গাজীপুর সিটি ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের এই সাত নেতাকর্মীকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
Published : 17 Dec 2023, 04:29 PM
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমনে ভীতি সঞ্চার এবং দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হতে ব্যাপক প্রাণহানির ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য রেললাইনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গাজীপুরে রেললাইন কেটে ট্রেনে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর এমনটাই বলা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সাবেক বিএনপি নেতা হাসান আজমল ভূঁইয়াসহ বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের এই সাত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আটক অন্যরা হলেন- নেত্রকোনার মদন থানার বারই বাজার এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে জান্নাতুল ইসলাম (২৩), ময়মনসিংহের ভালুকা থানার বান্দীয়া এলাকার তাইজুদ্দীনের ছেলে মেহেদী হাসান (২৫) এবং গাজীপুর মহানগর সদর থানার ভানোয়া এলাকার তারিকুল ইসলাম দিপুর ছেলে জুলকার নাইন আশরাফি ওরফে হৃদয় (৩৫), উত্তর ছায়াবিথি এলাকার মৃত সোলায়মান মোড়লের ছেলে শাহানুর আলম (৫৩), কানাইয়া পূর্বপাড়া এলাকার মৃত ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে মো. সাইদুল ইসলাম (৩২) ও মধ্য ছায়াবিথি এলাকার আফতাফ উদ্দিনের ছেলে সোহেল রানা (৩৮)।
দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুর মেট্টোপলিটনের পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব আলম বলেন, “গত ১১ ডিসেম্বর রাতে কাউন্সিলর ও সাবেক বিএনপি নেতা আজমল ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে তার বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে সভা হয়। সেসব সভায় রেললাইন কেটে নাশকতা ঘটানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১২ ডিসেম্বর রাতে রেললাইন কাটা হয়।”
আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব আলম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনিবার জান্নাতুল ইসলামকে ও মেহেদী হাসানকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে গাজীপুর মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম ও আজিমুদ্দিন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ত্বোহাসহ আটজনের জড়িত থাকার তথ্য দেন। এর মধ্যে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজমল ভূঁইয়াকে পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা বলে উল্লেখ করেন তারা। পরে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ কমিশনার মাহবুব আরও জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা কোনাবাড়ী এলাকা থেকে ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পরে ঢাকা যাওয়ার কথা বলে একটি হাইয়েস গাড়ি ভাড়া করে। কিন্তু তারা ঢাকায় না গিয়ে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করতে থাকে।
তিনি বলেন, “গাড়িতে তারা মুখোশ পরা অবস্থায় ছিল। এ অবস্থায় গাড়িটির ড্রাইভার সাইফুল ভয় পেয়ে তাদের ঢাকায় না যাওয়া এবং মুখোশ পরার কারণ জিজ্ঞেস করলে তাদের মধ্যে একজন মুখোশ খুলে ড্রাইভারকে চেহারা দেখায়। তখন ড্রাইভার তাকে চিনতে পেরে আর কিছু বলে না।
“ঘোরাফেরার মধ্যে তারা শিববাড়ী, জোড় পুকুরপাড়সহ আরও বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজনকে গাড়িতে উঠায়। একপর্যায়ে তারা গাজীপুর সদর থানাধীন জোড় পুকুরপাড়স্থ ইবনে সিনহা তোহার বাড়ি থেকে রেললাইন কাটার যন্ত্রপাতি এবং দক্ষিণ সালনা, উসমান গণির ভাড়া দেওয়া ‘বাশ বাগান’ রেস্টুরেন্ট থেকে দুইটি গ্যাস সিলিন্ডার গাড়িতে উঠায়। এরপর তারা গাজীপুর শহরে ঘোরাঘুরি করে সময় ক্ষেপন করে এবং স্থানীয় একটি রেস্টেুরেন্টে বিরিয়ানি খায়।”
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আনুমানিক রাত সাড়ে ১২টার পরে তারা বনখড়িয়া এলাকায় ঘটনাস্থল থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরত্বে বনের পাশে যায়। সেখানে গাড়ি রেখে তারা গ্যাস সিলিন্ডার ও সরঞ্জামসহ হেঁটে বনখড়িয়া চিনাই রেল ব্রিজের দিকে যায়। দলটি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং আনুমানিক ভোর ৩টা থেকে ৪ টার মধ্যে তারা ২০ ফুট রেললাইন কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
ভোরে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটি সেখানেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ সাতটি বগি লাইনচ্যূত হয়। ঘটনাস্থলে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ কমিশনার মাহবুব বলেন, “রেললাইন কাটার পর দলটি গাড়ি নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে চার জন এবং বাকীরা মিরপুরে গিয়ে নামে এবং বিকাশের মাধ্যমে গাড়িচালক সাইফুলকে ৮ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করে।”
প্রেস বিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, এই ঘটনার কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি জব্দ করা হয়েছে। মাইক্রোবাসের চালক সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। নাশকতার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধার এবং এর প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান মাহবুব।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মো. শফিকুল ইসলাম, গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম, রেলওয়ে পুলিশের পুলিশের সুপার মো. আনোয়ার হোসেন, গাজীপুর পিবিআই পুলিশ সুপার মাকছুদের রহমান, গাজীপুর মেট্রোপলিটনের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইব্রাহিম খান ও আবু তোরাব মো. শামসুর রহমান।
বুধবার রাতে ভাওয়াল গাজীপুর ও রাজেন্দ্রপুর রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী বনখড়িয়া এলাকায় রেললাইন কেটে রাখে দুর্বৃত্তরা। পরে সেখানে ভোর ৪টার দিকে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকার কমলাপুরগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
এতে ট্রেনযাত্রী আসলাম মিয়া নিহত ও লোকো মাস্টারসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার কমলাপুর রেলওয়ে থানায় মামলা হয়।
ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে, গাজীপুর জেলা প্রশাসন এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িতদের ধরতে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
পুরানো খবর:
ভোরে ২ ট্রেনের মাঝের এক ঘণ্টায় কাটা হয় লাইন