Published : 19 Mar 2025, 05:45 PM
নৌ যোগাযোগ সহজ হওয়ায় মুঘল আমলে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য চাঁদপুরে অনেক মুসলমানদের আগমন ঘটে। তারা এখানে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করলেও নানা ধরনের স্থাপনা তৈরি করে গেছেন।
ওই সব স্থাপনার অংশই হচ্ছে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চুন-সুরকি দিয়ে তাদের তৈরি করা মসজিদ। ‘মুঘল আমলের’ মসজিদ নামে এসব স্থাপনাগুলো পরিচিত।
যার মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রায় ‘চারশ’ বছরের পুরোনো বাখরপুর জামে মসজিদ অন্যতম। ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত এটি।
সরজমিনে বাখরপুর জামে মসজিদ এলাকা ঘুরে, মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এই মসজিদ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য।

চাঁদপুরের জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে এই মসজিদটি অবস্থিত। সদরের দক্ষিণে সদর-হাইমচর সড়ক হয়ে চান্দ্রা বাজার চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণে বাখরপুর গ্রাম।
মূল সড়ক থেকে গ্রামীণ সড়ক দিয়ে চান্দ্রা ইউনিয়নের বাখরপুর পশ্চিম পাড়ায় মেঘনার নদীর খুবই কাছেই মসজিদের অবস্থান।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, বাখরপুর জামে মসজিদের নির্মাণ সালের সঠিক তথ্য সংরক্ষিত নেই এবং পাওয়া যায়নি। তবে ইতিহাস পর্যালোচনা ও প্রবীণ লোকদের মতে, মুঘল আমলেই এই মসজিদ নির্মাণ হয়েছে। কারণ এটির নির্মাণশৈলী।
এই এলাকার নাজির পাটওয়ারী (৬৫) বাখরপুর জামে মসজিদের উন্নয়নমূলক কাজে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, মসজিদ কমপ্লেক্সটি ২৮ শতাংশ জমির ওপর। এর মধ্যে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ ভবনটি ছয় শতাংশ জমির ওপর নির্মিত। এরপর প্রায় ৩০ বছর আগে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মসজিদ সংলগ্ন পূর্ব দিকে আট শতাংশের মধ্যে পাঁচতলা ভিতের ওপর একতলা ভবনের কাজ করা হয়েছে। পাশে ঈদগাহ ও পুকুর মিলিয়ে রয়েছে ১৪ শতাংশ।
নাজির বলেন, মুঘল আমলের নকশায় এই মসজিদটি তিন গম্বুজ ও তিন তারা বিশিষ্ট। এটি নির্মাণ করা হয়েছে শুধু চুন-সুরকি দিয়ে। পুরো মসজিদের চারপাশে ২৮টি চুন-সুরকির তৈরি খুঁটি রয়েছে। আর এই খুঁটির সঙ্গে দেয়ালের পুরুত্ব সোয়া তিন ফুট।

তিনি বলেন, পাঁচটি দরজা ও মূল মিম্বারের দুই পাশে দুটি মেহরাব। সোয়া তিন ফুট পুরুত্বের ঝুল বিম দুটি। মসজিদটি যখন নির্মাণ হয়, তখনকার নির্মাণশৈলী অনেকাংশে এখন আর নেই। শুধু তিনটি গম্বুজের ভেতরের অংশে কিছু বিভিন্ন রংয়ের হাতে তৈরি নকশা রয়েছে।
নাজির পাটওয়ারী বলেন, ছোটবেলায় এই মসজিদটি সংস্কার না করায় মসজিদের ওপরে বিভিন্ন ধরনের গাছ ও আবর্জনা ছিল। অনেকের কাছেই এটি জিনের কিংবা গায়েবি মসজিদ নামে পরিচিত। যে কারণে এক সময় ভয়ে লোকজন মসজিদের কাছে খুব কম আসত। এই এলাকাটি মেঘনা উপকূলীয় এলাকা। নদী ভাঙনে অনেক পরিবার নিজ বসতি ছেড়ে অন্যস্থানে বসতি গড়েছেন। প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগ থেকেই এটি সংস্কারে এলাকার লোকজন এগিয়ে আসে।
এলাকাবাসী জানায়, এই মসজিদের মূল অংশে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্তমানে বর্ধিতাংশসহ প্রতি জুমায় প্রায় তিনজন মানুষ এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
বাখরপুর জামে মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি হাফেজ আহম্মেদ পাটওয়ারী বলেন, “এই মসজিদ নির্মাণের প্রকৃত সাল, তারিখ কেউ বলতে পারে না। তবে আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানতে পারি মুঘল সাম্রাজ্যের আমলে বণিকরা এই দেশে ব্যবসা করতে আসে, তখনই তারা এসব মসজিদ নির্মাণ করে। এই মসজিদের অনেক ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন মসজিদটি দেখার জন্য আসেন। অনেকে আবার নিয়ত-মানত করেন।”

পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ গাজী বলেন, “অনেকেই এই মসজিদকে গায়েবি কিংবা জিনের মসজিদ বলেন। আসলে তা নয়, আমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে কথা বলেও নির্মাণ সাল জানা যায়নি। তবে অনেকের তথ্য মতে, এটি মুঘল আমলেই তৈরি।
“তখন তারা মসজিদের উত্তর ও পূর্বে পুকুর খনন করে ওই মাটির ওপর মসজিদ নির্মাণ করে। চুন ও সুরকি ব্যবহারে পুরো মসজিদ নির্মাণ হয়। এতে কোনো ধরনের রড ও সিমেন্ট ব্যবহার হয়নি। তবে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে চুন ও সুরকি দেয়াল থেকে পানি চুয়ে চুয়ে পড়ার কারণে এটি উন্নয়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই আলোকে মূল স্থাপনা ঠিক রেখে ওপরে টাইলস বসানো হয়।”
তিনি বলেন, “এই মসজিদ কমিটির সভাপতি মওদুদ আহম্মেদ দুদু খানসহ আমরা এরই মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছি। এতে স্থানীয়রা দান-অনুদানের পাশাপাশি সরকারিভাবে পুকুর ঘাট ও ঈদগাহ নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ থেকে প্রায় নয় লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি।”
দুই মাস আগে এই মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে যোগ পেয়েছেন পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা শফিকুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখছি, এই মসজিদ স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। অনেক লোক দূর থেকে এই মসজিদ দেখার জন্য আসেন এবং এখানে এসে নামাজ পড়েন। সাধারণ মানুষ এই মসজিদকে উছিলা করে নিয়ত-মানতও করেন। এই মসজিদের খেদমত করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, “বাখরপুর একটি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মসজিদ রয়েছে বলে জেনেছি এবং মসজিদটি দেখতে খুবই সুন্দর। এই মসজিদ আর কীভাবে উন্নয়ন করা যায় সেটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
“মসজিদে যাতায়াতের রাস্তাটি সংস্কারের জন্য দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই বিষয়ে আমি ওই ইউনিয়নের প্রশাসককে অবগত করব।”