কুমিল্লা উপনির্বাচন: মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন বাহারকন্যা সূচনা

নির্বাচনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার।

কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2024, 05:31 PM
Updated : 8 Feb 2024, 05:31 PM

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের মেয়ে প্রার্থী হচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের জরুরি বর্ধিত সভা থেকে বাহার-কন্যা তাহসীন বাহার সূচনার নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমীর অডিটোরিয়ামে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহাউদ্দিন বাহারের সভাপতিত্বে ওই সভায় সূচনাও উপস্থিত ছিলেন। ভোটে লড়তে আগ্রহ প্রকাশ করা বেশ কয়েকজন নেতা নিজেদের সরিয়ে নিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সূচনাকে সমর্থন দেন বলে জানা গেছে।

নাম ঘোষণার পর তাহসিন বাহার সূচনা বলেন, “আমি আবেগাপ্লুত। আমি সামনের পথচলায় সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা চাই। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করতে হবে। তাহলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। বাবার মতই আমি সবার পাশে থাকতে চাই।”

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ‘কেন্দ্রে ভোটারদের টানতে এবং দলীয় বিভেদ দূর করতে’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনে কাউকে দলীয় প্রতীক না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এই অবস্থায় দ্বিধা-বিভক্ত কুমিল্লা আওয়ামী লীগে মেয়র পদের উপনির্বাচনে কারা কারা প্রার্থী হচ্ছেন এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আলোচনা চলছিল। তখন থেকে বিভিন্ন পক্ষের প্রায় আধা ডজন নির্বাচন প্রত্যাশী নেতার সঙ্গে সূচনার নামও আলোচনায় ছিল। কিন্তু এ নিয়ে বাহারের অনুসারী কোনো নেতাই মুখ খুলছিলেন না।   

অবশেষে বর্ধিত সভার মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারীরা তাদের সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেন।

তবে নির্বাচন ও মেয়র পদের প্রার্থিতা নিয়ে ‘বাহার-বিরোধী’ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে এখনও সুষ্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি।   

যদিও এ নির্বাচনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। দলের মতের বাইরে বিগত নির্বাচনে এসে দুজনই পদ-পদবী হারিয়েছিলেন।

২০২২ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুল হক সাক্কুর চেয়ে তিনি মাত্র ৩৪৩ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। রিফাত ছিলেন কুমিল্লা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়র।

ওই বছরের ৭ জুলাই তিনি মেয়রের দায়িত্ব নেন। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রিফাতের মৃত্যুতে ১৮ ডিসেম্বর মেয়রের পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।  

কুমিল্লা সিটির উপ নির্বাচন

  • মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি

  • মনোনয়নপত্র বাছাই ১৫ ফেব্রুয়ারি

  • আপিলের সময়সীমা ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি; আপিল নিষ্পত্তি ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি

  • প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২২ ফেব্রুয়ারি

  • প্রতীক বরাদ্দ ২৩ ফেব্রুয়ারি

  • ৯ মার্চ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইভিএমে হবে ভোটগ্রহণ

  • ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০; তাদের মধ্যে নারী ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২, পুরুষ ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬, আর হিজড়া ভোটার ২ জন

  • প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দার এই নগরীতে ওয়ার্ড মোট ২৭টি

  • গত নির্বাচনে ১০৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করেছিল নির্বাচন কমিশন

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, কুমিল্লা সিটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। আরেকটি পক্ষের নেতারা ‘বাহার-বিরোধী’ হিসেবেই পরিচিত।

বিরোধীদের মধ্যে সংসদ সদস্য বাহারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কুমিল্লার বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আফজল খানের পরিবারও রয়েছে। এখন তার মেয়ে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা অনুসারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

Also Read: কুমিল্লা সিটি উপনির্বাচন: সাক্কু-কায়সার ভোটের মাঠে

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে নিজেদের পক্ষের মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে জরুরি বর্ধিত সভা ডাকেন সংসদ সদস্য বাহার। সভায় অংশগ্রহণের জন্য চিঠি দিয়ে দাওয়াত দেওয়া হয় মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটির নেতাকর্মীদের।

সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে মহানগর আওয়ামী লীগের সভা চলছে। বাইরে দলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। তারা কে প্রার্থী হবেন তাই নিয়ে আলোচনা করছিলেন। পরে প্রার্থী ঘোষণার পর নেতারা একে একে মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে আসেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সভা শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে।

একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সভার শেষ পর্যায়ে এসে সভাপতি সংসদ সদস্য বাহার উপস্থিত নেতাদের কাছে জানতে চান কারা কারা মেয়র পদে প্রার্থী হতে চান, তারা যেন হাত তোলেন।

প্রথমে হাত তোলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা শ্যামল ভট্টাচার্য। এরপর দাঁড়ান কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও কুমিল্লার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. জহিরুল ইসলাম সেলিম।

প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, তিনি এখানে সমর্থন পেলেও ‘হাউস চাইলে’ তাহসীন বাহার সূচনাকে সমর্থন দেবেন। এ সময় সূচনাকে তিনি ‘ভাতিজি’ বলে সম্বোধন করেন।

তখন উপস্থিত নেতারা সূচনার নামে স্লোগান দিতে শুরু করেন।

তারপরই প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করা শ্যামল ভট্টাচার্যও তাহসীন বাহার সূচনাকে সমর্থন দিয়ে একত্রে কাজ করার ঘোষণা দেন।

সবশেষ সভাপতি ও সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহার উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “আমি আজকে খুবই আনন্দিত। কারণ আমার মেয়ে তার চাচাদের মন জয় করতে পেরেছে। সে তার বড় ভাইদের মন জয় করতে পেরেছে। আমি বিশ্বাস করি, তাহসীন বাহার সূচনা তার ছোট ভাইদের নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমাদের দলকে এগিয়ে নেবে।

“আমার মেয়ে হিসেবে তার কথা বলছি না। তার ধমনিতে আমার রক্ত আছে, তাই আমি বিশ্বাস করি, সে আমার মতই জনগণের জন্য কাজ করতে পারবে। কুমিল্লা সিটিকে একটি আধুনিক সিটি হিসেবে গড়ে তুলবে সে”, বলেন বাহার।

পরে তাহসীন বাহার সূচনা বলেন, “আধুনিক কুমিল্লা সিটি করপোরেশন গড়তে নগরবাসীকে  সঙ্গে নিয়ে কাজ করবো। কুমিল্লার মানুষ আমাদের প্রতি সব সময় আস্থা রেখেছে, এবারও রাখবেন।

“গত দুই নির্বাচনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করেছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের হয়ে কাজ করছি সব সময়। নেতাকর্মীদের আরও কাছে যেতে চাই আমি। অনেক প্রবীণ নেতা আছেন, যারা আমার বাবার সঙ্গে রাজনীতি করেন। তারা সবাই আমাকে সমর্থন দিয়ে কৃতজ্ঞ করেছেন”, বলেন সূচনা।

এদিকে মেয়র পদে উপপনির্বাচনে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি নুর-উর রহমান মাহমুদ তানিম। তিনি কুমিল্লার রাজনীতিতে ‘বাহার-বিরোধী’ হিসেবে পরিচিত।

বৃহস্পতিবার রাতে নুর-উর রহমান মাহমুদ তানিম বলেন, “আমার এবং আমার কর্মীদের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকব ইনশা-আল্লাহ।”