অথচ মাকে কথা দিয়েছিলেন ফিরোজ, নিজেকে শেষ করে দেবেন না

চিরকুটে লেখা ছিল: “স্যরি মা, তোমাকে দিয়ে আসা কথা রাখতে পারলাম না। আমার জীবন নিয়ে আমি হতাশ।”

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Feb 2024, 05:34 PM
Updated : 14 Feb 2024, 05:34 PM

ফিরোজ কাজীর ডেঙ্গু হয়েছিল; গোপালগঞ্জ সদরের গ্রামের বাড়িতে থেকে চিকিৎসা শেষে শনিবার ফিরেছিলেন ঢাকায়। প্রেমঘটিত কারণে হতাশায় ভোগা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র ফেরার আগে মাকে কথা দিয়েছিলেন, ‘আত্মহত্যা’র মত কিছু কখনো মাথায় আনবেন না। কিন্তু মাকে দেওয়া সেই কথা রাখতে পারেননি ২২ বছরের এই তরুণ।

মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের ছয়তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে ‘আত্মহত্যা’ করেন ফিরোজ। জিয়াউর রহমান হলের ২০৩ নম্বর কক্ষের এই আবাসিক ছাত্রের ঘরে পাওয়া যায় একটি চিরকুট।

সেখানে লেখা ছিল: “স্যরি মা, তোমাকে দিয়ে আসা কথা রাখতে পারলাম না। আমার জীবন নিয়ে আমি হতাশ।”

ছেলের এমন মৃত্যুতে শোকে কাতর মা, দিনমজুর বাবা চুন্নু কাজী নির্বাক।

ফিরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষেরর ছাত্র ছিলেন। বুধবার বিকালে গোপালগঞ্জ সদরের পুখুরিয়ায় ফিরোজের বাড়িতে তার মরদেহ নিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ ৬৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।

লাশ পৌঁছানোর পর শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক গল্পের। কান্নায় ভেঙে পড়েন সহপাঠী-স্বজনসহ এলাকাবাসী। বাদ আছর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ফিরোজকে।

ফিরোজের বাবা চুন্নু কাজী এলাকায় কৃষিকাজ ও দিনমজুরি করে তিন সন্তানের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে ফিরোজ ছিল দ্বিতীয়।

গ্রামের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গোপালগঞ্জ শহরের একটি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ২০১৯-২০ বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন ফিরোজ।

ছেলেকে হারিয়ে শোকাহত ফিরোজের মা বলেন, “আমার ছাওলডা কাল রাত ৯টার সময় ফোন দিয়েছিল। আমাকে ফোন দিয়ে বলে, মা আমি ভালো আছি। তুমি আমারে নিয়া চিন্তা কইরো না। আমি এখানে খুব ভালো আছি।

“এইডাই আমার বাবার সাথে আমার শেষ কথা হইছে। আমার বাবা আমারে আর কিছু বইলে যাই নাই।”

বাবা চুন্নু কাজী বলেন, “গতরাতেও আমার ছেলে আমাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলছিল। আমাদেরকে সে বলেছিল তাকে নিয়ে যেন আমরা চিন্তা না করি। কিন্তু রাত আর পার হল না। রাত শেষ হওয়ার আগেই চিন্তা শেষ করে দিছে।”

ফিরোজের বড় ভাই ফেরদৌস কাজী বলেন, রাত ২টার সময় ফিরোজের বন্ধুরা তাকে ফোন করে আত্মহত্যার খবর দেয়। সেই খবর পেয়ে ভোর ৪টায় তারা ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে ভাইয়ের লাশ দেখেন।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেয়ের সঙ্গে ফিরোজের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগে তাদের মা সেই মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবা দিনমজুর হওয়ায় মায়ের সঙ্গে আর দেখা করেনি সেই মেয়ে। পরে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান ফিরোজ। সেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন।

“ওই ঘটনা নিয়ে ফিরোজ হতাশায় ভুগছিল। ঢাকায় যাওয়ার আগে মাকে কথা দিয়েছিল এমন ঘটনা ঘটাবে না। কিন্তু সেই কথা আর রাখল না।”

[প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে: ফেইসবুক লিংক]