ্যানে প্রবেশের টিকেটের বিষয়টির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এটা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থি। এখানে ১০ টাকা নেওয়ার যে ধারণাটা করপোরেশন ধারণ করে, এটা তো সাংঘাতিক একটা অন্যায়।
“যে শহরে আমাদের অ্যাক্সেসিবল পার্ক ও ওপেন স্পেস নাই, যে উদ্যানটা আগে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, সেখানে কেন আমাকে ১০ টাকা দিতে হবে? আমরা নাগরিকরা ট্যাক্সের টাকা দিয়েই তো রাষ্ট্রকে চালাতে দিই। সেই রাষ্ট্র কেন উদ্যান, যেটা আমার বেসিক অধিকার, সেই জায়গাতেও টাকা নিচ্ছে? সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সবুজায়নের ব্যবস্থা করা তার দায়িত্বের অংশ। টাকা নিলে তো এটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “এখন এটাতে যে পরিমাণ কংক্রিট, ইট বা অন্য কিছু তৈরি করা হয়েছে- এই কংক্রিটাইজেশন হওয়ার কারণে তো এটার মেইনটেন্যান্স কস্টও বেড়ে যাবে, করপোরেশনের ওপরে চাপও তৈরি হচ্ছে। ডিজাইনটা তো আসলে করপোরেশনকে ফাঁদে ফেলেছিল। করপোরেশনের উচিত এই পুরো পার্কটাকে সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়া।”
পার্ক উন্মুক্ত করে দিলে ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হবে- সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্যের ব্যাপারে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “রাষ্ট্র যদি একটা পার্কের ভেতরে নেশাখোরকে না সরাতে পারে, সেই রাষ্ট্রের কোনো সরকারের থাকার তো দরকার নেই। সারা পৃথিবীতেই তো নেশাখোর আছে। করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা বা প্রশাসকরা যদি নেশাখোরদের ম্যানেজ না করে পার্ক উন্মুক্ত না করতে পারেন, তাহলে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত।
“এ ধরনের খোঁড়া যুক্তি একবিংশ শতাব্দীতে চলে না। এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে, প্যাসিভ পুলিশিং থাকবে, তাদের কিছু কর্মচারী থাকবে, গাইডলাইন তৈরি ও লোকবল নিয়োগ করা- এগুলো তাদের দায়িত্ব। নজরদারি না দেওয়ার কারণেই তারা এই অচল যুক্তিগুলো বারবার নিয়ে আসে।”
উদ্যানের সব সুযোগ-সুবিধা দ্রুত চালু ও বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থার তাগিদ দিয়ে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “যেটা ড্যামেজ হয়েছে সেটা তো আর আনডু করা (আগের অবস্থায় ফেরানো) যাবে না। এখন করপোরেশনের উচিত যতটুকু যেটা আছে, যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে খুব দ্রুত সেসব ফ্যাসিলিটি চালু করা এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা।
“করপোরেশন কোনোভাবেই যেন অ্যাক্সেসিবিলিটি ডিনাই করার মতো স্পেস তৈরি না করে। তারা বারবার যে মডেলটা আনছে, এটা পরিত্যাজ্য মডেল। এটা আমাদের নাগরিক অধিকারের জায়গা, এটা টাকা দিয়ে বিচার করার কোনো সুযোগ নাই।”
