কুমিল্লা সিটি উপনির্বাচন: সাক্কু-কায়সার ভোটের মাঠে

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আধা ডজন নেতা প্রার্থী হতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন; তারা মাঠ গোছানোর কাজও শুরু করেছেন।

আবদুর রহমান কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Jan 2024, 07:32 AM
Updated : 29 Jan 2024, 07:32 AM

দ্বাদশ সংসদের ভোটের রেশ না কাটতেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। 

সিটি নির্বাচনের দেড় বছরের মাথায় এই উপনির্বাচনে এরই মধ্যে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। 

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আধা ডজন নেতা প্রার্থী হতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা এরই মধ্যে মাঠ গোছানোর কাজ শুরু করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কারা ভোটের লড়াইয়ে থাকবেন, তা চূড়ান্ত হয়নি এখনও। 

আওয়ামী লীগ এবার সিটি করপোরেশনের ভোটে নৌকা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচন এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকেই দলীয় প্রার্থীদের প্রতীক দেবে না ক্ষমতাসীন দলটি। 

স্থানীয় সংসদ নির্বাচনে ‘বিভেদ এড়াতে এবং ভোটকে উৎসবমুখর করতে’ দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন না দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলটির।

২০২২ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুল হক সাক্কুর চেয়ে তিনি মাত্র ৩৪৩ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। রিফাত ছিলেন কুমিল্লা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়র। 

ওই বছরের ৭ জুলাই তিনি মেয়রের দায়িত্ব নেন। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রিফাতের মৃত্যুতে ১৮ ডিসেম্বর মেয়রের পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।  

কুমিল্লা সিটির উপ নির্বাচন

  • মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি

  • মনোনয়নপত্র বাছাই ১৫ ফেব্রুয়ারি

  • আপিলের সময়সীমা ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি; আপিল নিষ্পত্তি ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি

  • প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২২ ফেব্রুয়ারি

  • প্রতীক বরাদ্দ ২৩ ফেব্রুয়ারি

  • ৯ মার্চ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইভিএমে হবে ভোটগ্রহণ

  • ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০; তাদের মধ্যে নারী ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২, পুরুষ ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬, আর হিজড়া ভোটার ২ জন

  • প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দার এই নগরীতে ওয়ার্ড মোট ২৭টি

  • গত নির্বাচনে ১০৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করেছিল নির্বাচন কমিশন

২০০৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে মনিরুল হক সাক্কু বিলুপ্ত কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র ছিলেন। ২০১২ সালে কুমিল্লা সিটির করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে নাগরিক সমাজের ব্যানারে দাঁড়িয়ে নগরপিতা নির্বাচিত হন সাক্কু। সেবার তিনি আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আফজল খানকে হারান। 

২০১৭ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন সাক্কু।

তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। সেবার নিজাম উদ্দিন কায়সার প্রথমবার নির্বাচন করে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। 

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বিগত নির্বাচনে মেয়র পদে স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার প্রার্থী হওয়ায় সাক্কুকে হার মানতে হয়েছে। কারণ দুজনই ‘বিএনপি-ঘরানার’ মানুষ, তাতে ভোট ভাগ হয়ে গেছে। নির্বাচনে এসে দলীয় পদও হারাতে হয়েছে তাদের।

সেই নির্বাচনে সাবেক মেয়র সাক্কু টেবিল ঘড়ি প্রতীকে পেয়েছিলেন ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। আর তৃতীয় স্থানে থাকা নিজাম উদ্দিন কায়সার ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছিলেন ২৯ হাজার ৯৯ ভোট।

আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত বিজয়ী হলেও সেবার বিএনপির বহিষ্কৃত দুই নেতার মোট ভোট (৭৯,০৬৬) নৌকার চেয়ে ২৮ হাজার ৭৫৬টি বেশি ছিল। 

এবারও এই দুই নেতা ভোটের মাঠে থাকার কথা বলেছেন। অনুসারীদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করছেন দুজনই। 

সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, “আমি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার জন্য নির্বাচন করতে চাই। 

“তারপরও দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত জানাব। আমি বহিষ্কৃত হলেও দলের অনুগত আছি। সব সময় দলের পাশে আছি।” 

নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, “তরুণ প্রজন্মসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আমার সঙ্গে আছেন। প্রতিনিয়ত আমাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছেন। গত নির্বাচনে অংশ নিয়ে নগরবাসীর বিপুল সমর্থন পেয়েছি। তাই উপনির্বাচনে আমি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি আমার রয়েছে।” 

এদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ করতে ব্যস্ত।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, কুমিল্লা সিটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। আরেকটি পক্ষের নেতারা ‘বাহার-বিরোধী’ হিসেবেই পরিচিত।

বিরোধীদের মধ্যে সংসদ সদস্য বাহারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কুমিল্লার বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আফজল খানের পরিবারও রয়েছে। এখন তার মেয়ে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা অনুসারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বাহারের অনুসারীদের মধ্যে মেয়র পদে মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. জহিরুল ইসলাম সেলিম, মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খোকনসহ কয়েকজন প্রার্থী হতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

এ ছাড়া সংসদ সদস্য বাহারের মেয়ে এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাহসীন বাহার সূচনাও প্রার্থী হতে পারেন বলে জোর আলোচনা আছে। 

অপরদিকে আঞ্জুম সুলতানা সীমা, মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি নুর-উর রহমান মাহমুদ তানিম, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটির সদস্য এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মিঠু প্রার্থী হতে প্রচার চালাচ্ছেন। 

এর বাইরে আওয়ামী লীগের আরও অন্তত আধা ডজন নেতা মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেন বলে ভোটাররা আলোচনা করছেন।  

কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খোকন বলেন, “মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে হবেন, সেটা দলীয় সভায় সিদ্ধান্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমরা সবাই সেভাবে কাজ করব। এর বেশি কিছু এখন বলতে পারব না।” 

কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নুর-উর রহমান মাহমুদ তানিম বলেন, “দলীয় নেত্রীর কাছে মনোনয়ন ও সমর্থন চাইবো। আশা করছি, তিনি আমাকে নিরাশ করবেন না।”