Published : 10 Dec 2025, 06:23 PM
করতোয়া, ইছামতী ও গজারিয়া নদীর ২৩০ কিলোমিটার খননে এক হাজার ৫৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবটি এখন একনেকে পাশের অপেক্ষায়।
রোববার ঢাকায় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান।
প্রকল্পটি একনেকে পাশ হলে করতোয়া, ইছামতি ও গজারিয়ার প্রাণ ফেরার পাশাপাশি ভৌগোলিক পরিবর্তন সঙ্গে নদী সংলগ্ন খালগুলোতেও পানি পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করতোয়ার উৎসমুখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলসি এলাকায় নদীর পাঁচ কিলোমিটার অংশে পলি জমেছে। এতে বর্ষা মৌসুমেও করতোয়ায় পানি ঢুকছে না। বর্ষায় শুধু নিচু এলাকা থেকে পানি ঢুকলেও নদীর গতি কম এবং শীত মৌসুমে কোনো স্রোত থাকে না।
এ ছাড়া কোথাও কচুরি পানা ও কোথাও ধান চাষে নদী নব্যতা হারিয়েছে। আবার যেখানে কিছু পানি আছে, তার রং কালো। কেউ গোসলও করতে পারে না। বিষাক্ত পানিতে মাছও জন্মায় না।
অথচ এক সময় করতোয়া ছিল প্রমত্তা। নদীতে বড় বড় বজরা চলত। সারা বছর নদীতে থাকত স্রোত এবং মাছও পাওয়া যেত প্রচুর। কৃষিতেও ব্যবহার হত করতোয়ার পানি।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী করতোয়া নদীর গতিপথের বিপর্যয় ঘটে দুই বার। ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে একবার করতোয়া তিস্তার দিকে ধাবিত হয়। সেবার করতোয়ার প্রথম মৃত্যু ঘটে। আবার ১৮২০ সালের ভূমিকম্পে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে করতোয়া কাটাখালি নদীর দিকে ধাবিত হয়। আর এতে করতোয়ায় দেখা দেয় পানি সংকট; যা এ নদীর দ্বিতীয় মৃত্যুর কারণ।

পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের বন্যায় করতোয়া ব্যাপক পানি এসে বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। পরে ১৯৯২ সালে করতোয়ার উৎসমুখ গোবিন্দগঞ্জের খুলসিতে স্লুইস গেইট করা হয়। সেখান দিয়ে সীমিত আকারে পানি করতোয়ায় আসতে থাকে। এই গেইট নির্মাণের পর থেকে খুলসির ভাটিতে নদীর পাঁচ কিলোমিটার অংশে পলি পড়ে করতোয়ার উৎস মুখ বন্ধ হয়ে যায়।
বগুড়া শহরে করতোয়া নদীর পাশে চেলোপাড়া এলাকার ৮০ বছরের হাসেন আলী বলেন, করতোয়া নদীই ছিল আমাদের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান যোগাযোগ। তবে এখন এই নদীকে আর খালও বলা যাবে না। করতোয়ার দুই পাশ দখল হয়ে নদীটি এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
“শহরের বাসা-বাড়ির ময়লা পানি ড্রেন দিয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে। তাই একেবারে তলদেশে কিছু পানি থাকলেও তা বিষাক্ত এবং নীল। অথচ আগে আমরা করতোয়ার পানিই ব্যবহার করতাম। বর্ষা ও শীতে মাছ ধরতাম”, বলেন তিনি।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশল মো. হুমায়ন কবির বলেন, বগুড়া শহরে করতোয়া নদীর ২৮ কিলোমিটার খননসহ দুই পাশে স্লাব এবং সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ২০২ কিলোমিটারের কাজের অগ্রগতি হচ্ছে। সকাল-বিকাল লোকজনের হাঁটা-চলা এবং বিনোদনের জায়গা সৃষ্টি হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, “ঢাকায় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পটি’ অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার স্টাডি হয়। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে একনেক সভায় দাখিল করা হবে বলে শুনেছি।
“এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে, শুধু করতোয়ার নাব্যতাই নয়, বাঁচবে পরিবেশও। ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে নদী মাতৃক উত্তরাঞ্চল প্রাণ ফিরে পারে। নদী ও খাল-বিল ভরে উঠবে পানিতে।”