১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সুনামগঞ্জ-১: আওয়ামী লীগ নেতার ‘হিন্দু কোটার’ বক্তব্যে তোলপাড়

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত বলেন, “আমি তার বক্তব্য শুনেছি। এমন সাম্প্রদায়িক বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মুখে মানায় না।”

সুনামগঞ্জ-১: আওয়ামী লীগ নেতার ‘হিন্দু কোটার’ বক্তব্যে তোলপাড়

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুরে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেন এম নবী হোসেন।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Dec 2023, 07:48 PM

Updated : 31 Dec 2023, 08:10 PM

সুনামগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সভায় এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ওই আসনে নৌকার প্রার্থীকে ‘হিন্দু কোটায়’ মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন দলের সিলেট জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রঞ্জিত সরকার। নৌকার মনোনয়ন না পেয়ে তিনবারের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে বলেছেন, “আমাদের মনোনয়ন না দেওয়ার কারণ হল ‘হিন্দু কোটা’। এবার আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা হিন্দু কোটায় ১৫টি সিট দিয়েছেন। তাদের কোটা আছে। এই কোটা প্রথায় ৫০ বছর ধরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কোটাগত নির্বাচন করতেন। তার স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তাও দুইবার নির্বাচন করেছেন।”

সম্প্রতি ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুরে এম নবী হোসেন এ বক্তব্য দেন। এ সময় মঞ্চে মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ আওয়ামী লীগের আরও নেতা উপস্থিত ছিলেন।

তার এই বক্তব্যের ভিডিও শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। তার বক্তব্য এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করবে– এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের নেতারাই।

৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শামিয়ানা টাঙ্গানো একটি জায়গায় এই সভা হচ্ছে। সেখানে চারপাশে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের পোস্টার টাঙানো। এম নবী হোসেন দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন। 

ওই আসনের হিন্দু ভোটারদের উদ্দেশে নবী হোসেনকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা এখন নৌকার প্রার্থীর জন্য এক হয়ে গেছেন। কিন্তু দিরাই-শাল্লার দিকে চেয়ে দেখুন সেখানে ৩৯ ভাগ হিন্দু ভোট। তারা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তার প্রতীক কেটলিতে ভোট দেওয়ার জন্য কাজ করছেন।

“আমাদের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন গত ১৫ বছর হিন্দুদের যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন তা আমরা মুসলমানরা পাইনি। ধর্মপাশার মনীন্দ্র বাবু ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ হয়েছিলেন। তিনি এমপি সাবের কাছ থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। এখন তিনি হিন্দু নেতা হয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করছেন। 

“আমাদের আসনে আমরা মুসলমানরা ৮৭ পার্সেন্ট। সনাতনরা মাত্র ১৩ পার্সেন্ট। এখন আপনারাই সিদ্ধান্ত নেন, ভগবান আমাদের শাসন করবেন, না আমরা ৮৭ পার্সেন্ট মুসলমান ঈমানি দায়িত্ব পালন করব? যদি ঈমানি দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে ৭ জানুয়ারি কেটলিকে ভোট দেবেন।”

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের মনোনয়ন নিয়েও কথা বলতে শোনা যায় নবী হোসেনকে। সেই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ; যিনি আল আমীন চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত।

সেখানে নৌকার মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দুইবারের সংসদ সদস্য জয়া সেনগুপ্তা। তিনি প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী। জয়া কেটলি প্রতীকে নির্বাচন করছেন।  

এম নবীকে বলতে শোনা যায়, এবার পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে ‘কাকুতি-মিনতি করেন’ তার আপন ভাই আমীন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রীকে সব কূল রক্ষা করে চলতে হয়। প্রধানমন্ত্রী উনার কথায় জয়া সেনগুপ্তাকে বাদ দিয়ে আল আমীন চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে রোববার এম নবী হোসেনের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একজন হিন্দু নেতা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার কাউন্টার বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা। আর এই বক্তব্যের পুরো অংশ না দিয়ে খণ্ডিত অংশ ভাইরাল করা হয়েছে।”

এমন বক্তব্য দেওয়া উচিত কি-না জানতে চাইলে সংসদ সদস্য বলেন, “আমি এমন বক্তব্যের পক্ষে না। আমি আসার আগেই উনি এই বক্তব্য দিয়েছিলেন।”

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত বলেন, “আমি তার বক্তব্য শুনেছি। এমন সাম্প্রদায়িক বক্তব্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মুখে মানায় না। আওয়ামী লীগ আম মানুষের দল। কোনো সাম্প্রদায়িক দল নয়।

“আওয়ামী লীগ বাঙালিদের রাজনৈতিক সংগঠন এবং বাঙালি চেতনায় সর্বস্তরের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে। এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করা উচিত। তা না হলে আমরা সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নেব।

“এ বিষয়ে সভাপতির সঙ্গে কথা বলে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় চিন্তাভাবনা করছি আমরা”, বলেন নোমান বখত।