এমন দুর্বিষহ দিন আর আসেনি বমদের জীবনে

২০২২ সাল থেকে যা ঘটছে, তাতে উভয় সংকটে পড়ে গেছেন বমরা। একদিকে সন্তানদের রক্ষা, অন্যদিকে পাহাড়ে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

উসিথোয়াই মারমাবান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2023, 07:29 PM
Updated : 22 Nov 2023, 07:29 PM

পাহাড়ে বম সম্প্রদায়ের পাড়া আর ঘরগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যেত; বন-জঙ্গলের মধ্যেও প্রতিটি বাড়ির পরিচ্ছন্ন উঠোনজুড়ে থাকত সারি সারি ফুলের গাছ, থোকা থোকা ফুল।  

কিন্তু গত দুই বছরে সরল-সহজ আর পরিপাটি সেই জীবন উবে গেছে বমদের। অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার অভাব আর শঙ্কার মধ্যে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে এই নৃগোষ্ঠীর জীবন।

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা, ইসলামী জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আর ওই দুই দলকে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ঘটনাপ্রবাহে পাড়া ছেড়ে পালিয়েছে বহু বম পরিবার। তাদের সংখ্যা হাজারের বেশি।

বাস্তুচ্যুত সেই বমদের বাড়িঘর এখন ফুলের গাছের বদলে ভরে গেছে আগাছায়। যত্নের অভাবে ভেঙে পড়া বাঁশ-কাঠের ঘর এখন সাপের বসত। অনাবাদী রয়ে গেছে জুমের জমি।    

পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশ পর্বেও পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকেন্দ্রিক নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ঢেউ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মত বমদের জীবনেও এসেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নিজেদের জীবনধারা, মূল্যবোধ আর ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন এতদিন। 

কিন্তু ২০২২ সাল থেকে যা ঘটছে, তাতে উভয় সংকটে পড়ে গেছেন বমরা। একদিকে সন্তানদের রক্ষা, অন্যদিকে পাহাড়ে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এমন বিপর্যয় তাদের জীবনে আর কখনও আসেনি।

প্রকৃতিপূজারী থেকে খ্রিস্টধর্মে

বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি- এই চার উপজেলায় রয়েছে বম জনগোষ্ঠী। সবচেয়ে বেশি বম আছেন রুমা উপজেলায়। সেখানে তাদের সংখ্যা রয়েছে পাঁচ হাজার; বাকি তিন উপজেলা মিলে রয়েছে সাত হাজারের মত।

২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা পরিসংখ্যান বলছে, বমদের মোট জনসংখ্যা ১১ হাজার ৬৩৭ জন। তবে সামাজিক সংগঠন বম সোশাল কাউন্সিলের হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ হাজার বম রয়েছে।

১০০ বছর আগেও বমরা ছিল প্রকৃতিপূজারী। রেভারেন্ড এডউইন রোলেন্ডস নামের এক যাজক খ্রিষ্টের বাণী প্রচারে ১৯১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় নোয়াপতং ইউনিয়নের ভাইরেল তে গ্রামে আসেন। তার হাত ধরেই বমরা খ্রিষ্টধর্মের দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন।

সেই ঘটনার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নেয় বমরা। কিন্তু তখন নির্বাচনী ডামাডোলে অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হয়।  

পরে ২০১৯ সালে ১৮ জানুয়ারি রুমা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসে তিন দিনের শতবর্ষপূর্তি উৎসব। দেশি-বিদেশি অতিথিদের অংশগ্রহণে ‘বমরাম গসপেল সেন্টিনারি’ নামে ওই উৎসব উদযাপিত হয়। সেখানে বমরা খ্রিষ্টধর্মের প্রার্থনা করলেও নাচে-গানে তুলে ধরে প্রকৃতির প্রতি নিজেদের ভালবাসার ইতিহাস-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য।

সংকটের শুরু যেখানে

নৃগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে রাজনৈতিক সংকটের শুরু সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। ধীরে ধীরে তা একপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় আড়াই দশকের এই সংঘর্ষে বারবার পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে রক্ত আর হিংসার ধারা।      

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সরকারের করা পার্বত্য শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে সহিংসতার অবসান ঘটবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিলেন পাহাড়ের ১৩টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরের আড়াই দশকে তা হয়নি। নানা সমীকরণ ও বিভেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সহিংসতায় বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে পাহাড়; ঝরেছে অজস্র প্রাণ।  

আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক বিভেদ ও হানাহানির মধ্যেই ২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা যায়। কেএনএফের ফেইসবুক পাতার বক্তব্য অনুযায়ী, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে স্বশাসিত একটি পৃথক রাজ্য চায়। রাজ্যটি হবে বাংলাদেশের অধীনে, তবে স্বায়ত্তশাসিত।

কল্পিত ‘কুকি-চিন রাজ্য’র মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্বাংশের রাঙামাটি জেলার সাজেক উপত্যকা বাঘাইছড়ি থেকে শুরু করে বরকল, জুরাইছড়ি, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি এবং বান্দরবানের উপকণ্ঠ থেকে চিম্বুক পাহাড় হয়ে রুমা, থানছি, লামা ও আলিকদমসহ নয়টি উপজেলা রাখা হয়েছে।

বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, খুমি ও ম্রোদের নিয়ে এ সংগঠন গঠনের কথা বলা হলেও সেখানে কর্তৃত্বের কারণে সংগঠনটি পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়।

সংগঠনটির প্রধান হিসেবে নাথান বমের নাম আসে নানাভাবে। পুরো নাম নাথান লনচেও বম। বান্দরবানের রুমা উপজেলার এডেন পাড়ায় তার বাড়ি। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে। ছাত্রজীবনে জনসংহতি সমিতি সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদে যুক্ত ছিলেন।

২০২২ সালের অক্টোবর মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, ‘বম পার্টি’ অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের গহীন পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

এরপর জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় অভিযান চালায় র‌্যাব ও সেনা সদস্যদের যৌথ বাহিনী। অভিযান চালানো হয় থানচিত উপজেলাতেও। তখন একে একে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে পর্যটন জেলা বান্দরবানের সব উপজেলা।

অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সদস্য। সংঘাতে প্রাণ গেছে কেএনএফ সদস্যদেরও। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে বান্দরবানের রোয়াংছড়ির খামতাং পাড়ায়। পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, সেখানে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল ‘দুটি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলিতে’ আটজন নিহত হন। তারা সবাই বম জনগোষ্ঠীর।

কত লোক বাস্তুচ্যুত

সংঘাতের ভয় ও আতঙ্কে বম জনগোষ্ঠীর শত শত মানুষ সে সময় পালিয়ে যায় ভারতের মিজোরাম রাজ্যে। পরে তাদের একটি অংশ ফিরে এলেও অধিকাংশই এখনও মিজোরাম রাজ্যে রয়েছে বলে সামাজিক সংগঠন বম সোশাল কাউন্সিলের ভাষ্য। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

কাউন্সিলের সভাপতি জারলমজার বম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত বছর অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ১২০০ জনের মত বম ভারতের মিজোরাম রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে। তারা মূলত মিজোরামের লংত্লাই জেলার মংবুক, চান্দু প্রজেক্ট এবং পারভা-৩ এলাকায় রয়েছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের চিন রাজ্যেও কিছু বম পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সেখান থেকে একজন বম ২৩ জুন ফোন করে জানায়, মিয়ানমারের চিন রাজ্যের সামং এলাকায় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ৭০টি বম পরিবার রয়েছে। তারা বলেছেন, পরিস্থিতি ভালো হলে এখানে চলে আসবেন।

তবে বম সোশাল কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার হিসাবে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া বমরা ভারতের মিজোরাম রাজ্যে ১৫টি গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ১৫টি গ্রাম মিলে মোট দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ হবে। তার মধ্যে নিবন্ধনকৃত ছয়-সাতটি গ্রামের হিসাব পাওয়া গেছে। এই ছয়-সাতটা গ্রামের ৭০০ জনের মত থাকতে পারে।

“সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়ার কারণ হচ্ছে, কয়েকদিন পরপর নতুন পরিবার চলে আসে। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা সুযোগ পেলে এখনই চলে আসতে চান। কারণ তাদের সংসার, ঘরবাড়ি এবং জীবনযাপন সবকিছু এখানেই।

“সেখানে শুধু বিপদে পড়ে আশ্রয় নিয়ে থাকা। কিন্তু টানা কয়েক বছর মিজোরামে থাকলে সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলে নতুন প্রজন্ম আর ফিরতে চাইবে না।”

বান্দরবান শহরে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত এক বম সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দুর্গম পাহাড়ের বিভিন্ন পাড়া থেকে যারা পালিয়ে গেছেন, তারা সবাই মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছেন এমন নয়। অনেকে বান্দরবান শহরের আশপাশে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও আশ্রয় নিয়েছেন।

“আবার কিছু লোক পাড়ায় ফিরেছে, যদিও তাদের সংখ্যা খুব বেশি না। পরিস্থিতির কারণে কেউ চলে যাচ্ছে আবার কেউ ঘরে ফিরছে- এরকম অবস্থায় পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার সংখ্যা আসলে একই রকম থাকছে না।”

পালিয়ে আসা বমরা যা বলছেন

পালিয়ে এসে যারা শহরের আশপাশে বমপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় সম্প্রতি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর কেউ নিজের নাম ও পাড়ার নাম বলতে রাজি হননি। তবে কী দুর্দশার মধ্যে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন, সেই পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন তারা।

তারা বলছেন, মোট ১৯টি পাড়া থেকে বমরা চলে গেছেন বলে তারা জানেন। তার মধ্যে সাতটি পাড়া প্রায় জনশূন্য।

এর মধ্যে রুমা রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের থিংদলতে পাড়ার ৪০ পরিবার, লংমুয়াল পাড়ার ১৬ পরিবার, স্লৌপি পাড়ার ৫০ পরিবার, তামলৌ পাড়ার ৩৭ পরিবার, চইক্ষ্যং পাড়ার ৭০ পরিবার, ফাইনুয়াম পাড়ার ১৫ পরিবার এবং থানচির প্রাতাপাড়ার ২২ পরিবার পাড়া ছেড়েছে।

এ ছাড়া থানচির বাকত্লাই পাড়া থেকে ৪০ পরিবারে মধ্যে ৩৪ পরিবার, সিংত্লাংপি পাড়ায় ২২ পরিবারে মধ্যে ১৫ পরিবার, আর্থার পাড়া ৬০ পরিবারের মধ্যে ৪০ পরিবার, বাসত্লাং পাড়ার ৪০ পরিবারে মধ্যে ৩০ পরিবার, মুয়ালপি পাড়ার ১০০ পরিবারের মধ্যে ৬০ পরিবার, রুমানা পাড়ার ৪২ পরিবারের মধ্যে ১২ পরিবার, সুংসং পাড়ার ১২০ পরিবারের মধ্যে ৫০ পরিবার, থাইক্ষ্যং পাড়ার ৬০ পরিবারের মধ্যে ৩০ পরিবার, থাংদোওয়াই পাড়ার ২০ পরিবারের মধ্যে ১০ পরিবার, জাদিপাই পাড়ার ৩৫ পরিবারের মধ্যে ১৫ পরিবার; রোয়াংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের পাইক্ষ্যং পাড়ার ৯৩ পরিবারের মধ্যে ৮০ পরিবার; রামথার পাড়া থেকে ২২ পরিবারের মধ্যে ১২ পরিবার, সিপ্পি পাড়ার ১১ পরিবার, সাইজাম পাড়ার ২০ পরিবার, বিলছড়ির ২০ পরিবার চলে যায়।

বান্দরবান শহরের কাছে আশ্রয় নেওয়া বমরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া জুমথাং বম নামের ৭২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে ২৯ জুলাই মিজোরামে মারা যান।

এ ছাড়া পালিয়ে যাওয়ার সময় না খেতে পেয়ে চলতি বছর জানুয়ারি মাসে সংকুপ বম নামে চাইক্ষ্যং পাড়ার একজনের মৃত্যু হয়, যিনি খ্রিষ্টান পাস্তর ছিলেন।

ফিরেছে ৭১ পরিবার

কেএনএফ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের জেরে ভয়ে পালিয়ে যাওয়া বমদের মধ্যে ৭১টি পরিবারের ফিরে আসার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। 

এর মধ্যে রোয়াংছড়ি উপজেলার পাইক্ষ্যং পাড়ার ৫৭ পরিবারের ২০০ জন, দুর্নিবার পাড়ার ২৭ জন, ক্যপ্লাং পাড়ার ১৭ জন এবং থানচির প্রাতাপাড়ার ১৪ পরিবারের ৪৯ জন সেনাবাহিনী এবং বম সোশাল কাউন্সিলের সহযোগিতায় তাদের ঘরবাড়িতে ফিরেছেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে থাকা পাড়াবাসীদের ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বম সোশাল কাউন্সিল।

সোমবার রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে পাইক্ষ্যং পাড়ায় সেনবাহিনীর বান্দরবান সদর জোনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও শুষ্ক খাবার বিতরণের পাশাপাশি ফিরে আসা পরিবারের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়। পাড়াবাসীদের ভয়ভীতি না পেয়ে আগের মত বসবাস করার জন্য আহ্বান জানানো হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে।

সোমবার সকালে পাইক্ষ্যং পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সাত মাস অন্যত্র পালিয়ে থাকার পর নিজ পাড়ায় ফিরতে পেরে সবার মধ্যে আনন্দের হাসি ফুটেছে। শিশুদের দুরন্তপনায় আবারও সরব হয়ে উঠেছে পাড়া। খুলেছে পাড়ায় সরকারি স্কুলও।

তবে যারা ফিরতে পারেননি, তাদের ঘর, উঠানে ঘাস আর লতাগুল্মে ঢেকে গেছে। কোনো কোনো কাঠের ঘরের বারান্দায় এখনও এলোমেলো পড়ে আছে ঘরের জিনিসপত্র। পাড়ার প্রবেশমুখে চলাচলের রাস্তাও বুনো লতাপতায় ছেয়ে গেছে।

পাইক্ষ্যং মৌজার হেডম্যান ও পাড়ার বাসিন্দা বৈথাং বম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ পাড়ায় মোট ৯৩টি পরিবার ছিল। এপ্রিল মাসে তিনজন খুন হওয়ার পর যে যার মত করে পাড়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ বান্দরবান শহরে, কেউ রোয়াংছড়ি সদরে, কেউ রুমায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে যায়। কেউ কেউ জঙ্গলে চলে যায়।

“আমি নিজেও পরিবারসহ রোয়াংছড়ি বম হোস্টেলে আশ্রয় নিয়েছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও পাড়ায় এখনও উঠিনি। এখনও ২৫টির মত পরিবার পাড়ায় ফেরেনি। তারা কোথায় গেছে খবর নেওয়া হচ্ছে।

পাইক্ষ্যং মৌজার হেডম্যান বলেন, পালিয়ে যায়নি- এরকম কিছু পরিবারও পাড়ায় ছিল। কিন্তু কারও ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই। পাড়ার মাত্র নয়-দশ পরিবার জুমচাষ করতে পেরেছে। তারাও পালিয়ে থাকায় যত্ন নিতে না পারায় ধান ঠিক মত পায়নি।

“কেউ ২০ হাঁড়ি, কেউ ৩০ হাঁড়ি জুমধান ঘরে তুলতে পেরেছে। সেগুলো সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খায়। বাইরের আত্মীয়স্বজন কিছু পরিবার ফিরে আসছে শুনে কিছু চাল এবং খাবার দিয়ে গেছে।”

বৈথাং বম বলেন, “আমার মৌজায় মোট ১২টি পাড়া রয়েছে। তার মধ্যে চারটি বমপাড়া। সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে পাইক্ষ্যং পাড়া এবং খামতাং খিয়াং পাড়ার। অনেক পরিবার পাড়ায় ফিরলেও আবার কখন কী হয় এটা নিয়ে সবার মধ্যে চাপা আতঙ্ক কাজ করছে।”

পালাতে পারেননি অন্তঃসত্ত্বা জিংপা বম

জিংপা বম নামে এক প্রসূতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এপ্রিল মাসে সবাই পালিয়ে গেলেও তার পরিবার কোথাও যেতে পারেনি।

“আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। অক্টোবর মাসে সন্তান হয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু আত্মীয়-স্বজন জঙ্গল থেকে এসে আমাকে সেবা করত।”

পাড়ায় ফিরে আসা পারভিময় বম নামের এক নারী বলেন, আট মাস আগে পাড়ার তিনজন খুন হওয়ার পর ভয়ে তারা ১০-১৫টি পরিবার একসঙ্গে জঙ্গলে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে দুটি সন্তান ছিল। তারা হাঁটতে না পারায় বেশি দূর যেতে পারেননি তারা।

“আশপাশে জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলাম। পালানোর সময় ধান-চাল নিয়ে গেছি। খাবার ফুরিয়ে গেলে রাতের অন্ধকারে পাড়ায় এসে ধান-চাল নিয়ে যেতাম। এভাবে জঙ্গলে কয়েক মাস ছিলাম আমরা।,

পাড়ার কারবারী (পাড়াপ্রধান) পিটার বম বলেন, “ভয়ে সবাই যে যার মত পালিয়ে ছিল। সবার সহযোগিতায় আমরা আবার একত্রিত হতে পারছি। দীর্ঘ আট মাস পর ৫৭ পরিবার পাড়ায় ফিরে আসতে পেরেছে।

“সবাই খুবই খুশি। কিন্তু কিছু জিনিস খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। খাবার সংকট রয়েছে। ঘরে সোলার প্যানেলগুলো সব নষ্ট হয়েছে। খাবার প্লেট, মোম, কেরোসিন, খাবার এগুলো জরুরি দরকার।”

শান্তি ফিরবে?

সংঘাতের মধ্যেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ৩০ মে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি করা হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। পরে জুন মাসে শেষ সপ্তাহে জেলা পরিষদের সভা কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় কমিটির গঠন ও উদ্দেশ্য।

১৮ সদস্যের এই শান্তি প্রতিষ্ঠার কমিটি আহ্বায়ক বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ক্য শৈ হ্লা মারমা এবং সদস্যসচিব বম সোশাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজারলম বম। জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যাকে কমিটির মুখপাত্র হিসাবে রাখা হয়েছে। কমিটিতে সরকারি কোনো কর্মকর্তাকে রাখা হয়নি।

কমিটি অনলাইনে ৫ নভেম্বর কেএনএফের সদস্যের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে এবং সেখানে প্রথমবারের মত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

আগামী ডিসেম্বরে আরেকটি সরাসরি বৈঠকের ব্যাপারে একমত হয়েছে দুইপক্ষ। শান্তি কমিটি পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সঙ্গেও বৈঠক করেছে; তাদের মতামত শুনতে চেয়েছে। 

এরকম একটি বৈঠকে বম ছাত্র সংগঠনের সভাপতি লাল ঙাক বম বলেছিলেন, “দশ হাজারের কিছু বেশি সদস্যের একটি জনগোষ্ঠীর কিছু যুবক কেন অস্ত্র হাতে তুলে নিল এটা খুঁজতে হবে। যারা বিপথে রয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আগেও ছিল; এখনও চলমান রয়েছে। তবে অনেকেই বম জনগোষ্ঠীর সবাইকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করছে।

“কুকি-চিন সদস্যরা বম জনগোষ্ঠীর হলেও এতে বমরা সবাই জড়িত নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে কথা বলা সবাই অনিরাপদবোধ মনে করে। তবে শুধু কুকি-চিন নয়, আরও বিভিন্ন সশস্ত্র দল রয়েছে। এগুলোর ব্যাপারেও সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।”

৫ নভেম্বর রুমায় কেএনএফ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির মধ্যে পাঁচটি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়; তার ধারাবাহিকতায় পালিয়ে যাওয়া বম পরিবারগুলো ফিরে আসতে শুরু করে বলে জানান শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সদস্যসচিব ও বম সোশাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজারলম বম।

তিনি বলেন, “দীর্ঘ আট মাস ধরে পাইক্ষ্যং পাড়াবাসীদের সঙ্গে কারো কোনো যোগাযোগ ছিল না। ভয়ে কেউ জঙ্গলে পালিয়েছিল, কেউ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এখন তারা ফিরে আসছে। সবাই আনন্দিত। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দিনগুলো আমরা আগের মতই সহাবস্থান করতে পারব।”

যারা বাড়িঘরে ফিরে এসেছে তাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র মুখপাত্র ও জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “যারা ফিরে আসছে তাদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য চাল, ডাল, খাবারসহ তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় জিনিস তালিকা করা হচ্ছে। নগদ অর্থও দেওয়া হবে। হুট করে তো দেওয়া যায় না।

“তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তালিকাকরণের মাধ্যমে জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এগুলো দেওয়া হবে। আর নগদ অর্থ যেটা দেওয়া হবে সেখান থেকে তারা ঘর মেরামত করবে। এখন যেহেতু শীতকাল কম্বলও বিতরণ করা হবে।”

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন ও ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সঙ্গে জেলা পরিষদের একটা মিটিং হয়েছে। যেসব বম পরিবার ফিরে আসছে তাদেরকে খাবার ও ঘর মেরামতের বিষয়গুলো জেলা পরিষদ দেখবে।

“তাদের কর্মপদ্ধতির জন্য পেতে একটু সময় লাগতে পারে। এই সময়টুকুর মধ্যে সেনাবাহিনী নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন সহায়তা দিতে শুরু করেছে। থানচি প্রাতা পাড়াতেও আমরা একই রকম সহযোগিতা চাল, ডাল, খাবার দিয়েছি। জরুরি প্রয়োজনীয় যেগুলো দরকার হয় সেগুলো জেলা পরিষদ দেওয়া আগ পর্যন্ত আমাদের মত করে দিতে থাকব।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম চাই। যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান নিয়ে বসবাস করবে।” 

আরও পড়ুন

Also Read: এবার সরকারি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘বম পার্টি’র সঙ্গে বৈঠক

Also Read: এবার ‘বম পার্টি’র সঙ্গে সরাসরি সংলাপের প্রস্তাব

Also Read: ‘সংলাপ চলাকালে সংঘাত চায় না বম পার্টি, পর্যটন নিয়ে আপত্তি’

Also Read: ‘সব পক্ষের ইতিবাচক সাড়া’ পেয়েছে বান্দরবানে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি

Also Read: বান্দরবানে ‘শান্তি ও স্থিতিশীল’ পরিবেশ ফেরানোর উদ্যোগ

Also Read: শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে সহিংসতায় যাবে না সেনাবাহিনী, বান্দরবানে সেনাপ্রধান

Also Read: নতুন জঙ্গি দলের ‘পাহাড়ি যোগ’ পেয়েছে র‌্যাব

Also Read: জঙ্গি আর পাহাড়ি দলের মিলে যাওয়ার বিপদ যেখানে

Also Read: পাহাড়ে সশস্ত্র দল; এই ‘বম পার্টি’ কারা?

Also Read: বান্দরবানে পানি-স্যালাইন বিতরণে গিয়ে বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: কেএনএফ ক্যাম্পে অভিযানের সময় বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: বান্দরবানে সেনা টহলে ফের বম পার্টির হামলা, দুই সৈনিক নিহত

Also Read: দুর্গম পাহাড়ে ‘বম পার্টি’র গুলিতে সেনাসদস্য নিহত