Published : 28 Jun 2026, 07:03 PM
ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবারও ফুঁসে উঠেছে তিস্তা নদী। এর মধ্যে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে তিস্তার চরাঞ্চলের ফসলি জমি।
রোববার সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর (৫২ দশমিক ২২) দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী।
এর মধ্যে ভুটান ও সিকিম পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির চাপে তিস্তা নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দো-মহনী ও মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশে ধেয়ে আসায় উভয় দেশের তিস্তায় লাল সতর্কতা জারির খবর পাওয়া গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “আমরা সতর্কতার মধ্যে রয়েছি ও তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইচ গেইট খুলে রাখা হয়েছে। নদীর আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
“নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সমস্ত পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রেখেছে প্রশাসন।”
তিস্তায় ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার; যা অতিক্রম করে ৫২ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান অমিতাভ চৌধুরী।
এর আগে মঙ্গলবার বেলা ৩টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল; যা সন্ধ্যা নেমে যায়।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, রোববার সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার (৫১.৯৭) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়; যা বেলা ৩টায় ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ দশমিক ০৩ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হয়।
তিন ঘণ্টায় পানি ১৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে সন্ধ্যা ৬টায় নদীর পানি ৫২ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়; যা বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে বলে জানান তিনি।
ভারতে সতর্কতা জারি
ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের সবশেষ তথ্য মতে, তিস্তা নদীর উজানে ভারতের দোমোহনী পয়েন্টে সন্ধ্যা ৬টায় সেখানকার বিপৎসীমার (৮৫ দশমিক ৯৫) ১১ সেন্টিমিটার (৮৫ দশমিক ৮৪) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেখানে হলুদ সংকেত জারি করা হয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ অংশের ডালিয়ায় তিস্তার ব্যারেজ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তার প্রবাহ সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার (৬৫ দশমিক ৯৫) ১৩ সেন্টিমিটার (৬৬ দশমিক ০৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেখানে কমলা সংকেত জারি করা হয়েছে।
এদিন সকাল ১০টায় মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার সমান ছিল; যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিকাল ৪টায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে সেখানে ৬৬ দশমিক ১১ সেন্টিমিটার; যা বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল।
পাউবো বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রে সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলা নদীসমূহের পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। সেইসঙ্গে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
অপরদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অংশের সর্ব উত্তরের শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, সেবক, কোচবিহারসহ বিভিন্ন স্থানে ভারি বৃষ্টি হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে আগামী দুদিন রংপুর বিভাগের ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
ডিমলার নিম্নাঞ্চলে ২০ গ্রামে পানি প্রবেশ
পাঁচ দিনের মাথায় ফের তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে ২০ গ্রামে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরে বাদামক্ষেত, ধানের বীজ তলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, পাঁচ দিন আগে নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। সেদিন নিম্নাঞ্চল, তিস্তার চর এলাকার অধিকাংশ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে আমন ধানের বীজতলা অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবারও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি হতে থাকলে চরে এবার কোনো ফসল ফলানো যাবে না।
ঝাড়সিংহেশ্বর চর গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, সকালে পানি কিছুটা কম থাকলেও বিকালে হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। রাতে এ পানি যদি আসতে থাকে চর অঞ্চলে আমন ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাবে। এ ছাড়া বাদম, মিষ্টি কুমড়াসহ অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বলেন, নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় তার ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর ও পূর্ব ছাতনাই গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। এসব গ্রামের প্রায় এক হাজার ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নদীর পানি বাড়া-কমার মধ্যে রয়েছে। সবশেষ বিপৎসীমা অক্রিম করায় নিম্নাঞ্চলের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
লালমনিরহাট
তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পাউবো জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে সবশেষ ২৩ জুন প্রথমবারের মত তিস্তার পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপরে উঠেছিল, যা পরদিনই নেমে যায়। তবে রোববার দুপুর থেকে পুনরায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার পাঁচটি উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট এবং ফসলি জমি তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
নদী তীরবর্তী হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দূর্না গ্রামের রহিমুদ্দিন বলেন, হঠাৎ পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় গবাদিপশু ও শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।
পানির চাপ বাড়ায় তিস্তার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী তীরবর্তী উঁচু রাস্তাগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে পাউবো বাঁধ সংস্কারের টেকসই কাজ না করে বর্ষা এলে জরুরি মেরামতের নামে সরকারি অর্থ অপচয় করে। ফলে প্রতি বছরই তাদের ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকতে হয়।
বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পাউবো কর্মকর্তারা।