Published : 11 Apr 2026, 09:59 AM
একের পর এক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ‘নিরাপত্তাহীনতায়’ ভুগছেন সিলেট নগরবাসী। দিনের বেলাতেই প্রকাশ্যে ‘অস্ত্রের মুখে জিম্মি’ করে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা-মোবাইল-ব্যাগ। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মারাত্মক আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির শঙ্কায় আতঙ্কে রয়েছেন নগরবাসী।
নগর পুলিশ বলছে, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে নগরীতে চুরি ও ছিনতাই ঘটনায় ৪৭টি মামলা হয়েছে। যদিও নগরের বাসিন্দারা বলছে, দুই মাসে নগরীর বিভিন্ন স্থানে চুরি ও ছিনতাইয়ের শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ‘ঝামেলা এড়াতে’ অনেকেই থানায় অভিযোগ করেননি।
বিভিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি ও জনশূন্য রাস্তায় যাতায়াতে নগরবাসীর মধ্যে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে।
চুরি ও ছিনতাই রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসীক্যালাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও সিলেট সিটির প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নগর পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও চোর এবং ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানো যাচ্ছে না।

সিলেট নগরীর বাগবাড়ীর বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, “প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের কয়েকটি ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর দিন-দুপুরেও ছেলে মেয়েদের নিয়ে বের হলে মনের ভেতরে আতঙ্ক কাজ করে কখন যেন কি হয়ে যায়।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি সিলেট বিভাগীয় শাখার প্রধান সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, “বর্তমানে সিএনজিতে একা উঠতেই ভয় লাগে।”
ছিনতাই ঠেকাতে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের নজরদারি ও চেকপোস্ট বাড়ানো এবং পুলিশের তালিকায় থাকা ছিনতাইকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে সবাইকে সচেতন হয়ে চলাফেরা করার আহ্বান জানান তিনি।
সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, “নতুন সরকার গঠনের পর দিনের বেলা সিলেটে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা আমাদের জন্য এক বিরাট আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“বিএনপি নেতারা তাদের নির্বাচনি প্রচারে বলেছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, টপ প্রায়োরিটি দিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিপর্যয় আমাদের জনজীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”
তিনি বলেন, “বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দুটি ঘটনা ভাইরাল হয়েছে- হাউজিং এস্টেটে একজন নারীর কাছ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া, আরেকটি হলো সাগরদিঘীরপাড়ের। তারপর সাংবাদিকের ঘটনা। এই ঘটনাগুলোয় আমরা মনে করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দারুণ অবনতি ছাড়া আর কিছু না।’’

ছিনতাইয়ের আলোচিত ঘটনা
৪ এপ্রিল বেলা পৌনে ৩টার দিকে নগরীর আম্বরখানা পয়েন্টে অটোরিকশায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন বালাগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক ওহী আলম রেজা।
ছিনতাইকারীরা তার সাড়ে তিন বছরের ছেলের গলায় চাকু ধরে টাকা ছিনিয়ে নেয়।
সেদিন কি হয়েচিল জানতে চাইলে তিনি ওহী আলম বলেন, “ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে বের হয়েছিলাম। শাহী ঈদগাহ এলাকায় যাওয়ার জন্য আম্বরখানা পয়েন্ট এলাকা থেকে একটি অটোরিকশায় উঠি। সেখানে আগে থেকেই ড্রাইভারের সঙ্গে আরেকজন ছিলেন।
“যাত্রা শুরুর মিনিট খানেকের মধ্যে অটোতে উঠেন আরেক যাত্রী। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ একজন আমার সন্তানের গলায় চাকু ধরে কথা না বলার নির্দেশ দেয়। আমি চমকে উঠে ছেলেকে জড়িয়ে ধরি।”
তিনি বলেন, “এ সময় তারা আমার পকেটে থাকা ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। টাকা নেওয়ার পর একটু সামনে গিয়ে হালকা ব্রেক করে আমাদের নামিয়ে দিয়ে তারা দ্রুত চলে গেছে।”
এই কলেজ শিক্ষকের অভিযোগ, “অনেক অটোরিকশার চালকরা এই ছিনতাইচক্রের সঙ্গে জড়িত।”
এর আগে মার্চ মাসে সিলেট নগরীর সাগরদিঘীরপাড় এলাকায় এক শিক্ষার্থীর ওপর দুই ছিনতাইকারীর হামলার চেষ্টার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নিরিবিলি সড়ক দিয়ে এক নারী হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা দুজন তার গতিরোধ করে। তাদের একজনের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে ওই নারীকে ভয় দেখানো হয়। অন্যজন তার সঙ্গে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় বাধা দিলে অস্ত্রধারী ব্যক্তি ধারালো অস্ত্রের উল্টো দিক দিয়ে ওই নারীকে কয়েকবার আঘাত করেন। একপর্যায়ে আশপাশে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
তবে ভিডিওতে ওই নারীর কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিতে দেখা যায়নি। তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বরও স্পষ্ট নয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় অটোরিকশা থামিয়ে এক নারীর কাছ থেকে টাকাসহ ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় তিনটি মোটরসাইকেলে থাকা ছয় ছিনতাইকারী।
৩৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, “ব্যস্ত সড়কে প্রথমে একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে একটি মোটরসাইকেল। পরে আরও দুটি মোটরসাইকেল যোগ হয়। একটি মোটরসাইকেল থেকে এক যুবক নেমে অটোরিকশার ভেতরে বসা নারীর কাছ থেকে ব্যাগ টান দেন।
এ সময় ওই নারীর সঙ্গে ব্যাগ নিয়ে টানাটানি হয়। শেষ পর্যন্ত ওই যুবক ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে উঠে এলাকা ত্যাগ করেন।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা নারী সিলেটের বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ওই নারীর ব্যাগে ১৫ হাজার টাকা, কয়েকটি ব্যাংকের চেক বই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

প্রতি মাসে গড়ে সহস্র অপরাধী গ্রেপ্তার
সিলেট মহানগর পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মহানগর পুলিশের ছয় থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় চারটি ও চুরির ঘটনায় ১৬টি মামলা হয়েছে। মার্চ মাসে ছিনতাইয়ের মামলা সাতটি আর চুরির মামলা হয়েছে ১৯টি।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, “নগরীকে চুরি ও ছিনতাই মুক্ত করতে আমরা চেষ্টা করছি। এজন্য পুলিশ কমিশনারসহ নগর পুলিশের সিনিয়র কর্মর্কতারা দিনে-রাতে কাজ করছেন। প্রত্যেকটি থানা ও ফাঁড়ি এলাকায় পুলিশের ডিউটি বাড়ানো হয়েছে।
“নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে। এছাড়াও চিহ্নিত ছিনতাকারীদের তালিকা করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাদের ধরতে প্রতিদিন অভিযান চলছে।’’
এদিকে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী।
৬ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “২৬৩ জন ছিনতাইকারীর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে, চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের আমরা পর্যায়ক্রমে ধরব। তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে ইতোমধ্যে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“এর মধ্যে ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষায়িত কয়েকটা দল গঠন করা হয়েছে; তাদের কাজই হচ্ছে ছিনতাইকারী ধরা। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে এদের তৎপরতা বন্ধ করতে সমর্থ হব।”
তিনি বলছেন, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাকাতির অভিযোগে ১৯, ছিনতাইয়ের অভিযোগী ৪৮, চুরির অভিযোগে ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০ জনকে ডাকাতির, ১০৩ জন ছিনতাইয়ে এবং ১০৪ জনকে চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
“পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চুরি-ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। যা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স তুলে ধরে।” বলেন পুলিশ কমিশনার।
এছাড়াও বিভিন্ন পরোয়ানায় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে মোট ২ হাজার ৬৬৭ জন এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৩ জন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে সহস্র অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুধু রোজার মধ্যে ১ হাজার ১২৯ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।
নগরবাসীর ‘আতঙ্কের কিছু নেই’ আশ্বাস দিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “নগরীতে চুরি ও ছিনতাই রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপরতা বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। একইসঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারিও থাকবে। চুরি ও ছিনতাই রোধে জিরো টলারেন্স।”