শীতের পাখি এসেছে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে

সবচেয়ে বেশি পাখি দেখা মিলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পেছনের লেকটিতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 05:38 AM
Updated : 18 Nov 2022, 05:38 AM

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতিথি পাখিদের কলতান জানান দিচ্ছে, শীত চলে এসেছে।

সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং নেপাল থেকে আগত অতিথিরা ক্যাম্পাসের লাল শাপলায় পূর্ণ লেকের পানিতে জলকেলি, ডানাঝাপটানি খুঁনসুটিতে মেতে উঠেছে। আকাশও দখলে তাদের; ডানা মেলে উড়ছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে হালকা শীতের আবহে জাবি ক্যাম্পাসে এসব পরিযায়ী পাখির আসা শুরু হয়। মাঘের শেষ পর্যন্ত থাকে তাদের এই পদচারণা।

ক্যাম্পাসের গাছপালায় ঢাকা সবুজ প্রকৃতি আর পাখির খাদ্য ও বসবাস উপযোগী জলাশয়গুলোও যেন বরণ করে নেয় অতিথি পাখিদের। তাই শীতকালে এই জলাশয়গুলোকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পেছনের লেক, পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেক, সুইমিং পুল সংলগ্ন জয়পাড়া লেক ও ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের সঙ্গে জলাশয়গুলোতে অতিথি পাখিরা ভিড় জমায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে , এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পাখি অবস্থান করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পেছনের লেকটিতে। এই লেকের শত সহস্র পাখির কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভাঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থীদের। এমনটাই বলছিলেন, এই হলের শিক্ষার্থী শাশ্বতী সরকার।

শাশ্বতী বলেন, “আমার হল লেকের পাশে হওয়ায় পাখিদের সঙ্গে সম্পর্কটা একটু বেশিই। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে পাখির কলকাকলি শুনে। হালকা শীতের আবহে পাখির কিচিরমিচির শুনলে মন ভালো হয়ে যায়। ক্যাম্পাসের শীত এমনি সুন্দর, অতিথি পাখি এসে সেটাকে আরও সুন্দর করে তোলে।“

ছুটির দিনগুলো অতিথি পাখিদের দেখতে লেকের পাড়ে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। খুব কাছ থেকে এসব পাখি দেখে মুগ্ধ হন তারা।

মিরপুর থেকে আসা বুয়েট শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, “পাখি তো সচরাচর দেখা যায় না। তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছরই ঘুরতে আসা হয়। লেকের মধ্যে ফুটে থাকা শাপলার মধ্যে পাখিরা এসে বসে, ওড়াওড়ি করে, ডানা ঝাপটায়; ভালোই লাগে দেখতে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে ১৯৮৬ সালে প্রথম পরিযায়ী পাখিরা আসতে শুরু করে। আগে দেশি-বিদেশি মিলে ১৯৫ প্রজাতির পাখির দেখা মিলতো। তবে এখন দেশি প্রজাতির সংখ্যাই বেশি।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, “এদেশে যখন আরামদায়ক ঠাণ্ডা, তখন শীতপ্রধান দেশগুলোতে রক্ত জমিয়ে দেওয়ার মতো ঠাণ্ডা পড়ে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে সেখানকার পানি ও মাটি বরফ-তুষারে ঢেকে যায়।

“এমন বৈরী পরিবেশে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব ও আবাসের সংকট দেখা দেয়। তাই নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে পাখিগুলো নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক উষ্ণ আর আরামদায়ক কোনো দেশে পাড়ি জমায়।”

এসব পাখিরা মূলত সাইবেরিয়া, চীনের জিনজিয়াং, মঙ্গোলিয়া ও নেপাল থেকে আসে বলে জানালেন এ শিক্ষক।

এই পাখি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “অন্যান্য বছরে সেপ্টেম্বর মাস থেকেই পাখি আসতে শুরু করে, এ বছর একটু দেরিতে আসতে শুরু করেছে। জলবায়ু পবিবর্তনের প্রভাব ও শীত কম থাকার কারণে এমনটা হচ্ছে। তবে শীত বাড়লে আরও অতিথি পাখি আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-নিবন্ধক (এস্টেট) আবদুর রহমান বাবুল বলেন, অতিথি পাখিরা যে লেকগুলোতে আসে সেই লেকগুলো জুলাই-অগাস্ট মাসে পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা পাঁচটি লেক সংস্কার করেছি। কারণ এগুলোতে পাখি বেশি আসে। বাকি লেকগুলো সংস্কার করা সম্ভব হয়নি, কারণ সেগুলো খনন করা দরকার।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক